বইচত্রি

চেনাজানা সব জীবন পদ্ধতি যখন আর আকর্ষণ করে না, জিভে স্বাদহীন অনুভূতি—কবিতা কি তখন পারে নতুন করে প্রেমের জন্ম দিতে? শামীম কবীর কবিতার কাছেই জীবনের স্বাদ খুঁজে পেতে চেয়েছিল, অল্প বয়স থেকেই কবিতার সঙ্গে সহবাস। ক্যাডেট কলেজের জীবনে কবিতা ছিল তার কাছে বাঁচার উৎস। অল্প বয়সেই কবিতার সব নিয়ম-নীতি, ধর্ম জেনে নিজের মতো ভাষা তৈরি করে নিয়েছিল। নিজের সিগনেচার তৈরি করতে একজন কবির যুগের পর যুগ কেটে যায়। অথচ শামীম ষোলো-সতেরো বছর বয়সেই নিজস্ব স্টাইলে লিখতে শুরু করে। নব্বইয়ের দশকে শামীম সমসাময়িক কবি বন্ধুদের তুলনায় ভিন্ন এক উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিল। দুই বাংলায় কবিতা পাঠকরা খুঁজে নিয়েছিল নিজস্ব ভাষার দক্ষ কবিকে। ১৯৯০ সালে শামীম যখন ঢাকায় তরুণ কবিদের আড্ডায় নিমগ্ন—তখনই তার সঙ্গে পরিচয়।

ঢাকা থেকে প্রকাশিত নদী পত্রিকায় প্রথম পড়ি শামীম কবীরের কবিতা। অনেকের মধ্যে একজন অথবা অন্যতম হিসেবে প্রথমেই চিহ্নিত হয় এই কবি। প্রান্ত, একাবিংশ,  দ্রষ্টব্য, বিপ্রতীক, রূপম ইত্যাদি পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে কবিতা। ধনেশ পাখির মতো গম্ভীর অথচ ভেতরে ভেতরে অশান্ত কবির অবয়ব। সেঁকোবিষ আর পোড়া মদ দিয়ে তৈরি যার তারুণ্য—করতোয়ার স্রোতহীন জলের সঙ্গে নিরুপম কথোপকথনের পর সে গেঁথে চলেছিল একটার পর একটা কবিতার ব্রিজ। একমুখী সে ব্রিজে ভরশূন্য পরিভ্রমণ। নাগরিক সমাজের চর্মহীন কঙ্কাল, অর্থহীনত্ব সব যেন একাকার হয়ে মিশে আছে শামীমের কবিতায়। ফরাসি কবি বোদলেয়ার, র‌্যাবোর মানসিক গঠনের সাথে শামীমের কোথায় যেন একটা যোগাযোগ। তবে তার নিজস্ব জীবন দৃষ্টিভঙ্গি, ভাষারীতিও নিজস্ব। কারও অনুকরণ করেনি শামীম, অন্য কবিদের তেমন প্রভাব নেই তার কবিতায়। পূর্বসূরি কবিদের ধারাবাহিকতায় নাগরিক কবিদের মহাযাত্রায় শামীম কবীর হেঁটে চলেছেন বহুপথ। মৃত্যু তার চলাকে থমকে দেয়নি। আজও নতুন নতুন অর্থ তৈরি হচ্ছে কবিতার। নতুন পাঠক, কাব্য সমালোচকরা প্রতিনিয়ত আবিষ্কার করছেন কবিতার ভেতরকার প্রেম-অপ্রেম, ঘৃণা, ঝঞ্জা, বিক্ষুব্ধতা, শান্ত সমাহিত মন। একজন কবি প্রতি মুহূর্তে বেঁচে থাকে তার কবিতার মধ্যে। যে কবিতা আর নতুন কিছু ভাবায় না—তা সেখানেই শেষ হয়ে যায়, কিন্তু কিছু কবিতা চিরকালের, সব সময়ের কথা বলে। শামীম কবীর তেমনই বিরল কবিদের একজন।

এই কবি মনমানস ছিল আধুনিক। ঔপনিবেশিক মন-মানসিকতা ও আগ্রাসী, বৈষম্যমূলক চিন্তা কাঠামোকে শামীম তার কবিতায় কুঠারাঘাত করেছে। নিজস্ব জীবনযাপন ও চিন্তাভাবনায় অগ্রসর এই তরুণ কবি সামাজিক-পারিবারিক কাঠামোতে কিছুটা অগ্রহণযোগ্য বলেই বিবেচিত ছিল। বোহেমিয়ান চরিত্র, স্বল্পায়ু জীবনে তাকে থিতু হতে দেয়নি। কবিতায় শামীমের উচ্চারণ তাই এমন—‘ফেরার সময় দেখি/ অকস্মাৎ ঝাঁক ঝাঁক স্তন প্রদর্শনী/ মুরতির মতো শব/ প্রাচীন ঘরের আড়া/ শাদা কালো/ বহুতলা/ যুদ্ধাগত গোড়ালির উড়ো উপকথা ভেদ করে/ এলোমেলো হয়ে তুমি এলে।’ এমন সব আপ্তবাক্য লেখার পর কবিতার ধ্যানে নিমজ্জিত হয়ে থাকত, নতুন নতুন শব্দের প্রেমে বিনির্মাণ করে চলত আরও নতুন নতুন ভাষা বন্ধনী। নিবিড়ভাবে এসব ঘটে চলত তার ভেতরে স্বাভাবিকভাবে। কোনো আরোপণ নয়, এমনকি কবিতা লেখাকে বিশেষ কিছু মনে করত না শামীম। কেউ ঘুড়ি ওড়ায়, কেউ কাঠ ছাঁচে, কেউ রান্না করে এমন সহজাত একটি বিষয় হিসেবেই কবিতাকে দেখত।

শামীম কবীরের স্বেচ্ছামৃত্যুর একত্রিশ বছর পর আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত হলো শামীম কবীর স্মারকগ্রন্থ। শামীম বাংলা কবিতায় একজন অনিবার্য এবং গুরুত্বপূর্ণ কবি। দ্রষ্টব্য থেকে শামীম কবীর সমগ্র, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন ও উড়কি থেকে শামীম কবীরের নির্বাচিত কবিতা প্রকাশিত হলেও চলে যাওয়ার এত বছর পর তাকে নিয়ে অনেকের আগ্রহ, কবিতা সম্পর্কে জানতে চাওয়া, ব্যক্তিগত বিষয়গুলো, কবিতা নিয়ে অন্যদের ভাবনা একত্রে প্রকাশ খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল। আমার বিশ্বাস, পুরোটা না হলেও এই স্মারকগ্রন্থে সেসবের কিছুটা সুরাহা হবে।