চার বছরের শিশু আবিদ ছুটছে, হাতে ছোট্ট একটি পানির পাত্র। ভাটা নেমেছে, এখনই পানি সংগ্রহ না করলে আর পাওয়া যাবে না। কারণ, কিছুক্ষণ পরই জোয়ার আসবে, আর জোয়ার এলেই একমাত্র টিউবওয়েলটি ডুবে যাবে লবণাক্ত পানির নিচে। এটা কোনো দুর্যোগ-পরবর্তী দৃশ্য নয়, কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী উপকূলের মানুষের প্রতিদিনের বাস্তবতা।
উপকূলীয় বেড়িবাঁধ বিলীন হয়ে গ্রামগুলো অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। জোয়ারের পানি এখন সরাসরি ঢুকে পড়ে মানুষের বসতভিটায়। ওই এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, ভাঙা ঘরবাড়ি, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ইট, বালু ও কংক্রিটের স্তূপ এবং উপড়ে পড়া গাছপালা- সব মিলিয়ে এক ভগ্নদৃশ্য। হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন মেগা প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দু মাতারবাড়ী ও ধলঘাট এখন অনেকের কাছে ‘সিঙ্গাপুর’ বা ‘দ্বিতীয় টুঙ্গিপাড়া’ নামে পরিচিত। কিন্তু এই উন্নয়নের ঝলকানির আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ বাস্তবতা- অরক্ষিত বেড়িবাঁধ, যা পুরো জনপদকে ঠেলে দিচ্ছে ঝুঁকির মুখে।
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে এই এলাকায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। সেই আতঙ্ক আজও মানুষের মনে জ¦লজ¦লে। একের পর এক সরকার আসে যায়, কিন্তু এখানকার মানুষের একটি টেকসই বেড়িবাঁধের প্রত্যাশা কখনোই পূরণ হয় না। নানা আশ্বাসেই আটকে থাকে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, ভাঙা বেড়িবাঁধ আবারও যেকোনো সময় বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর এ উপজেলায় ৮৩টি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। তবে দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে এর মধ্যে ৩৮টি এখন ব্যবহারের অনুপযোগী। প্রায় ৪ লাখ মানুষের এই উপজেলায় আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম।
মাতারবাড়ীতে ৫ কিমি বেড়িবাঁধ বিলীন : মাতারবাড়ী ইউনিয়নের পশ্চিম পাশে প্রায় আট কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে অন্তত পাঁচ কিলোমিটার এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভাঙা। সাইটপাড়া, নয়াপাড়া, দক্ষিণ সাইডেইল, উত্তর সাইডেইল ও জাল্লাপাড়া এলাকায় নিয়মিত জোয়ারের পানি ঢুকে মানুষের বসতভিটা প্লাবিত করছে।
স্থানীয় জেলে নেজাম বলেন, ‘আমরা প্রায় নিঃস্ব। আগে সমুদ্র ছিল অনেক দূরে, এখন ধীরে ধীরে সব গিলে ফেলছে। বর্ষা এলেই অন্যের বাড়িতে গিয়ে থাকতে হয়।’
৬১ বছর বয়সী সাহানারা বেগম বলেন, ‘ছোট্ট একটি ঘরই এখন শেষ আশ্রয়। প্রতিবার জোয়ার এলে মনে হয় এই বুঝি সব ভেঙে নিয়ে যাবে। নিরাপদ বেড়িবাঁধই ছিল আমাদের একমাত্র চাওয়া, কিন্তু তা আজও হয়নি। আগের ঘরটিও সাগর নিয়ে গেছে। এখন যেটি মাথা গোঁজার একমাত্র সম্বল, সেখানেও প্রতিনিয়ত ঢেউ লাগে।’
মাতারবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু হায়দার বলেন, ‘উন্নয়ন আছে, কিন্তু নিরাপত্তা নেই। দেশের গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্প এখানে, অথচ মানুষ মৌলিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত। দীর্ঘদিনের অবহেলায় বেড়িবাঁধ প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। এই অঞ্চলে একদিকে ভাঙা বেড়িবাঁধের ঝুঁকি, অন্যদিকে আশ্রয়কেন্দ্রের তীব্র সংকট এই দ্বিমুখী ঝুঁকিতে বসবাস করছে মানুষ।’
ধলঘাটে ক্ষতিগ্রস্ত ৩ কিমি বাঁধ : ধলঘাট ইউনিয়নের মহরীঘোনা, সরইতলা, ভারতঘোনা ও সাপমারা ডেইল এলাকায় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে তিন কিলোমিটার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।
মগডেইল এলাকার কাউছার আহমদ বলেন, ‘এখন পেটের ভাতের চেয়েও বেশি দরকার বেড়িবাঁধ। তিন দশক ধরে শুধু একটি বেড়িবাঁধ চেয়েছি, তাও স্বপ্নই রয়ে গেল। বাপ-দাদার ভিটা সমুদ্র নিয়ে গেছে, এখন প্রায় বেকার আমরা।’
ধলঘাট ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আতাহার ইকবাল দাদুল বলেন, ‘জোয়ারে এলাকা প্লাবিত হয়, অনেক পরিবার পাহাড়ি এলাকায় গিয়ে বসবাস করছে। প্রকল্প আমাদের অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের তেমন কর্মসংস্থান হচ্ছে না। ফলে বেকারত্ব বাড়ছে।’
কুতুবজোম ও বড় মহেশখালীতেও ভাঙন : কুতুবজোম ও বড় মহেশখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায়ও ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। কুহেলিয়া নদী ও বঙ্গোপসাগরের তা-বে অনেক এলাকা ক্রমেই অরক্ষিত হয়ে পড়ছে। মুদিরছড়া এলাকার হালিমা খাতুন বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় এলে ঘরে পানি উঠে যায়। ছোট বাচ্চাদের নিয়ে কোথায় যাব।’ কুতুবজোম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কামাল বলেন, ‘বর্ষার আগে বাঁধ মেরামত না হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে।’
মহেশখালীর ইউএনও ইমরান মাহমুদ ডালিম বলেন, ‘অরক্ষিত বেড়িবাঁধের বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে। বর্ষার আগে জরুরি মেরামতের চেষ্টা চলছে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সালাহ উদ্দিন আহমদ জানান, ‘স্বল্পমেয়াদি মেরামতের পাশাপাশি জাইকার সহায়তায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’