আমির হোসেন-রোকেয়া বেগম দম্পত্তির তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। অভাবের সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে শিশু সন্তানদের স্ত্রীর কাছে রেখে আমির হোসেন পাড়ি জমান মালয়েশিয়ায়। ২৭ বছর ধরে পরিবারের সাথে তার যোগাযোগ বন্ধ ছিল। পরিবারের সদস্যরা কোন খবর পাচ্ছিলেন না। ছয় মাস আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও দেখে রোকেয়া সনাক্ত করেন এটি তার স্বামীর ছবি। এরপর ভিডিও পোস্ট করা ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করে আমির হোসেনের পরিবার। ছয় মাসের প্রচেষ্টার পর মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) গভীর রাতে আমির হোসেন পা রাখেন বাংলাদেশের মাটিতে। দীর্ঘ ৩০ বছর পর আমির হোসেনকে কাছে পেয়ে তার স্ত্রী ও সন্তানেরা আপ্লুত হয়ে পড়েন।
আমির হোসেনের বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার চামটা ইউনিয়নের দিনারা গ্রামে।
তার পরিবারের সদস্যরা জানায়, স্ত্রী ও ছয় সন্তান নিয়ে আমির হোসেনের সংসার। সংসারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে পারিবারিকভাবে পাওয়া কৃষি জমি বিক্রি করে ১৯৯৬ সালে দালালের মাধ্যমে মালয়েশিয়া পাড়ি জমান আমির হোসেন। সেখানে গিয়ে রংমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন। মালয়েশিয়া যাওয়ার পর তিন বছর পরিবারের সাথে তার যোগাযোগ ছিল। সংসার খরচের টাকাও পাঠাতেন প্রতি মাসে। তিন বছর পর হঠাৎ করেই পরিবারের সাথে তার যোগাযোগ বন্ধ। পরিবারের সদস্যরাও তার কোন সন্ধান পাচ্ছিলেন না। আমির হোসেন কোথায় কিভাবে আছেন আদৌ বেঁচে আছেন কিনা তাও জানতেন না পরিবারের সদস্যরা। ছয় মাস আগে মালয়েশিয়ার পেনাংয়ের একটি জঙ্গলে গিয়ে একটা ছোট্ট টিনের ঘরে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় তাকে দেখতে পান দিপু নামে এক প্রবাসী ও প্রবাসী সংবাদ কর্মী বাপ্পি কুমার দাস। সেখান থেকে তারা তাকে উদ্ধার করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেন। ওই ভিডিও দেখে আমির হোসেনের পরিবারের সদস্যরা তাকে সনাক্ত করেন। এরপর তারা ভিডিও পোস্ট কারীর সাথে যোগাযোগ করেন। তাদের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যরা ভিডিও কলে আমির হোসেনের সাথে কয়েক দফা কথা বলেন। এরপর তাকে দেশে ফেরানোর জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা আমির হোসেনের ছবি ও তার দেয়া তথ্য পাঠায় নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে। তার মাধ্যমে তথ্য যাচাই করা হয়। এরপর উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় চামটা ইউনিয়ন পরিষদ হতে আমির হোসেনের জন্ম নিবন্ধন করা হয়। ওই জন্ম নিবন্ধন ও পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন ডকুমেন্ট পাঠানো হয় মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসে। এরপর তাকে সেখান থেকে ট্রাভেল পাস প্রদান করে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা হয়। মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে বাতিক এয়ারের (OD162) ফ্লাইটে মালয়েশিয়া থেকে ঢাকায় পৌঁছান তিনি।
বিমানবন্দরে সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক) ও প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের সহায়তায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও পরিবারের সদস্যরা তাকে গ্রহণ করে। বিমানবন্দরের কার্যক্রম শেষ করে পরিবারের সদস্যরা আমির হোসেনকে নিয়ে যান ঢাকার কেরানীগঞ্জে তার ছোট ছেলে শহীদুল ইসলামের বাসায়। সেখানে তিনি বর্তমানে পারিবারিকভাবে বিশ্রামে রয়েছেন।
