কর্মের আলোয় অনন্ত স্মরণ

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০১:২১ এএম

সময়কে অতিক্রম করে কিছু মানুষ তাদের হয়ে ওঠেন একটি প্রতিষ্ঠানের, একটি পরিবারের কিংবা একটি শিল্পযাত্রার প্রতীক। আনোয়ার হোসেন ছিলেন একজন দূরদর্শী উদ্যোক্তা। তার চিন্তা, শ্রম, সততা ও নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে শিল্প-বাণিজ্যের এক শক্ত ভিত, যার বিস্তৃতি বহমান। ব্যবসাকে কেবল মুনাফার মাধ্যম হিসেবে নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার দায়িত্ব হিসেবেও দেখেছেন তিনি। তার কর্মময় জীবন নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। সময় পরিক্রমায় তার সৃষ্টি, আদর্শ ও অবদানই তাকে বাঁচিয়ে রাখবে মানুষের স্মৃতিতে। তাই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তাকে স্মরণ একজন স্বপ্নদ্রষ্টা উদ্যোক্তা, একজন নির্মাতা ও একজন অনুপ্রেরণাদাতা হিসেবে।

পুরান ঢাকার আমলীগোলায় আগেকার সকাল নিশ্চয়ই এখনকার মতো ছিল না। এত গাড়ির শব্দ ছিল না, আকাশছোঁয়া ভবন ছিল না, শহরের ব্যস্ততাও ছিল অন্যরকম। সরু রাস্তা, পুরনো দালান, কাছাকাছি থাকা মানুষ আর ব্যবসা-বাণিজ্যের চিরচেনা কোলাহলমুখর পরিবেশ। এ রকম এক পরিবেশে ১৯৩৮ সালের ৩০ অক্টোবর জন্মেছিলেন আনোয়ার হোসেন। কে জানত, জগন্নাথ সাহা রোডের এক পরিবারের ছোট ছেলেটি একদিন বাংলাদেশের শিল্প, ব্যবসা ও ব্যাংকিং জগতের পরিচিত নাম হয়ে উঠবেন।

তার জীবনের শুরুতে অবশ্য এমন ভবিষ্যতের কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। বরং মাত্র সাত বছর বয়সেই তার জীবনে নেমে আসে ঝড়। ১৯৪৫ সালে বাবা রহিম বখশ মারা যান। তখন পরিবারের বড় ছেলে নাজির হোসেনের বয়স মাত্র ১৬, মোহাম্মদ হোসেনের ১৩, আর আনোয়ার হোসেন এর বয়স সাত। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান হয়েও হঠাৎ করেই তাদের সামনে এসে দাঁড়ায় অনিশ্চয়তা। সেই সময় পরিবারটিকে যিনি আগলে রেখেছিলেন, তার নাম জামিলা খাতুন, আনোয়ার হোসেনের মা। পরবর্তী জীবনে আনোয়ার হোসেন বহু প্রতিষ্ঠান গড়েছেন, নানাবিধ ব্যবসা পরিচালনা করেছেন, সংসদ সদস্য হয়েছেন। কিন্তু তার জীবনকে কাছ থেকে দেখলে বারবার মনে হয় তার সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানটির ভিত্তি তৈরি করেছিলেন তার মহীয়সী মা।

মায়ের কাছে শেখা প্রথম পাঠ

জামিলা খাতুন ছিলেন তার সময়ের তুলনায় ব্যতিক্রমী এক নারী। নিজের বাড়িতে এলাকার ছেলেমেয়েদের বিনা পারিশ্রমিকে পড়াতেন। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা, ফারসি ও উর্দুও শেখাতেন। অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন, দরিদ্র প্রতিবেশীদের পাশে দাঁড়াতেন। সংসার সামলানোর পাশাপাশি স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও তাকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।

পরিবারে অর্থ ছিল। কিন্তু তিনি অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেদের হাতে সেই সম্পদ তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত জীবন কাটাতে পারেননি।

তার ভয় ছিল, সহজে পাওয়া অর্থ হয়তো ছেলেদের পরিশ্রম থেকে দূরে সরিয়ে দেবে। তাই তিনি তাদের ধীরে ধীরে ব্যবসা ও কাজের মধ্যে নিয়ে এলেন। বড় দুই ভাই পৈতৃক ব্যবসার দায়িত্ব নিতে শুরু করলেন। ছোট আনোয়ার স্কুলে পড়ার পাশাপাশি খুব কাছ থেকে দেখতে লাগলেন ব্যবসার হিসাব, দোকানের ব্যস্ততা, কর্মচারীদের কাজ আর সংসার চালানোর কঠিন বাস্তবতা।

