দেশজুড়ে চলমান তীব্র লোডশেডিংয়ে জনমানুষের ভোগান্তির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘আমি দেশবাসীর কাছে আজকে এই মহান সংসদে দাঁড়িয়ে এ জন্য তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। একই সঙ্গে সারা দেশের কৃষি উৎপাদনের কথা মাথায় রেখে রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন পরীক্ষামূলক লোডশেডিংয়ের পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। এদিকে চলমান জ্বালানি তেল ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় কৌশল নির্ধারণে সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে ১০ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান।
জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকার ও বিরোধী দলের পৃথক কমিটি : দেশের চলমান জ্বালানি সংকটের সমাধানের সুপারিশ করতে সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে ১০ সদস্যের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এরই মধ্যে তিনি জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে সভাপতি করে সরকারি দলের পাঁচ সদস্যের কমিটির কথা জানিয়েছেন। বিরোধী দলকে পাঁচ সদস্যের নাম দিতে অনুরোধ করেছেন। গতকাল জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় এ কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। এর আগে গত বুধবার জ্বালানি সংকট নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি দল এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সবাই আলোচনা করে একমত হয়েছিলাম, এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা, সারা বিশ্বেই এই সমস্যার উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা তার বক্তব্যে উদ্বেগ জানিয়েছেন এবং প্রস্তাব দিয়েছেন, উনাদের কাছে কিছু পরামর্শ আছে, সরকারি দল এবং বিরোধী দল একসঙ্গে সেই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করা যায়।’
সংসদ নেতা বলেন, ‘বিএনপি সবসময় দেশের স্বার্থে, দেশের মানুষের স্বার্থে যেকোনো আলোচনা, যে কারও সঙ্গে করতে প্রস্তুত রয়েছে। সে প্রেক্ষাপটে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমাদের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি। আর বিরোধীদলীয় নেতা এবং বিরোধী দল যদি পাঁচজনের নাম দেন, তাহলে এই ১০ জন বসে এই বিষয়গুলোর ওপর আলোচনা করতে পারে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো পরামর্শ থাকলে এই কমিটির মাধ্যমে সেটি সরকারের কাছেও এলো এবং সেটার মধ্যে কোনো বাস্তবতা থাকলে অবশ্যই সেটি কার্যকর করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
কমিটির সভাপতি হিসেবে থাকছেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। অন্য চার সদস্য হলেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, এ বি এম আশরাফ উদ্দিন (নিজান), মঈনুল ইসলাম খান এবং মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু।
সংসদ নেতা বলেন, ‘আমি বিরোধীদলীয় নেতাকে অনুরোধ করব উনাদের পক্ষ থেকে নামগুলো যদি দ্রুত দেন, তাহলে কমিটি দ্রুত কাজ শুরু করতে পারবে।’
পরে বিরোধীদলীয় নেতাকে ফ্লোর দেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। আশা করি, এই সংসদ জাতীয় সব সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু হবে এবং আমরা মনে করি, এই সংসদের জন্য এটি একটি নবযাত্রা। এটাকে সাধুবাদ জানাই এবং আমরা শিগগিরই নাম দেব।’
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আশা করি অতি অল্প সময়ের মধ্যে বিরোধী দলের নেতা পাঁচজন সদস্যের নাম দেবেন। কারণ, এই সংসদ (অধিবেশন) এ মাসের শেষেই শেষ হবে। আপনাদের এই বক্তব্যের ফলে জনগণের মনে অনেক আশা সঞ্চার হয়েছে। সরকার এবং বিরোধী দল এভাবে যদি সহযোগিতার মাধ্যমে অগ্রসর হয়, তবে দেশের যেকোনো সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
মাগরিবের নামাজের বিরতির পরে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান জানান, সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ায় তাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এই কমিটিতে সরকারি দলের পাঁচজন সদস্যের পাশাপাশি বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও পাঁচজন সদস্যের নাম ঘোষণা করেন। কমিটির জন্য প্রস্তাবিত বিরোধীদলীয় সদস্যরা হলেন সাইফুল আলম খান (ঢাকা-১২), নুরুল ইসলাম (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩), আব্দুল বাতেন (ঢাকা-১৬), মোহাম্মদ আবুল হাসনাত (কুমিল্লা-৪) এবং মুফতি মাওলানা আবুল হাসান (সিলেট-৫)।