আমির হোসেনের স্ত্রী রোকেয়া বেগম বলেন, ৬ শিশু সন্তান রেখে সে মালয়েশিয়ায় যান। তিন বছর পর্যন্ত প্রতি মাসে কম বেশি টাকা পাঠিয়েছেন সংসার খরচের জন্য। হঠাৎ করে তিনি যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। গত ২৭ বছর ধরে তাকে বিভিন্নভাবে খোঁজার চেষ্টা করেছি। কোন সন্ধান পাচ্ছিলাম না। মানুষটা বেঁচে আছেন না মারা গেছেন তাও বুঝতে পারছিলাম না। ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের নিয়ে বিপাকে পড়ে যাই। আত্মীয়-স্বজন ও এলাকার মানুষের সহায়তায় খেয়ে না খেয়ে ছেলে মেয়েদের নিয়ে বেঁচে ছিলাম। ছয় মাস আগে আমার এক ভাই মোবাইলে একটি ভিডিও দেখান, ওই ভিডিও দেখে আমরা তাকে চিনতে পারি। এরপর তাকে ফিরে পাওয়ার জন্য আমাদের আকুতি বেড়ে যায়। আমার সন্তানেরা বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। এভাবে ফেসবুকে একটি ভিডিও দেখে তাকে ফিরে পাবো তা কখনো ভাবতে পারিনি। স্বামীকে এত বছর পর ফিরে পাওয়া আমার জীবনের একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা।
আমির হোসেনের তিন ছেলে ও তিন মেয়ে ছিল। তাদের মধ্যে বড় ছেলে তিন বছর আগে মারা গেছেন। তিন মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। তারা শ্বশুর বাড়িতে থাকেন। আর বেঁচে থাকা দুই ছেলে ঢাকায় শ্রমিকের কাজ করেন। তারা ঢাকার কেরানীগঞ্জ এলাকায় ভাড়া করা একটি বাসায় থাকেন।
আমির হোসেনের ছেলে বাবু তালুকদার বলেন, ১৯৯৬ সালে বাবা যখন মালেশিয়া যান তখন আমার বয়স ছয় বছর। সে সময়কার কেমন কোন স্মৃতি এখন আর আমার মনে নেই। বাবা নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে আমাদের মা ৬ ভাই-বোনকে অনেক কষ্ট করে মানুষ করেছেন। টাকা পয়সার অভাবে আমরা পড়ালেখা করতে পারিনি। শিশু বয়স থেকে শ্রমিকের কাজ করছি। মালয়েশিয়া প্রবাসী দিপু ও সাংবাদিক পাপ্পি কুমার দাসের মাধ্যমে আমার বাবার সন্ধান পেয়েছি। বাবাকে ফিরে পেতে তারা অনেক সহায়তা করেছেন। তাদের প্রতি আমাদের পরিবার অনেক কৃতজ্ঞ। এত বছর পর বাবাকে ফিরে পাব তা কখনো ভাবতে পারিনি। তিনি কিছুটা অসুস্থ, তাই পারিবারিকভাবে বিশ্রামে আছেন। দুই একদিনের মধ্যেই তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান বলেন, ৩০ বছর ধরে একজন প্রবাসে, পরিবারের সদস্যদের সাথে ২৭ বছর ধরে যোগাযোগ না থাকার ঘটনা ভীষণ বেদনাদায়ক। এমন একজনকে পরিবার খুঁজে পেতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেন। এই ফিরে আসা শুধু একজন ব্যক্তির নয়, একটি পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষার সমাপ্তি।
তবে এই ঘটনা প্রবাস জীবনের অনিশ্চয়তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। একজন মানসিক ভারসাম্যহীন কিন্তু কেউ তার খোঁজ জানে না। অতীতেও আমরা এমন ঘটনা দেখেছি। এমন সংকটে আরো কতজন আছে তাও আমরা জানি না। অথচ প্রত্যেক প্রবাসীর খোঁজ রাখা জরুরী। এই প্রযুক্তির যুগে প্রত্যেক প্রবাসীর ডাটাবেজ করা অসম্ভব নয় বরং জরুরী। কারণ তারা এই দেশের মানুষ এবং আমাদের অর্থনীতি সচল রাখেন।
নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল কাইয়ূম বলেন, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি দূতাবাসের এক কর্মকর্তা এক ব্যক্তির একটি ছবি ও তার কিছু তথ্য যাচাই করার জন্য আমাদের কাছে পাঠান। আমরা ওই ব্যক্তির পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে তথ্যগুলো যাচাই শেষে আবার মালয়েশিয়া দূতাবাসে পাঠিয়েছি। এখান থেকে তার কিছু ডকুমেন্ট পাঠানোর পরে দূতাবাস থেকে তাকে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। তিনি দেশে ফিরে এসেছেন, পরিবারের কাছে আছেন। ওই ব্যক্তির যেকোনো সমস্যায় উপজেলা প্রশাসন পাশে থাকবে।