আরেকটি শিক্ষা ছিল আরও গভীর মানুষকে সাহায্য করতে হলে তার আত্মসম্মানটিও রক্ষা করতে হবে। জীবনের অনেক পরে বিশাল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হয়েও মায়ের প্রতি আনোয়ার হোসেনের নির্ভরতার একটি ছোট দৃশ্য বিশেষভাবে মনে রাখার মতো। চকবাজারের দোকানে যাওয়ার আগে তিনি প্রায় প্রতিদিন মায়ের পা ছুঁয়ে সালাম করে দোয়া নিতেন। দোকান, গুদাম ও শোরুমের চাবিও রাখা হতো মায়ের কাছে। রাতে বাড়ি ফিরে দিনের বেচাকেনার খবর জানাতেন তাকে। নিজের প্রতিষ্ঠা নিয়ে তার মূল্যায়ন ছিল সরল সাফল্যের আসল শক্তি ছিল মায়ের দোয়া। এখানেই বোঝা যায়, আনোয়ার হোসেনের কাছে ব্যবসা কখনো শুধু টাকার হিসাব ছিল না; তার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল পরিবার, বিশ্বাস, শৃঙ্খলা ও দায়বদ্ধতা।

ব্যবসার উত্তরাধিকার ছিল, নিজের পথ তৈরি করেছেন নিজেই আনোয়ার হোসেন এমন একটি পরিবারে জন্মেছিলেন, যে পরিবারের ব্যবসার ইতিহাস পুরান ঢাকার বাণিজ্যের ইতিহাসের সঙ্গেই মিশে আছে।

পরিবারের পূর্বপুরুষরা বহু আগে থেকেই চকবাজারকেন্দ্রিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৮৩৪ সালে তার পূর্বপুরুষ লাট মিয়া চকবাজারে  দোকানভিটা ইজারা নেন। সে সময় শিং থেকে চিরুনি ও বোতাম তৈরির ব্যবসা ছিল পরিবারের অন্যতম কাজ। তার বাবা রহিম বখশ সেই ব্যবসাকে বড় করেন; চল্লিশের দশকে কাপড়ের ব্যবসাতেও প্রবেশ করেন। আনোয়ার হোসেনের হাতে যখন ব্যবসার সুযোগ আসে, তার সামনে দুটি পথ ছিল। একটি পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া ব্যবসা ধরে রাখা। অন্যটি সেই ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে নিজের মতো করে নতুন কিছু তৈরি করা।

তিনি দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিয়েছিলেন। তরুণ আনোয়ারের ব্যবসায়িক জীবনের একটি ঘটনা তার চরিত্র সম্পর্কে অনেক কিছু বলে। ব্যবসা একটু বড় করার জন্য একসময় তার প্রয়োজন হলো অতিরিক্ত পুঁজির। পরিবারের এক নিকটাত্মীয়ের কাছে পরিকল্পনার কথা খুলে বললেন। পেলেন ২০০ টাকা ঋণ। পুরো টাকাটিই অগ্রিম দিয়ে কাপড় কিনলেন। বেশি পণ্য হাতে থাকায় ক্রেতা বাড়তে লাগল। তার ‘আনোয়ার ক্লথ স্টোর’ দ্রুত বড় হতে শুরু করল। পরে নিজের দোকানটি কিনে নিলেন; একে একে পাশের আরও ছয়টি দোকানও কিনে ব্যবসার পরিধি বাড়ালেন। ২০০ টাকা খুব বড় অঙ্ক নয়। কিন্তু উদ্যোক্তার গল্পে পুঁজির চেয়ে কখনো কখনো গুরুত্বপূর্ণ হয় সেই পুঁজি দিয়ে মানুষ কী করল।

আনোয়ার হোসেনের ক্ষেত্রে ২০০ টাকার ঋণটি যেন সেই মানসিকতার প্রতীক যা আছে, তা নিয়েই শুরু করতে হবে; সুযোগ তৈরি হলে সেটিকে বড় করতে হবে।

কৈশোরের কষ্টকর সময় পেরিয়ে বয়স বিশের ঘরে পৌঁছাতেই তিনি আর্থিকভাবে শক্ত অবস্থান তৈরি করে ফেলেছিলেন। কিন্তু শুধুই সফল কাপড় ব্যবসায়ী হয়ে থাকা তার লক্ষ্য ছিল না। তার সামনে তখন আরও বড় স্বপ্ন ব্যবসায়ী থেকে শিল্পোদ্যোক্তা হওয়ার।

দোকান থেকে কারখানার পথে

পুরান ঢাকার ব্যবসায়িক পরিবারগুলোর অনেকেই তখন মূলত আমদানি, পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্যে অভ্যস্ত। আনোয়ার হোসেন ধীরে ধীরে বুঝেছিলেন, বড় হতে হলে শুধু পণ্য বেচাকেনা নয়, উৎপাদনেও যেতে হবে। সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় শিল্পের পথে তার যাত্রা।

