লোডশেডিং কমাবে সৌরবিদ্যুৎ

এপ্রিল থেকে জুন এই তিন মাস দেশে গরম যেমন বাড়ে, তেমনি বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে। তবে এবার জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট তৈরি হওয়ার পর, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাশ্রয় রোধে অফিসের সময় কমানো, শপিং মল দ্রুত বন্ধ করাসহ নানা প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বিশেষ করে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে দেখা দিয়েছে ঘাটতি। এর প্রভাবে দেশব্যাপী লোডশেডিং বেড়েছে। একদিকে প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে বিদ্যুতের যাওয়া-আসায় পল্লীমানুষের জীবনে নেমে এসেছে ভয়ানক দুর্ভোগ। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ক্ষুদ্রশিল্প, বাণিজ্য। সরকারি তথ্যমতে, লোডশেডিং দুই হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। গ্যাস ও জ্বালানি তেলের চলমান সংকটের সঙ্গে যোগ হয়েছে, কয়লা স্বল্পতা। বড় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে দিনে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম আসছে। এ ছাড়া নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আসা বন্ধ রয়েছে। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার দ্বিগুণ হলেও, ঘাটতি মেটাতে সরকার হিমশিম। লোড ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামলাতে বাধ্য হচ্ছে সরকার।

তেল-গ্যাস স্বল্পতায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড চলতি মাসের জন্য ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস চাইলেও,  দেওয়া হচ্ছে ৯২-৯৩ কোটি ঘনফুট। ব্যয়বহুল বলে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো কম চালানো হচ্ছে; এর সঙ্গে রয়েছে বকেয়া বিল। প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা পাওনা থাকায় উদ্যোক্তারা তেল আমদানির ঋণপত্র খুলতে পারছেন না। সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে লোডশেডিং। সন্ধ্যা ৭টার পর শপিং মল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি অফিস আদালতে ব্যয় সংকোচন নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। সরকারি অফিসের সময়সূচি কমানো হয়েছে। কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সীমিত আকারে পাইলট প্রকল্প হিসেবে অনলাইন ক্লাস শুরু হয়েছে। বিদ্যুতের এ সংকট শুধু বাংলাদেশে নয়। বিশ্বের অনেক দেশেই তা বিরাজমান। সংকট নিরসনে সরকারকে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। সরকারের এ পদক্ষেপ সময়োপযোগী। কারণ এখন থেকে সচেতন এবং সাশ্রয়ী না হলে, ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ অবস্থা মোকাবিলা করতে হতে পারে। এখন সৌরবিদ্যুতের কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। শুধু জ্বালানির ওপর নির্ভর না করে, প্রাকৃতিক উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রতি অর্থাৎ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে জোর দিতে হবে এবং এর ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বিদ্যুৎ সংকটের এই ভয়াবহ অবস্থা কমাতে সৌরবিদ্যুৎ বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। চরাঞ্চল এবং হাওর অঞ্চলে এর ব্যবহারে সাফল্য পাওয়া গেছে ইতিমধ্যে। শহরাঞ্চলেও এর সুফল পাওয়া যাবে, এ কথা নিশ্চিত বলা যায়। বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার শুরু হয়েছে, কয়েক বছর হলো। ঢাকা শহরের অনেক বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্যানেল দেখতে পাওয়া যায়। এক সময় ঢাকায় নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সৌর প্যানেল স্থাপনের বাধ্যবাধকতা ছিল। তবে নানা টালবাহানায় সেই উদ্যোগটি ভেস্তে যায়। অনেকের মতে সৌরবিদ্যুতের জন্য প্রাথমিক বিনিয়োগ বেশি হওয়ার কারণে, মানুষের মধ্যে এই বিদ্যুতের ব্যবহার আশানুরূপ আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারেনি।

ঘরবাড়িতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার ছাড়াও,  আরও অনেক ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের চিন্তা করা যেতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি সম্পর্কে আরও বেশি মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের দেশে অসংখ্য ইঞ্জিনচালিত লঞ্চ ও স্টিমারসহ নানা ধরনের নৌযান রয়েছে। কোনোটি যাত্রী বহন করে, আবার কোনোটি বিভিন্ন মালামাল। ঐ যানগুলোতে জ্বালানি হিসেবে সাধারণত ডিজেল বা কেরোসিন ব্যবহার করা হয়। আমদানি করা ঐ জ্বালানির পরিবর্তে যদি, প্রতিটি নৌযানের ওপরের ছাদে সৌর প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা যায় তাহলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় সম্ভব।  বাংলাদেশে রয়েছে অগণিত নদ-নদী, খাল-বিল আর হাওর। এছাড়া দক্ষিণে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। এই দেশটির ভূমিতে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো শত শত একর এলাকাজুড়ে সৌর প্যানেল স্থাপন করার জমি নেই। তাই আমাদের যেসব নদ-নদী, খাল-বিল, সাগর রয়েছে সেখানে ভাসমান সৌর প্যানেল স্থাপন করে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা যায়, তাহলে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর একটা নতুন পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। পৃথিবীর অনেক দেশে সমুদ্রের লবণাক্ত পানিকে বিশুদ্ধ করে ব্যবহার করা হচ্ছে। ঐ প্রক্রিয়ায় সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হচ্ছে।

ঢাকাসহ অনেক স্থানের নদীর পানি বর্তমানে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তাকে আর পানি বলা যায় না। ঐসব নদী বা জলাশয়ের পানি বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়ায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে, এর ফলে লোডশেডিং কমবে। বড় এবং মাঝারি আকারের সেতুর  দুপাশে বা দুই লেনের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এসব সেতুতে স্থাপিত সৌর প্যানেল থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। আর ঐ বিদ্যুৎ শুধু সেতুতে যানবাহন চলাচল পথকেই আলোকিত করবে না, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডেও নেওয়া যাবে। রেলপথের দুধারে স্থাপিত সৌর প্যানেল থেকে উৎপন্ন বিদ্যুতে ট্রেন চলাচল করা ছাড়াও অন্যত্র ব্যবহার করা যেতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে পরিবেশবান্ধব। এ প্রক্রিয়াটি পরিবেশকে দূষিত করে না, পরিবেশকে জীবজগতের জন্য গ্রহণীয় করে রাখে। বলতে গেলে, এই বিদ্যুৎ উৎপন্ন প্রক্রিয়ায় পরিবেশের ওপর কোনো বিরূপ প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নেই। স্বল্প খরচে গ্রামের সাধারণ মানুষের আর্থিক সামর্থ্যরে মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ব্যবহার ব্যবস্থাপনাকে নিয়ে আসতে পারলে, মানুষের জীবনে সৌরবিদ্যুৎ বিরাট পরিবর্তন নিয়ে আসবে।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

sdsubrata2022@gmail.com