পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সমুদ্রসৈকতের তীরে পর্যটকের জন্য আকর্ষণীয় অনিন্দ্য সুন্দর পর্যটন নগরী গড়ে তোলা হয়েছে। এ খাতে বিপুল বিনিয়োগ করে মুনাফাও ঘরে তুলছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ব্রাজিলের রিওডি জেনেরো থেকে শুরু করে মিয়ামি ও পানামা সিটি; ইউরোপের বার্সেলোনা কিংবা এশিয়ার বুসান, সিঙ্গাপুর ও মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই এর বড় দৃষ্টান্ত। তবে এর মধ্যে হংকং, মোনাকো, বেনিডর্ম ও রিওডি জেনেরোর অনেক অংশ সৈকতে সুউচ্চ ভবন নির্মাণের জন্য প্রাকৃতিকভাবে উপযোগী হলেও দুবাই, সিঙ্গাপুর, মিয়ামি ও পানামা সিটিকে প্রকৌশলগতভাবে উপযোগী করা হয়েছে। এসব সিটির আদলে বাংলাদেশের কক্সবাজারকেও এশিয়ার অন্যতম আঞ্চলিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার। এজন্য ২০ বছর মেয়াদি নতুন মাস্টারপ্ল্যান তৈরির কাজ চলছে।
তবে কক্সবাজারের মাটি সুউচ্চ ভবন নির্মাণের জন্য কতটা উপযোগী তা ইতিপূর্বে বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা হয়নি। সম্প্রতি কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এই কাজটি সম্পন্ন করেছে। তবে এখনো ওই গবেষণার ফল হাতে পায়নি। এরই মধ্যে সরকারের দুজন মন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, কক্সবাজারকে এশিয়ার অন্যতম আঞ্চলিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। তারা দাবি করেন দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সমুদ্রশহর কক্সবাজারকে ঘিরে এই উদ্যোগ।
গবেষণা বলছে, কক্সবাজার কিংবা কুয়াকাটা অঞ্চলে সাধারণত বালু, পলি ও নরম সামুদ্রিক মাটির আধিক্য রয়েছে। তাই সেখানে ৩০ তলা বা তার বেশি উচ্চতার ভবন নির্মাণ করতে হলে বিস্তৃত ভূ-প্রযুক্তিগত অনুসন্ধান করে শক্ত ভারবহনক্ষম স্তর বা শিলায় পৌঁছানো পর্যন্ত গভীর পাইল ফাউন্ডেশন দরকার হতে পারে। এসব স্থানে হাইরাইজ ভবন নির্মাণ অসম্ভব নয়, তবে এটি তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যয়বহুল এবং প্রকৌশলগতভাবে বেশি চ্যালেঞ্জিং।
গত ২৩ জুলাই সচিবালয়ে কক্সবাজারের সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে উপকূলীয় এলাকায় উন্নয়ন কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে যে ৫০ মিটার ও ৫০০ মিটারের বিধিনিষেধ আছে, তা পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
কক্সবাজারের ভূ-প্রকৃতি এবং বন, পরিবেশ ও মেরিন জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার স্বার্থে এলাকাভেদে নির্দিষ্ট (৫০ থেকে ৫০০ মিটার) দূরত্বের মধ্যে সুউচ্চ ভবন বা অবকাঠামো নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি আসে পরিকল্পিত নগর উন্নয়নে তৈরি প্রথম ২০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানে (২০১১-২০৩১)। সে সময় নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর ও স্থানীয় কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ওই মাস্টারপ্ল্যানটি করেছিল। পরে ২০১৬ সালে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কক্সডিএ) প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু নগর উন্নয়নে আজোবধি আগের ওই মাস্টারপ্ল্যানের শর্তগুলো প্রতিপালন করে আসছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ওই বিধিনিষেধ সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গড়ে ওঠে অসংখ্য হোটেল ভবন ও অন্য স্থাপনা। তোয়াক্কা করা হয়নি সংশ্লিষ্ট পরিবেশ ও বন আইনও। কক্সডিএ ওইসব ভবন ও স্থাপনা অপসারণে উদ্যোগ নিয়েও সফল হয়নি। কারণ, সেগুলোর নির্মাণকারীরা তৎকালীন সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট ছিল। একপর্যায়ে ২০ বছর মেয়াদি ওই পুরনো মাস্টারপ্ল্যান সংশোধন করে নতুন করে আরেকটি ২০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নেয় সরকার। গত দুবছরে নতুন মহাপরিকল্পনা তৈরির কাজ এগিয়েছে, তবে সম্পন্ন হয়নি।
এ বিষয়ে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অধিশাখা) আবুল বাকের মো. তৌহিদ দেশ রূপান্তরকে জানান, নতুন মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন করতে আরও প্রায় এক বছর লাগবে। কক্সডিএর উপ-নগর পরিকল্পনাবিদ মো. তানভীর হাসান রেজাউল জানান, মাস্টারপ্ল্যানটি প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন করতে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি করতে আবেদন করা হয়েছে। এবারের মাস্টারপ্ল্যান গুণগত মানে আগেরটার চেয়ে উন্নত হবে। কারণ, এবার সৈকতসহ বিভিন্ন এলাকা জোনিং করে মাটি পরীক্ষা করা হয়ে গেছে। তবে, বিস্তারিত রিপোর্ট পাওয়া যায়নি, এটি পেলে নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা করাটা আগের তুলনায় সহজ ও বিজ্ঞানসম্মত হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. হারুন অর রশিদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোস্টাল এলাকায় স্থাপত্য নির্মাণের বিষয়টি নির্ভর করে মাটির ওপর। তাই মাটি পরীক্ষা করা ছাড়া এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। এটি নির্ভরযোগ্য সংস্থা দিয়ে করা হলে দীর্ঘমেয়াদের জন্য কল্যাণকর হবে। তারপরও কথা থাকে। মাটি পরীক্ষায় সুউচ্চ ভবন নির্মাণ করা গেলেও উপকূলীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার স্বার্থও প্রাধান্য দিতে হবে।
