ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগর এবং আন্তঃজেলা বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১১ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর সরকার বাসের ভাড়া সমন্বয় করল। অতিরিক্ত ভাড়ার বোঝা না চাপানোর কারণে যাত্রীরা খুশি হলেও বাসমালিকরা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে ভাড়া পুনর্নির্ধারণ চায়।
গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন মহাসড়ক বিভাগের সম্মেলনকক্ষে সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, নতুন এ ভাড়া বৃহস্পতিবার থেকেই কার্যকর হবে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়া/কমার সঙ্গে পরবর্তী সময় বাসভাড়া সমন্বয় করা হবে।
এই ভাড়া বৃদ্ধির ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বাস ভাড়া ২ টাকা ৪২ থেকে ১১ পয়সা বাড়িয়ে করা হয়েছে ২ টাকা ৫৩ পয়সা। আন্তঃজেলার বাসে ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে ১১ পয়সা বাড়িয়ে করা হয়েছে ২ টাকা ২৩ পয়সা। এ ছাড়া ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) এলাকার ক্ষেত্রে ২ টাকা ৩২ পয়সা ভাড়া ছিল। অর্থাৎ ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের এলাকার এ ভাড়া ১১ পয়সা বাড়িয়ে ২ টাকা ৪৩ পয়সা করা হয়েছে। সর্বনিম্ন ভাড়া যা আগে ছিল, সেটাই আছে ১০ টাকা। এ হিসেবে ঢাকা চট্টগ্রাম মহানগরে বাসভাড়া ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, আন্তঃজেলায় ৫ দশমিক ১ শতাংশ ও ডিটিসিএ এলাকায় ৪ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে।
শেখ রবিউল আলম বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে সরকার দীর্ঘসময় জ্বালানির দাম না বাড়ানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ডিজেলে প্রতি লিটারে প্রায় ১৫ টাকা বাড়াতে হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। ফলে ভাড়া সমন্বয়ের দাবি উঠেছে। এ বিষয়ে পরিবহন মালিক, সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী এবং ভোক্তা প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক দফায় বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রেলভাড়া ও লঞ্চভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি এবং বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় নেই বলে জানান মন্ত্রী।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ বাসমালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখানে কোনো বাসভাড়া বাড়ানো হয়নি। শুধু তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের যেসব যৌক্তি দাবি ছিল, সেগুলো তিন-চার মাস পর বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি বৃদ্ধির মধ্যে নতুন করে মানুষের ওপর যাতে চাপ না বাড়ে, সে জন্য আমাদের অনুরোধ করা হয়েছে। আমরা মানুষের সুবিধার জন্য সেটি মেনে নিয়েছি।
এদিকে ভাড়া নির্ধারণে বাসমালিকদের জনবিরোধী দাবির কাছে নতিস্বীকার না করে দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থ প্রাধিকার দেওয়ায় বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি।
গতকাল জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে বাসভাড়া ১১ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী এক বার্তায় সরকারের কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। এর পাশাপাশি তিনি সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, বাড়তি বাসভাড়া আদায় বন্ধে অনুরূপ দৃঢ়প্রতিজ্ঞা কামনা করেন।
যাত্রীকল্যাণ সমিতির বার্তায় বলা হয়, ডিজেলের মূল্য মাত্র ১ টাকা বাড়লেও নানা খাতে অযৌক্তিক হিসেব ধরে ভুয়া ব্যয় বিশ্লেষণ করে বাসমালিক সমিতি ৬৪ শতাংশ ভাড়া বাড়ানোর জন্য নানাভাবে পাঁয়তারা করে সরকারকে চাপ দিতে থাকে।
এতে বলা হয়, ২০২২ সালের আগস্টে ডিজেলের মূল্য এক লাফে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১১৪ টাকা করায় তখন বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ৪০ পয়সা বা ২২ শতাংশ বাড়ানো হয়। সেই বর্ধিত ১১৪ টাকা লিটারের ডিজেলের মূল্য কয়েক দফায় কমতে কমতে ১০০ টাকা হলে সরকার তিন দফায় ৮ পয়সা বাসভাড়া কমালেও কোনো বাসে কমানো ভাড়ার সুবিধা পায়নি দেশের যাত্রীসাধারণ। এই কমানো ভাড়া সুফল যাত্রীরা পাচ্ছে কি না, এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের তদারক ছিল না।
এবার ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়। অর্থাৎ ১ টাকা বাড়ানোর কারণে সরকার ডিটিসিএ এলাকার বাসে ৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ, দূরপাল্লার বাসে ৫ দশমিক ১৯ শতাংশ, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর সিটি বাসে ৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ ভাড়া বাড়িয়েছে। অতীতে সরকার বাসমালিকদের খুশি রাখতে নানা অজুহাতে দফায় দফায় ভাড়া বাড়িয়ে দিলেও বাসমালিকরা সরকারের বেঁধে দেওয়া ভাড়ার কয়েকগুণ বেশি ভাড়া আদায় করে।
যেহেতু বাসভাড়া নির্ধারণ কমিটি, আঞ্চলিক পরিবহন কমিটিসহ পরিবহন পরিচালনার সরকারি সবকটি কমিটি বাসমালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের নিয়ন্ত্রণে, সেহেতু বাড়তি বাসভাড়ার তালিকা তৈরিতে জালিয়াতি, বিভিন্ন রুটে কিলোমিটার বেশি দেখানো, গুরুত্বপূর্ণ ওঠানামা পয়েন্টে স্টপেজ না দেখিয়ে সর্বশেষ গন্তব্যের ভাড়া আদায়ের নামে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অপকৌশল নিতে পারেন বাসমালিকরা এমন শঙ্কা প্রকাশ করে অপকৌশল বন্ধের দাবি জানান যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। একই সঙ্গে সিএনজিচালিত বাসে ডিজেলচালিত বাসের হারে বর্ধিত ভাড়া আদায় বন্ধ করার দাবি জানান তিনি।