পাশাপাশি দেশে চলমান বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকার ঘোষিত ‘লোড ম্যানেজমেন্ট’ বা লোডশেডিং কার্যক্রম জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা থেকেই শুরু করার প্রস্তাব দিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ঢাকায় লোড ম্যানেজমেন্টের যে প্রস্তাব এনেছেন, এটি যেন সংসদ ভবন থেকে শুরু হয়। সংসদ যেন এর বাইরে না থাকে। ঢাকার অন্য অংশে যদি এক ঘণ্টা লোডশেডিং থাকে, তবে এখানেও যেন এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকে।
এখান থেকে (সংসদ) যদি শুরু হয়, তবে দেশের সাধারণ জনগণ বুঝবে যে, আমরা আসলে বাংলাদেশকে একটি ইউনিফর্ম কান্ট্রি (সমমর্যাদার দেশ) হিসেবে গড়ে তুলতে চাচ্ছি।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সংসদ অধিবেশন তো চালু রাখতে হবে, সংসদ বন্ধ করা যাবে না। এর জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা পুনরায় মাইক নিয়ে বলেন, মাননীয় স্পিকার, আমি সংসদ ভবনের কথা বলেছি, সংসদ অধিবেশন চলাকালীন সময়ের কথা বলিনি। অধিবেশনের বাইরেও সংসদ ভবনের অনেক কার্যক্রম থাকে, আমি সেই সময়ের কথা বুঝিয়েছি।
ঢাকায় ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের সিদ্ধান্ত : কৃষকেরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেটা নিশ্চিত করা, লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে রাখা এবং গ্রাম-শহরে বিদ্যুৎবৈষম্য কমাতে রাজধানী ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম এ কথা জানান।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা নেই, এই উত্তপ্ত গরমে অনেককেই বিদ্যুৎ সমস্যায় নাজেহাল হতে হয়েছে। এই সমস্যা এক দিনের নয়। এই পুঞ্জীভূত সমস্যার দায় কোনোভাবেই বর্তমান নির্বাচিত সরকার কিংবা কারও নয়। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের অব্যবস্থাপনার দায় সবাইকে নিতে হচ্ছে।’
বর্তমানে উৎপাদন ক্ষমতা কাগজে কলমে অনেক বেশি থাকলেও বাস্তবতার সঙ্গে সেটির গরমিল রয়েছে বলে উল্লেখ করেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী।
১ মে থেকে আশুগঞ্জ সার কারখানায় গ্যাস দেওয়া হবে : এদিকে দেশের কৃষির কথা চিন্তা করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ সার কারখানায় ১ মে থেকে গ্যাস দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার এক প্রশ্নের জবাবে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, ২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশে গ্যাসের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। প্রেসার কমে যাওয়ার ফলে এখন যেসব বাড়িঘরে বিদ্যুৎ-গ্যাসের লাইন আছে এবং যেসব ইন্ডাস্ট্রিতে লাইন আছে সেসব জায়গায় প্রেসার কমের জন্য সরবরাহ কমে গেছে। সেজন্য আমরা এখন শুধু উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার জন্য যতখানি পারছি গ্যাস সরবরাহ করছি।
সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, জ্বালানিমন্ত্রী সঠিক বলেছেন, গত ১৫ বছরে আসলে কোনো রকম জ্বালানির অনুসন্ধান হয়নি। কিন্তু সুখবরও আছে। তিতাস গ্যাস ক্ষেত্রের ১১ কিলোমিটার এলাকায় ৯টি স্থানে ২৭টি কূপ আছে। এর মধ্যে ২২টি কূপ থেকে গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। এসব কূপ থেকে দৈনিক গড় ৩৩৩.৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হয়েছে, এটি আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে।
রুমিন ফারহানা বলেন, আমাদের আশুগঞ্জের যে সার কারখানা আছে, সেখানে গ্যাস সংযোগের অভাবে কারখানাটি বন্ধ হয়ে গেছে। মন্ত্রী যদি অন্তত সার কারখানায় গ্যাসটা দেন তাহলে আমি আমার এলাকার মানুষের কাছে একটু মুখ দেখাতে পারি। জবাবে মন্ত্রী বলেন, সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাকে একটা সুখবর দিতে চাই, যদিও বিদ্যুতের উৎপাদনে আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তারপরও দেশের কৃষির কথা চিন্তা করে আমরা ১ তারিখ থেকে ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরিতে গ্যাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।