কুমিল্লায় দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ে পল্লী বিদ্যুতের প্রায় ২১ লাখ গ্রাহক চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতির কারণে জেলার গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। এতে একদিকে জনজীবনে দুর্ভোগ বাড়ছে, অন্যদিকে শিল্প উৎপাদন ও বোরো মৌসুমের সেচকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) নাঙ্গলকোট উপজেলার মক্রবপুর ইউপির মক্রবপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী আমেনা আক্তার প্রচন্ড গরমে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। পরে শিক্ষকরা তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।
জানা গেছে, জেলার ১৭টি উপজেলার গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) চারটি সমিতির মাধ্যমে এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে। এসব এলাকায় প্রায় ১৮ লাখ গ্রাহক রয়েছে। অন্যদিকে কুমিল্লা নগরীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), যেখানে লোডশেডিং তুলনামূলক সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে।
তবে গ্রামীণ এলাকায় পরিস্থিতি ভিন্ন। চলমান ভ্যাপসা গরমে দিনে ও রাতে মিলিয়ে ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন গ্রাহকেরা। বিশেষ করে গভীর রাতে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে।
পল্লী বিদ্যুৎ সূত্র জানায়, বর্তমানে গ্রাহকদের চাহিদার তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। উৎপাদন কম থাকায় চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এতে সেচপাম্পগুলো সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে, যা বোরো ধান চাষে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
নাঙ্গলকোট উপজেলার মৌকরা ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, এ সময়ে নিয়মিত পানি না দিলে বোরো ধানের ক্ষতি হবে। লোডশেডিংয়ের কারণে সেচপাম্প চালাতে পারছি না।
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতেও। কুমিল্লা বিসিক শিল্পনগরীর উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ ও ডিজেল সংকটে অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। জেনারেটর চালানোর সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে কুমিল্লা বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক মো. মুনতাসীর মামুন বলেন, আমাদের ১৪১টি শিল্পকারখানা বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমান পরিস্থিতিতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকদের অভিযোগ, দিনে দুই থেকে তিন ঘণ্টা এবং রাতে তিন থেকে চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এতে গরমে শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, সরবরাহ ঘাটতির কারণেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর মহাব্যবস্থাপক মো. রাশেদুজ্জামান জানান, দিনে চাহিদা ১০০ মেগাওয়াটের বেশি হলেও সরবরাহ কম থাকায় প্রতিদিন গড়ে ৩০ শতাংশের বেশি লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
সমিতি-২ এর মহাব্যবস্থাপক দীলিপ চন্দ্র চৌধুরী বলেন, তাঁদের এলাকায় কিছু বিদ্যুৎ ভারতের ত্রিপুরা থেকে সরাসরি আসায় তুলনামূলক লোডশেডিং কম হলেও ঘাটতি রয়েই গেছে।
সমিতি-৩ এর মহাব্যবস্থাপক মো. মুজিবুল হক জানান, তাদের এলাকায় প্রতিদিন গড়ে ৪০ মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতি রয়েছে এবং ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
সমিতি-৪ এর মহাব্যবস্থাপক মো. শহীদ উদ্দিন বলেন, চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে। ফলে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ সময় লোডশেডিং রাখতে হচ্ছে।
অন্যদিকে কুমিল্লা পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, নগরীতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো। ত্রিপুরা গ্রিড থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ পাওয়ায় এখানে লোডশেডিং কম হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ ঘাটতির এই সংকট দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছেন কুমিল্লার গ্রামীণ গ্রাহকেরা।