দীর্ঘ ৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত শেষে গত ৭ এপ্রিল ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। লক্ষ্য ছিল এই সময়ের মধ্যে তেহরান ও ওয়াশিংটন একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর। তবে যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হতে চললেও, শান্তিচুক্তি এখনো দূরের বাতিঘর। গত ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের প্রতিনিধিরা প্রথম দফায় ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন বৈঠক শেষে কোনো ঐকমতে আসতে পারেনি। গত সোমবার ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফা বৈঠকের কথা থাকলেও, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। গতকাল মঙ্গলবার বার্তাসংস্থা রয়টার্স, এপি ও সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বৈঠক নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র প্রকৃতপক্ষে কী চিন্তা করছে; এবং শেষ পর্যন্ত এ আলোচনা হবে কি না তা এখনো নিশ্চিত নয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফার আলোচনার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান। আজ বুধবার আলোচনার সম্ভাব্য দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
মধ্যস্থতাকারী দলের ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাতে আলজাজিরা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আজ পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে পৌঁছাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তবে আলোচনায় অংশগ্রহণের বিষয়ে ইরান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি। তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ‘হুমকির মুখে’ তারা কোনো আলোচনায় বসবে না। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে রণক্ষেত্রে আমাদের নতুন ‘তুরুপের তাস’ প্রদর্শনের জন্য যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়েছি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইরানি কর্মকর্তার বরাতে রয়টার্স জানায়, আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চয়তা না দিলেও আলোচনায় অংশগ্রহণের বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছে ইরান। তবে শর্ত পূরণ হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করছে ইরান। এসব শর্তের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার স্বীকৃতি ও নৌঅবরোধ তুলে নেওয়া। আলজাজিরা বলছে, আলোচনায় অংশ নেওয়া নিয়ে এখন দুই দেশের মধ্যে এক ধরনের ‘মনস্তাত্ত্বিক’ লড়াই চলছে। কে আগে ইসলামাবাদে পৌঁছাবেন সেটাই দেখার অপেক্ষা করছে দুই পক্ষ।
তবে ইসলামাবাদের আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তার জন্য ট্রাম্পকেই দায়ী করেছেন তার কয়েকজন উপদেষ্টা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, গত শুক্রবার এই আলোচনা যখন একটি বড় সফলতার দ্বারপ্রান্তে ছিল, ঠিক তখনই ট্রাম্প যোগাযোগমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে দীর্ঘ ফোনালাপে এ নিয়ে নানা মন্তব্য করতে শুরু করেন। আর জনসমক্ষে ট্রাম্পেরে লাগামহীন মন্তব্য চলমান আলোচনা ভেস্তে দিচ্ছে মত তাদের। ওই সাক্ষাৎকারগুলোতে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, ইরান নিজেদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের পুরো মজুদ ছেড়ে দেওয়া থেকে শুরু করে আলোচনার প্রতিটি বিতর্কিত বিষয়েই রাজি হয়েছে। তবে ইরানি কর্মকর্তারা দ্রুত ট্রাম্পের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারাও সিএনএন-এর কাছে স্বীকার করেছেন যে, সংবেদনশীল পর্যায়ে প্রেসিডেন্টের এসব মন্তব্য ওয়াশিংটনের প্রতি ইরানের গভীর অবিশ্বাস দূর করার ক্ষেত্রে কোনো কাজেই আসেনি। এই প্রতিবেদনের জবাবে হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, যারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দীর্ঘমেয়াদি এই কৌশল বুঝতে অক্ষম, তারা হয় বোকা, নয়তো ইচ্ছাকৃতভাবেই অবুঝ সাজছেন। তবে ট্রাম্পের সহকারীদের অবস্থান ভিন্ন; তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্পের বেফাঁস দাবি ও মন্তব্য এই আলোচনার আরও ক্ষতি করেছে।
এমনকি যখন ইরান আলোচনা প্রত্যাখ্যান করল; তখনো মিথ্যার পসরা সাজিয়ে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দিয়ে গেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত রবিবার ট্রাম্প জানিয়েছিলেন যে, নিরাপত্তার কারণে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য ইরান আলোচনার দ্বিতীয় দফায় অংশ নেবেন না। তবে হোয়াইট হাউজ পরে স্পষ্ট করে জানায় যে, ভ্যান্সই পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন। এরপর সোমবার এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, ভ্যান্স এরই মধ্যে ইসলামাবাদের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। অথচ তিনি তখন পর্যন্ত ওয়াশিংটনেই ছিলেন। সোমবার দিনের শেষভাগে ট্রাম্প আবার দাবি করেন যে, আজকের মধ্যেই ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়ে যাবে। অথচ মঙ্গলবার ছাড়া এই আলোচনা শুরু হওয়ার কোনো পূর্বনির্ধারিত সূচি ছিল না এবং তেহরান এতে অংশ নেবে কি না, তাও নিশ্চিত করেনি। সবশেষে ব্লুমবার্গকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান যে, ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বুধবার রাতে শেষ হচ্ছে। অথচ এটি তার নিজের বেঁধে দেওয়া মূল সময়সীমার এক দিন পরের তারিখ। অবস্থাদৃষ্টে তাই বলা যায়, ট্রাম্প নিজেকে ‘মিথ্যুক’ প্রমাণে আদাজল খেয়ে নেমেছেন।