নিখোঁজ আমির হোসেন ফিরলেন ৩০ বছর পর

আমির হোসেন-রোকেয়া বেগম দম্পতির তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে শিশুসন্তানদের স্ত্রীর কাছে রেখে আমির হোসেন পাড়ি জমান মালয়েশিয়ায়। ২৭ বছর ধরে পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বন্ধ ছিল। ছয় মাস আগে সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিওতে স্বামীকে দেখতে পান রোকেয়া। এরপর ভিডিও পোস্ট করা ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে তার পরিবার। দীর্ঘ ছয় মাসের চেষ্টার পর মঙ্গলবার গভীর রাতে আমির হোসেন পা রাখেন বাংলাদেশের মাটিতে। ৩০ বছর পর আমির হোসেনকে কাছে পেয়ে স্ত্রী ও সন্তানরা যারপরনাই আপ্লুত।

আমির হোসেনের বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার চামটা ইউনিয়নের দিনারা গ্রামে। পরিবারের সদস্যরা জানান, অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে পারিবারিকভাবে পাওয়া কৃষিজমি বিক্রি করে ১৯৯৬ সালে দালালের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় যান আমির হোসেন। সেখানে গিয়ে রঙমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন তিনি। মালয়েশিয়া যাওয়ার পর তিন বছর পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। সংসার খরচের টাকাও পাঠাতেন প্রতি মাসে। হঠাৎ করেই পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারও আর তার কোনো সন্ধান পাচ্ছিল না। কোথায় কীভাবে আছে, আদৌ বেঁচে আছে কিনা তাও জানত না। ছয় মাস আগে মালয়েশিয়ার পেনাংয়ের একটি জঙ্গলে গিয়ে একটা ছোট্ট টিনের ঘরে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় তাকে দেখতে পান দিপু নামের এক প্রবাসী এবং প্রবাসী সংবাদকর্মী বাপ্পি কুমার দাস। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে সামাজিক মাধ্যমে ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেন তারা। ওই ভিডিও দেখে আমিরের পরিবারের সদস্যরা তাকে শনাক্ত করেন। এরপর তারা ভিডিও পোস্টকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যরা ভিডিওকলে আমির হোসেনের সঙ্গে কয়েক দফা কথা বলেন। এরপর তাকে দেশে ফেরানোর জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা আমির হোসেনের ছবি ও তার দেওয়া তথ্য পাঠায় নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে। তার মাধ্যমে তথ্য যাচাইয়ের পর উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় চামটা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আমির হোসেনের জন্ম নিবন্ধন করা হয়। তার পর বিভিন্ন ডকুমেন্ট পাঠানো হয় মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসে। এরপর সেখান থেকে ট্রাভেল পাস দিয়ে তাকে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়। মঙ্গলবার রাত ১২টা ২০ মিনিটে বাতিক এয়ারের ফ্লাইটে ঢাকায় পৌঁছেন তিনি।

বিমানবন্দরে সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি ও প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কের সহায়তায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও পরিবারের সদস্যরা তাকে গ্রহণ করে। পরে তাকে ঢাকার কেরানীগঞ্জে তার ছোট ছেলে শহীদুল ইসলামের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়।

আমির হোসেনের স্ত্রী রোকেয়া বেগম বলেন, ‘ছয় শিশুসন্তান রেখে সে মালয়েশিয়ায় যায়। তিন বছর পর্যন্ত প্রতি মাসে কমবেশি টাকা পাঠিয়েছে। হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। গত ২৭ বছর ধরে তাকে বিভিন্নভাবে খোঁজার চেষ্টা করেছি।

মানুষটা বেঁচে আছে না মারা গেছে তাও বুঝতে পারছিলাম না। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে বিপাকে পড়ে যাই। আত্মীয়স্বজন ও এলাকার মানুষের সহায়তায় খেয়ে না খেয়ে ছেলেমেয়েদের নিয়ে বেঁচে ছিলাম। তাকে ফিরে পাব কখনো ভাবতে পারিনি।’

আমির হোসেনের বড় ছেলে তিন বছর আগে মারা গেছেন। তিন মেয়ের বিয়ে হয়েছে, তারা শ্বশুরবাড়িতে থাকেন। দুই ছেলে ঢাকায় শ্রমিকের কাজ করেন। তারা ঢাকার কেরানীগঞ্জ এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকেন।

আমির হোসেনের ছেলে বাবু তালুকদার বলেন, ‘১৯৯৬ সালে বাবা যখন মালয়েশিয়া যান, তখন আমার বয়স ছয় বছর। সেই সময়কার কোনো স্মৃতি এখন আর আমার মনে নেই। বাবা নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে আমাদের মা ছয় ভাইবোনকে অনেক কষ্ট করে মানুষ করেছেন। টাকাপয়সার অভাবে আমরা পড়ালেখা করতে পারিনি। শিশু বয়স থেকে শ্রমিকের কাজ করছি। মালয়েশিয়া প্রবাসী দিপু ও সাংবাদিক বাপ্পি কুমার দাস আমার বাবাকে ফিরে পেতে অনেক সহায়তা করেছেন। তাদের প্রতি আমাদের পরিবার অনেক কৃতজ্ঞ।’

আমির হোসেন কিছুটা অসুস্থ। দুই-একদিনের মধ্যেই তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে। ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান বলেন, ৩০ বছর ধরে একজন প্রবাসে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ২৭ বছর ধরে যোগাযোগ না থাকার ঘটনা ভীষণ বেদনাদায়ক। এমন একজনকে খুঁজে পেতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেন। এই ফিরে আসা শুধু একজন ব্যক্তির নয়, একটি পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষার সমাপ্তি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই ঘটনা প্রবাসজীবনের অনিশ্চয়তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। একজন মানসিক ভারসাম্যহীন কিন্তু কেউ তার খোঁজ জানে না। এমন সংকটে আরও কতজন আছে তাও আমরা জানি না। অথচ প্রত্যেক প্রবাসীর খোঁজ রাখা জরুরি। এই প্রযুক্তির যুগে প্রত্যেক প্রবাসীর ডাটাবেজ করা অসম্ভব নয়; বরং জরুরি। কারণ তারা এই দেশের মানুষ এবং আমাদের অর্থনীতি সচল রাখেন।’

নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল কাইয়ূম বলেন, ‘আমির হোসেন দেশে ফিরে এসেছেন, পরিবারের কাছে আছেন। তার যেকোনো সমস্যায় উপজেলা প্রশাসন পাশে থাকবে।’