মজুরের ঘামে কাঠের সেতু

কুড়িগ্রামের উলিপুরের আবদুল করিম পেশায় একজন কুলি শ্রমিক। মজুর হয়েও তিনি স্থাপন করলেন এক অনন্য নজির। ২৫ বছরের জমানো টাকায় নির্মাণ করলেন একটি কাঠের সেতু। বুড়ি তিস্তা নদীর ওপর প্রায় ১২০ ফুট দীর্ঘ এই সেতু নির্মাণ করতে ব্যয় হয় প্রায় ৩ লাখ টাকা। ২৫ বছর ধরে তিনি সঞ্চয় করেছেন ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। নিজের মোটরসাইকেল বিক্রি করে পেয়েছেন ২০ হাজার টাকা। আর পরিচিত এক নারীর কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন ১ লাখ টাকা। এই টাকায় নির্মাণ করেছেন স্বপ্নের সেতু। সেতুর অভাবে দুই যুগের বেশি সময় এই এলাকার মানুষ ঝুঁকি আর ভোগান্তি নিয়ে চলাচল করছিলেন। সেতু নির্মাণের ফলে এলাকাবাসীর দুর্ভোগের অবসান হলো।

আবদুল করিম বলেন, ‘উলিপুর রেলস্টেশনের পাশের রেলসেতুটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। চলাচলের অনুপযোগী এই রেলসেতুটি মানুষ ব্যবহার করতে বাধ্য হতো। এতে প্রতিনিয়ত ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটত। রেলসেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় মানুষের চলাচলেও কষ্ট হতো। অনেক জনপ্রতিনিধিকে বিষয়টি জানালেও কেউ এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। ফলে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন থেকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এই সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিই।’

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন সেতু নির্মাণের ফলে এখন এলাকাবাসী নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করতে পারছেন। আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষও এতে উপকৃত হচ্ছেন। আগে এই পথে চলাচল ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, অসুস্থ রোগী এবং শ্রমজীবী মানুষের জন্য এটি ছিল বড় দুর্ভোগের কারণ। বর্তমানে সেতুটি চালু হওয়ায় তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা অনেক সহজ হয়ে এসেছে। গত ১৭ এপ্রিল মা রাখেলা বেগম (৬৫) কে সঙ্গে নিয়ে আবদুল করিম সেতুটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এ উপলক্ষে সেতুর নিচে এক দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। মাহফিলে এলাকার সহস্রাধিক মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

জানা গেছে, উলিপুর পৌরসভার জোনাইডাঙ্গা এলাকার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের প্রয়াত ফয়জার মিয়ার ছেলে আবদুল করিম। বয়স ৪৫ বছর। অভাব অনটনের কারণে তিনি কুলির কাজ বেছে নেন। প্রতিদিন তার আয় পাঁচশ থেকে সাতশ টাকা। পরিবারে তার স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। দুই ছেলে ঢাকায় গার্মেন্টসে কাজ করেন। অভাবের মধ্যেও তিনি স্বপ্ন দেখেন নিজ এলাকার মানুষের দুর্ভোগ নিরসনে সেতু নির্মাণের। ফলে প্রতিদিনই তিনি অর্থ জমাতে থাকেন। আর সেই টাকায় কুড়িগ্রামের এক নিভৃত গাঁয়ে গড়ে ওঠে এই সেতু।