১১০০ মানুষের মৃত্যুর মামলা এখনো চলছে

তেরো বছর আগে এই দিনে ধসে পড়েছিল ঢাকার অদূরে সাভারের ‘রানা প্লাজা’। বেশ কিছু পোশাক কারখানা ছিল ভবনটিতে। ভয়াবহ সেই ঘটনায় ১১০০-এর বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। আহত হন আরও প্রায় দেড় হাজার মানুষ। কোনো ঘটনায় দেশে এত মানুষের প্রাণহানির ঘটনা সেটিই ছিল প্রথম। তবে রানা প্লাজা ভবনধসের পর হত্যাসহ সংশ্লিষ্ট ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ভবন মালিক সোহেল রানার বিরুদ্ধে হওয়া ছয় মামলার একটিও বিচারিক আদালতের গ-ি পেরোয়নি। কবে নাগাদ বিচার শেষ হবে তারও কোনো ধারণা দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি এক আদেশে সোহেল রানার বিরুদ্ধে হত্যা মামলাটি ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছিল।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ভবনধসে এক হাজার ১৩৬ জন মানুষ মারা যান। যাদের বেশিরভাগ ছিলেন ওই ভবনে থাকা বিভিন্ন পোশাক কারখানার কর্মী। প্রায় এক মাস উদ্ধারকাজ চলে। ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা রেখে ২৯১ জনের অশনাক্ত লাশ জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়। উদ্ধারকৃত জীবিতদের মধ্যে এক হাজার ৫২৪ জন আহত হন। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন ৭৮ জন। ঘটনার পর বোরকা পরে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় ২৯ এপ্রিল বেনাপোল থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। এরপর থেকে আসামি কারাগারে আছেন।

ভবনধসে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলাসহ ছয়টি মামলা হয়। ইমারত নির্মাণ আইন না মেনে ভবন নির্মাণ করায় একটি মামলা করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। ভবন নির্মাণে দুর্নীতি ও সম্পদের তথ্য গোপনসংক্রান্ত দুটি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সোহেল রানার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে আরও দুটি মামলা হয়। এক দশকের বেশি সময়ে শুধু দুদকের করা সম্পদের তথ্য গোপনের একটি মামলায় সোহেল রানার সাজা হয়েছে। ভবন নির্মাণে দুর্নীতির মামলাটি যুক্তিতর্কের শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। তিনটি মামলা রয়েছে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে, আরেকটি মামলায় শুনানি হচ্ছে না। ছয় মামলায় রানাসহ ৫৯ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে ১৭ আসামির নাম সব মামলায় রয়েছে। রানা প্লাজাধসের ঘটনায় করা হত্যা ও ইমারত আইনের মামলা দুটি বিচারের জন্য প্রস্তুত হয় ২০১৬ সালে।

হত্যা মামলায় ১৪৫ জনের সাক্ষ্য : অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে সোহেল রানাসহ ২১ জনকে আসামি করা হয়। এ ছাড়া রানা প্লাজাধসে নিহত হওয়ার ঘটনাকে হত্যাকা- আখ্যায়িত করে আদালতে আরেকটি মামলা করেন গার্মেন্টস শ্রমিক জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী শিউলি আক্তার। আদালতের নির্দেশে এটিকে অবহেলাজনিত মৃত্যু মামলার সঙ্গে একীভূত করে তদন্ত করে সিআইডি। আদালতে করা হত্যা মামলার বাদী শিউলি আক্তার এখন পুলিশের মামলার সাক্ষী। এ মামলায় মোট ৫৯৪ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।