জার্নাল অব অ্যাডভান্সড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি রিসার্চ থেকে জানা যায়, কোস্টাল বা মেরিন এলাকায় সুউচ্চ ভবন ও ভারী স্থাপনা নির্মাণ করতে মাটির প্রকৃতি, লোড সক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ পানির স্তরসম্পর্কিত গবেষণা প্রাধান্য দিতে হয়। রিসার্চগেট সূত্র থেকে জানা গেছে, এক্ষেত্রে সামুদ্রিক পরিবেশ ও সমুদ্রসৈকতের প্রতিবেশ সংরক্ষণে বিশ্বের সর্বোত্তম চর্চাগুলো সমন্বিত ব্যবস্থাপনা (ইন্টিগ্রেটেড ম্যানেজমেন্ট), জলবায়ু-সহনশীল পরিকল্পনা ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। প্রধান কৌশলগুলোর মধ্যে রয়েছে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা প্রতিষ্ঠা, স্থলভাগ থেকে সমুদ্রে বর্জ্যপ্রবাহ মাত্রা শূন্যে কমিয়ে আনা, টেকসই মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং ম্যানগ্রোভ বন, বালিয়াড়ি ও অন্য গুরুত্বপূর্ণ জীবের উপকূলীয় আবাসস্থল পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ করা।
এদিকে, বাংলাদেশ সরকার পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী ১৯৯৯ সালে কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতসহ বিভিন্ন এলাকাসহ সুন্দরবন, সুনামগঞ্জ ও ঝিনাইদহের মোট ৮ লাখ ৬ হাজার হেক্টর অঞ্চলকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া-ইসিএ) ঘোষণা করে। ইসিএ আওতাধীন এলাকায় নিষিদ্ধ করা হয় ভূমি ও পানির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট বা পরিবর্তন করতে পারে এমন সব কাজ; পরিবেশ দূষণকারী শিল্প বা প্রতিষ্ঠান স্থাপন; মাছ ও অন্য জলজ প্রাণীর ক্ষতিকারক কার্যকলাপ; প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল ধ্বংসকারী কাজ; বন ও গাছপালা কর্তন; বন্যপ্রাণী শিকার ও হত্যা; ঝিনুক, কোরাল, কচ্ছপ বা অন্য বন্যপ্রাণী ধরা বা সংগ্রহ করা।
কক্সবাজারকে সর্বাধুনিক সুযোগসুবিধাসহ পর্যটনকেন্দ্র তৈরিতে সরকারের নতুন মাস্টারপ্ল্যান সম্পর্কে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার ঘোষিত ইসিএ’র আলোকে অধিদপ্তর কার্যক্রম পরিচালনা করে। জাতীয় স্বার্থে কক্সবাজারের উন্নয়নে সরকার চাইলে ইসিএ পরিবর্তন করতে পারে।
এদিকে, অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশ ছোট দেশ। তাই পরিকল্পিতভাবে বহুতল উন্নয়ন উৎসাহিত করতে হবে। অন্যথায় শিল্পাঞ্চল, জলাধার ও কৃষিজমি রক্ষা করা কঠিন হবে। বিশ্বের বড় পর্যটন নগরীগুলোও বহুতল ভবনভিত্তিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। কক্সবাজারেও সেই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করা হবে। তিনি জানান, কক্সবাজার ঘিরে সরকারের বড় পরিকল্পনা আছে। সেখানে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের কাজ এগোচ্ছে, রেল যোগাযোগ চালু হয়েছে। সেই সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে উন্নত সড়ক যোগাযোগ গড়ে তোলা হচ্ছে। এসব অবকাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করে কক্সবাজারকে আধুনিক পর্যটন নগরীতে রূপ দেওয়া হবে। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্যে কক্সবাজারকে অন্যতম প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতকে জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকা শক্তিতে পরিণত করতে সরকার কাজ করছে। বিদেশি পর্যটন আকর্ষণসহ এ খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি এ পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য। কক্সবাজারের সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব অর্থমন্ত্রীকে দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হবে। চলতি বছরের মধ্যে তা প্রস্তুতে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, মাস্টারপ্ল্যানের লক্ষ্য কক্সবাজারকে পর্যটন ও বাণিজ্যিককেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পর্যটন এলাকা নির্ধারণ, মেরিন ড্রাইভ ও উপকূলীয় এলাকার বিদ্যমান বিধিনিষেধ পুনর্বিবেচনা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ চলছে। কক্সবাজারে বিশ্ববিদ্যালয়, আধুনিক গবেষণা ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র, নিরাপদ পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা ও পানি শোধনাগারসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করে কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন ও বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা আছে।