ইউরোপের অন্য দেশগুলো যখন অভিবাসীদের আগমন ঠেকাতে এবং তাদের দেশে ফেরত পাঠাতে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে, তখন অবৈধভাবে বসবাস করা অভিবাসীদের বৈধতা দিতে এক যুগান্তকারী পথে হেঁটেছে স্পেন সরকার। দেশটিতে নথিপত্রহীনভাবে বসবাস করা অভিবাসীদের জন্য এক গণক্ষমা বা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। গত সোমবার থেকে অভিবাসীরা সশরীরে উপস্থিত হয়ে এই বৈধতা পাওয়ার জন্য আবেদন করতে শুরু করেছেন। এই উদ্যোগের ফলে স্পেনে অনুমোদন ছাড়া বসবাস ও কাজ করা কয়েক লাখ বিদেশি নাগরিক উপকৃত হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত জানুয়ারিতে ঘোষণা করা এই কর্মসূচিটি চলতি মাসেই চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে। এর আওতায় যেসব অভিবাসীর কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই, কিন্তু তারা অন্তত পাঁচ মাস ধরে দেশটিতে বসবাস করছেন এবং যাদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড নেই, তারা এক বছরের জন্য নবায়নযোগ্য রেসিডেন্স পারমিট বা বসবাসের অনুমতি পাবেন। আগামী জুনের শেষ পর্যন্ত এই আবেদন করা যাবে। স্পেন সরকারের মতে, এই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৫ লাখ অভিবাসী বৈধতা পেতে পারেন। তবে স্প্যানিশ থিংক ট্যাংক ‘ফাঙ্কাস’-এর হিসাব অনুযায়ী এই সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার হতে পারে। এত বিশালসংখ্যক মানুষের আবেদন যাচাই-বাছাই করার জন্য দেওয়া সময়সীমা বেশ সংক্ষিপ্ত হওয়ায় অনেকেই এর বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
আবেদনকারীদের সুবিধার্থে ৩৭০টিরও বেশি ডাকঘর বা পোস্ট অফিস খুলে দেওয়া হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, অভিবাসীরা চাইলে ৬০টি সামাজিক নিরাপত্তা কার্যালয় এবং কিছু নির্দিষ্ট অভিবাসন কার্যালয়েও আবেদন করতে পারবেন। গত বৃহস্পতিবার থেকে অনলাইনেও আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। রাজধানী মাদ্রিদ এবং বার্সেলোনার বিভিন্ন ডাকঘরে উপস্থিত আবেদনকারীরা জানিয়েছেন, আবেদন-প্রক্রিয়া বেশ স্বাভাবিকভাবেই চলছে। তবে আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা সিরিয়াল নেওয়া থাকার পরও দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হওয়ায় অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মাদ্রিদের কেন্দ্রস্থলেএকটি ডাকঘরে আবেদন জমা দিতে আসা ৪৭ বছর বয়সী ভেনিজুয়েলার অভিবাসী নুবিয়া রিভাস বলেন, কাজ একটু ধীরগতিতে হলেও তা নিয়ম মেনেই এগোচ্ছে।
স্পেনের প্রগতিশীল প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই উদ্যোগকে ‘ন্যায্য ও প্রয়োজনীয় একটি পদক্ষেপ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তার মতে যারা এরই মধ্যে স্পেনে বসবাস করছেন এবং কাজ করছেন, তাদের ‘সমান অধিকার নিয়ে’ বেঁচে থাকা উচিত এবং কর দেওয়া উচিত। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকায় স্পেনের অর্থনীতি সচল রাখতে এবং সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলে অবদান রাখতে এখন আরও বেশি কর্মীর প্রয়োজন বলে মনে করছে সরকার। স্পেন সরকার তাদের এই বৈধতা দেওয়ার পদক্ষেপকে মূলত একটি অর্থনৈতিক উদ্যোগ হিসেবেই তুলে ধরেছে, যা ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ট্রেড ইউনিয়নগুলোরও সমর্থন পেয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্পেনের জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে দেশটির প্রতি পাঁচজন বাসিন্দার মধ্যে একজন অর্থাৎ প্রায় এক কোটি মানুষ বিদেশি বংশোদ্ভূত। এদের বেশিরভাগই কলম্বিয়া, ভেনিজুয়েলা এবং মরক্কো থেকে এসেছেন, যারা দারিদ্র্য, সহিংসতা বা রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে বাঁচতে দেশ ছেড়েছিলেন। স্পেনের কৃষিকাজ, পর্যটন এবং সেবামূলক খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিই হলো লাতিন আমেরিকা এবং আফ্রিকা থেকে আসা এই অভিবাসীরা।
অবশ্য স্পেনে অবৈধভাবে বসবাস করা অভিবাসীদের এভাবে সাধারণ ক্ষমা করে দেওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে ১৯৮৬ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে রক্ষণশীল সরকারের আমলসহ মোট ছয়বার এমন সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়েছিল।