উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) অনুযায়ী গতকাল সোমবার ৬০ দিনের আলোচনার সময়সীমা শেষ হয়েছে। তবে এই সময়ের মধ্যে দুই পক্ষের আলোচনায় যুদ্ধ অবসানের কোনো অগ্রগতি হয়নি, উল্টো দুই পক্ষই মাঝেমধ্যে নতুন করে সংঘর্ষে জড়িয়ে উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে। এতে তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলটিতে পুনরায় সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কাও থাকছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, সমঝোতা চুক্তির আড়ালে গোপনে ‘যুদ্ধ বাড়ানোর’ প্রস্তুতি নিয়েছে ইরান। গত রবিবার রাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরিতা নিরসনে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করার পরও, গত দুই মাস ইরান কূটনীতির চেয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি জোরদার করতেই বেশি ব্যয় করেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা সমঝোতায় ৬০ দিনের সময়সীমার কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই বলে জানিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই বলেছেন, সমঝোতা স্বাক্ষরের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র তা লঙ্ঘন করায় নির্ধারিত সময়সীমার বিষয়টি এখন পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়, সমঝোতার এই সময়সীমায় ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোরকে (আইআরজিসি) সেনাবাহিনীর ওপর অধিকতর নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয় এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধে অভিজ্ঞদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়। পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের উৎপাদন বহুগুণ বাড়ানো হয় এবং লোহিত সাগর অভিমুখে আইআরজিসি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন লঞ্চার মোতায়েন করে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয় আরব গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ইরানি নেতৃত্বের মধ্যে একটি ‘কৌশলগত পরিবর্তন’ লক্ষ্য করেছেন, যার উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নিজেদের বাহিনীকে প্রস্তুত করা। তেহরানভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মোহাম্মদ হাসান সাংতারাশ পত্রিকাটিকে বলেন, ইরানে এখন এই ধারণা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে মূল যুদ্ধটি এখনো শুরুই হয়নি।
আরব গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ইরান একদিকে যখন কূটনীতি চালিয়ে যাচ্ছিল, অন্যদিকে আইআরজিসি ইরাক, ইয়েমেন এবং লেবাননে তাদের মিত্র বা প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক যুদ্ধকে আরও উসকে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছিল। চলতি বছর জুলাই মাসে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলা জোরদার করার আগে, আইআরজিসি তাদের সৌদি আরবের বন্দর ও জ্বালানি সাইটগুলোর একটি লক্ষ্যবস্তু তালিকা সরবরাহ করেছিল এবং আত্মরক্ষামূলক কৌশল নিয়ে পরামর্শ দিয়েছিল বলেও জানায় সূত্রগুলো। এরই ধারাবাহিকতায়, গত ২০ জুলাই হুতিরা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের ওপর নৌ-অবরোধের ঘোষণা দেয়। গত ৭ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসনাল রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইরানের কট্টরপন্থি নেতৃত্ব ওই চুক্তিকে কেবল একটি ‘কৌশলগত বিরতি’ হিসেবে গ্রহণ করেছিল।
এদিকে, গতকাল সোমবার এক বিবৃতিতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই বলেন, গত ১৭ জুন তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে ৬০ দিনের সময়সীমার কোনো বিধান নেই। তেহরান কখনোই চাপ, আলটিমেটাম বা সময়সীমার ভিত্তিতে নীতি নির্ধারণ করে না। তিনি জানান, ওই সমঝোতায় দুটি বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের একটি সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। বিষয় দুটি হলো ‘নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার’ এবং ‘পারমাণবিক ইস্যু’। কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো না গেলে এই সময়সীমা বাড়ানোরও সুযোগ ছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরিত ওই চুক্তিতে উভয়পক্ষ লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান ‘অবিলম্বে ও স্থায়ী বন্ধের’ ঘোষণা দিয়েছিল। চুক্তির আওতায় ইরান ৬০ দিনের জন্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করতে রাজি হয়। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া ও ইরানি তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল প্রণালিটি উন্মুক্ত করে জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা আনা। তবে চুক্তির পর দ্রুতই পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। জুলাইয়ের শুরুতেই লড়াই পুনরায় শুরু হয় এবং জুলাইয়ের মাঝামাঝি উভয়পক্ষ আবারও পাল্টাপাল্টি হামলা চালালে ইরান তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি স্থগিত করে। ওয়াশিংটন অভিযোগ করে তেহরান হরমুজ প্রণালির প্রতিশ্রুতি পালনে ব্যর্থ হয়েছে এবং আঞ্চলিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা অব্যাহত রেখেছে।