নওগাঁয় ৪ খুনের নেপথ্যে কী

নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলায় শিশুসহ এক পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। পূর্বশত্রুতার জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে পারে বলে মনে করছে পুলিশ। নিহতদের স্বজনদের দাবি, পরিবারের জমির ভাগ নিয়ে ভাই-বোনদের মধ্যে শত্রুতার সূত্র ধরে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। ডাকাতির উদ্দেশ্যেও হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

গত সোমবার মধ্যরাতে নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামে পপি সুলতানাসহ তার পরিবারের চারজনকে গলাকেটে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের শিকার অন্য তিনজন হলেন পপি সুলতানার স্বামী হাবিবুর রহমান (৩৫), তার ছেলে পারভেজ রহমান (৯) ও মেয়ে সাদিয়া খাতুন (৩)। গতকাল মঙ্গলবার সকালে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তারা হলেন নিহত হাবিবুর রহমানের বাবা নমির উদ্দিন, বোন ডালিমা ও হালিমা এবং ভাগনে সবুজ রানা।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, ইতিমধ্যে বেশ কিছু তথ্য পুলিশের কাছে এসেছে। প্রাথমিকভাবে এ হত্যাকাণ্ড কোনো ডাকাতি বা দস্যুতা ওই রকম ঘটনা মনে হচ্ছে না। ঘটনাটি পরিবারিক বা জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে হতে পারে। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট একযোগে কাজ করছে। দ্রুতই ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করা হবে।

গতকাল সকালে বাহাদুরপুর গ্রামে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায় নিহতদের মরদেহ বাড়ির আঙিনায় ঢেকে রাখা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের শিকার গৃহবধূ পপি সুলতানার (৩০) মা সাবিনা বেগম মেয়ে, জামাতা ও দুই নাতনির মরদেহের পাশে আহাজারি করছিলেন।

আহাজারি করতে করতে সাবিনা বেগম বলেন, ‘১৩-১৪ বছর আগে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। একটা ছেলে আর একটা মেয়ে হয়েছে। ছেলেটা মাদ্রাসায় পড়ে। মাদ্রাসায় পড়বে না দেখে ৮ দিন আগে বাড়িতে চলে আসে। মেয়ের বিয়ের পর থেকে তার ননদরা আমার মেয়ের সঙ্গে অশান্তি করে। এক বাচ্চা হওয়ার পরে মেয়ে যখন বেড়াতে যায় তখন তারা তালাক পাঠায়। তখন বলি আমার মেয়েকে সংসার করাব না এখানে। ওর ননদরা মিলে গ-গোল করে কিন্তু আমার জামাইয়ের এক কথা আমি নেব, সংসার করব। জামাইয়ের ওপর ভরসা করে মেয়েকে আবারও পাঠাই।’ তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার মেয়েকে তারা বহুদিন থেকে নির্যাতন করছে। জমির ভাগাভাগি নিয়ে ওরা ৫ বোন মিলেই আমার মেয়ে-জামাই, নাতি-নাতনিকে মেরে ফেলেছে।’

সাবিনা বেগম জানান, ‘বিয়ের পর থেকেই পপি সুলতানাকে নির্যাতন করা হয়। কয়েকদিন আগে মেয়ের এক ননদ তার স্বামী ও ছেলের বউ মিলে পপিকে মারধর করে। থানা ওদের অভিযোগ নিলেও পপির পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ নেয়নি। থানা থেকে ঘুরে এসে গ্রামের মানুষের কাছে বিচার দেন পপির স্বামী। গ্রামের মানুষ তখন আপস মীমাংসা করে দেন। পপির স্বামী হাবিবুর রহমান তার বাবার একমাত্র ছেলে। তার পিতা তাকে বাড়ি-ভিটা মিলে ১০ বিঘা জমি দেন। আর তার পাঁচ মেয়েকে আড়াই বিঘা করে জমি লিখে দেন। এটা নিয়েই তাদের হিংসা শুরু হয়। তখন থেকেই তারা এর বংশকে নির্বংশ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাতে দুই নাতি আর মেয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। প্রতিদিনই কথা বলি। মেয়ে আমাকে জানায় মা তোমার নাতি পিঠা খাবে। তখন মেয়েকে বলি বানাইয়ে দেও তাহলে, বলে মা রাত হয়ে গেছে কালকে বানায়ে দেব। মেয়ের সঙ্গে কথা না বলে ঘুমাই না। প্রতিদিন ওদের সঙ্গে কথা বলি।’

নিহত হাবিবুরের বৃদ্ধ বাবা নমির উদ্দিন (৭০) বলেন, ‘আমার ছেলে, বউমা আর দুই নাতি রাতে একই ঘরে ঘুমাইছিল। আর আমি অন্য ঘরে ঘুমাইছিলাম। কখন তাদের মাইরে গেছে আমি কিছুই জানতে পারিনি। সকালে বাড়ির বাইরের দরজা খোলা দেখে এক প্রতিবেশী বাড়িতে ঢুকে প্রথমে আঙিনায় বউমার লাশ দেখে চিৎকার করে। তার চিৎকার শুনে আমার ঘুম ভাঙে। উঠে দেখি আঙিনায় বউমার রক্তাক্ত লাশ। আর ঘরের ভেতর ছেলে ও দুই নাতির লাশ। আমার ছেলে, তার পরিবারকে শেষ করে দিছে।’

নিহত হাবিবুরের স্বজন ও প্রতিবেশীরা জানান, হাবিবুর পেশায় একজন গরু ব্যবসায়ী ছিলেন। গত সোমবার মান্দার চৌবাড়িয়া হাটে গরু বিক্রি করতে গিয়েছিলেন হাবিবুর। তার কাছে থাকা গরু বিক্রির টাকা লুট করার জন্য এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে বলেও কেউ কেউ ধারণা করছেন।

নিয়ামতপুর থানার ওসি মাহবুবুর রহমান জানান, ‘নিহতদের প্রত্যেকের মাথায় ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে মাথায় আঘাত করার পর হাবিবুর ও দুই সন্তানকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। হাবিবুরের স্ত্রী প্রাণ বাঁচানোর জন্য দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তখন বাড়ির আঙিনায় মাথায় আঘাত ও গলা কেটে হত্যা করা হয়।

নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নওগাঁ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।’

ওসি মাহবুবুর রহমান আরও জানান, ‘হত্যার ধরন দেখে, পূর্বশত্রুতার জেরে এই হত্যাকাণ্ড হতে পারে বলে মনে হচ্ছে। এ বিষয় মাথায় নিয়ে তদন্ত চলছে।’

নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানান, নওগাঁ জেলা পুলিশ পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে এই ঘটনা তদন্ত করছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম), জেলা গোয়েন্দা শাখা এবং নিয়ামতপুর থানা পুলিশের সমন্বয়ে তিনটি পৃথক পৃথক টিম এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে এবং আসামি গ্রেপ্তারে তৎপর রয়েছে।