২০১৬ সালের ১৮ জুলাই এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ঢাকার জেলা ও দায়রা আদালত। চার্জশিটভুক্ত ৪১ আসামির মধ্যে সোহেল রানা কারাগারে। আসামি রানার বাবা আব্দুল খালেক ও তার মা মর্জিনা বেগম ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন। বর্তমানে সাভার পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. রেফাত উল্লাহসহ মোট ১৩ আসামি পলাতক রয়েছেন এবং বাকি ২৫ আসামি বিভিন্ন সময় হাইকোর্ট থেকে জামিনপ্রাপ্ত হয়ে জামিনে রয়েছেন। বর্তমানে মামলাটি ঢাকার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত-৮-এ বিচারাধীন। ইতিমধ্যে ১৪৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করেছে আদালত। ৩০ এপ্রিল মামলাটির পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য রয়েছে। হত্যা মামলাটি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ফয়সাল মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাক্ষ্যগ্রহণের সর্বশেষ ধাপে রয়েছে। আশা করছি, চলতি বছরের মধ্যেই রায় হতে পারে।’ আসামি রানার আইনজীবী মাসুদ খান খোকন বলেন, ‘আসামি দীর্ঘ দিন ধরে কারাগারে আছেন। আমরা চাই মামলাগুলোর দ্রুত একটা সমাধান হোক। আসামি যাতে ন্যায়বিচার পায় সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।’

ভবন নির্মাণে দুর্নীতি ও ইমারত আইনে দুটি মামলা : রানা প্লাজা ভবনটি ষষ্ঠতলা অনুমোদন থাকলেও দুর্নীতির মাধ্যমে ১০ তলায় রূপান্তরের অভিযোগে দুদকের পক্ষে মামলা হয়। তদন্ত শেষে ২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। মামলাটি ঢাকার বিভাগী স্পেশাল জজ আদালতে বিচারাধীন। আগামী ১৭ মে যুক্তিতর্কের শুনানির জন্য দিন ধার্য আছে। এ মামলায় মোট ২০ সাক্ষীর মধ্যে ১৯ জনের সাক্ষ্য নেয় আদালত। ২০২৫ সালের ১৯ মে থেকে প্রায় এক বছর ধরে মামলাটি যুক্তিতর্ক শুনানির পর্যায়ে রয়েছে।

ইমারত বিধিমালা না মেনে ভবন নির্মাণের অভিযোগে সোহেল রানাসহ ১৩ জনকে আসামি করে সাভার মডেল থানায় মামলা করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। তদন্ত শেষে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সোহেল রানা ও তার বাবা-মাসহ ১৮ জনকে আসামি করে ১৯৫২ সালের ইমারত নির্মাণ আইনের ১২ ধারায় অভিযোগপত্র দাখিল করে। এ মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে ১৩৫ জনকে। ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালত বিচারিক ক্ষমতা বলে হত্যা মামলাটির পাশাপাশি ইমারত নির্মাণ আইনের মামলাটিও বিচারের আদেশ দেয়। তবে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে মামলাটি যাওয়ার পরও এখন পর্যন্ত কোনো তারিখ পড়েনি। এ মামলার আসামি রানার বাবা-মা মারা যাওয়ায় এখন আসামি ১৬ জন। তাদের মধ্যে ১৫ জন জামিনে।

অস্ত্র আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে দুটি মামলা : রানা প্লাজা ভবনধসের পর ঢাকা মাহনগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ ধামরাই থানায় অস্ত্র আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে দুটি মামলা করে। এ দুটি মামলায় সোহেল রানাকে একমাত্র আসামি করা হয়। বর্তমানে মামলাটি দুটি প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। মামলা দুটিতে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ৩০ এপ্রিল দিন ধার্য রয়েছে। এ মামলায় রানার আইনজীবী মো. বদরুল ইসলাম জুয়েল বলেন, ‘পাঁচ বোতল ফেনসিডিলের উদ্ধারের ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলা দেওয়া হয়েছে, যা সঠিক হয়নি। আমরা দ্রুতবিচার নিষ্পত্তি চাই।’

এ পাঁচ মামলার বাইরে রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানার বিরুদ্ধে সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে দুদকের করা মামলাটিই কেবল নিষ্পত্তি হয়েছে। এ মামলায় ২০১৭ সালের ২৯ আগস্ট সোহেল রানাকে তিন বছরের কারাদ- ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও তিন মাসের কারাদ-ের আদেশ দেন ঢাকার বিশেষ জজ-৬-এর আদালত। এ ছাড়া সোহেল রানার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে আরও একটি মামলা হয়। তবে এ মামলার সবশেষ অবস্থা নিয়ে নিশ্চিত তথ্য জানা যায়নি।