একটি প্রতিষ্ঠানের পর আরেকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকে। সময়ের সঙ্গে সেই উদ্যোগগুলোই বৃহত্তর আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজে রূপ নেয়। ব্যবসার পরিধি শুধু বস্ত্র বা বাণিজ্যে আটকে থাকেনি; উৎপাদনশিল্পের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ে। স্বাধীনতার পর তিনি বড় ছেলে মনোয়ারের নামে মনোয়ার ইন্ডাস্ট্রিজ প্রাইভেট লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে স্টেইনলেস স্টিলের কাটলারি ও এনামেলের তৈজসপত্র উৎপাদন শুরু হয়। তার উদ্যোক্তা-জীবন অবশ্য কেবল সাফল্যের সরল ঊর্ধ্বমুখী রেখা ছিল না। ব্যবসার ক্ষতি হয়েছে। বিনিয়োগ হারিয়েছেন। প্রতিষ্ঠান নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। কখনো আবার নতুন করে শুরু করতে হয়েছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলোর একটি আসে ১৯৭১ সালে।

ব্যবসার হিসাব পাল্টে দিল যুদ্ধ

স্বাধীনতার আগে আনোয়ার হোসেনের ব্যবসা শুধু পূর্ব পাকিস্তানে সীমাবদ্ধ ছিল না। করাচি, লাহোর ও লায়ালপুরসহ পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় তার দোকান ও অফিস ছিল; করাচিতে বাড়ি ও গাড়িও ছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পশ্চিম পাকিস্তানে থাকা সেই ব্যবসা ও সম্পদ তিনি হারান।

দেশের ভেতরেও ক্ষতি কম হয়নি

একসময় তার মোট ৯টি গদি ছিল বিভিন্ন স্থানে। যুদ্ধ শেষে দেখা গেল বহু ব্যবসায়ী তার কাছে ঋণী, অথচ অনেকের দোকান লুট হয়েছে, পুড়ে গেছে, ব্যবসা শেষ হয়ে গেছে। শুধু চকবাজারেই প্রায় ৪২০ জন ব্যবসায়ীর কাছে তার প্রায় ২০ লাখ টাকা পাওনা ছিল। এমন সময় একজন ব্যবসায়ী চাইলে শুধু পাওনা টাকার হিসাবটিই দেখতে পারেন। কিন্তু তার সামনে আসা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী যখন জানান যে তাদের পক্ষে টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব নয়, সেই যুদ্ধবিধ্বস্ত বাস্তবতার মধ্যেই তাকে নতুন করে মানুষ ও ব্যবসার হিসাব মেলাতে হয়েছিল। নিজেরও বড় ক্ষতি হয়েছে, তবু আবার শুরু করেন। স্বাধীনতার পর নতুন কারখানা, নতুন শিল্প, নতুন বিনিয়োগ আনোয়ার হোসেনের জীবনের দ্বিতীয় বড় উত্থান শুরু হয় যেন এখান থেকেই। একভাবে দেখলে তার ব্যবসায়িক জীবনের মূল কথাটি ছিল খুব সহজ : সব হারালেও আবার শুরু করা যায়।

একটি প্রতিষ্ঠানের বদলে একটি শিল্পগোষ্ঠী

পরবর্তী কয়েক দশকে আনোয়ার হোসেনের নাম বাংলাদেশের শিল্প ও ব্যবসার বিস্তৃত পরিসরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি গড়ে তোলেন আনোয়ার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। সেই সঙ্গে যুক্ত হন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা খাতেও। তার কর্মজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে ছিল নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি এবং সেগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা। নিজের উদ্যোগগুলো বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে কর্মসংস্থানও। জীবনের পরিণত পর্যায়ে এসে তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষ কাজ করতেন। একজন উদ্যোক্তার কাছে ব্যবসার আকার বোঝাতে বিক্রি, সম্পদ কিংবা মুনাফার সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে; কিন্তু শিল্পের আরেকটি পরিমাপ হলো কত মানুষের জীবিকা তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। সে বিচারে আনোয়ার হোসেনের শিল্পযাত্রা শুধু একটি পরিবারের সম্পদ বৃদ্ধির গল্প নয়; বহু মানুষের কর্মজীবনের সঙ্গেও সেই গল্প যুক্ত। আর এ কারণেই তার জীবনকে বুঝতে হলে বাংলাদেশের বেসরকারি শিল্পের বিকাশের সময়টিকেও পাশাপাশি দেখতে হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নতুন অর্থনীতি তৈরি হচ্ছিল। শিল্পোদ্যোক্তাদের সামনে যেমন সম্ভাবনা ছিল, তেমনি ছিল মূলধনের অভাব, প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং বাজারের ঝুঁকি। আনোয়ার হোসেন সেই প্রজন্মের উদ্যোক্তা, যারা এমন অনিশ্চিত সময়েই নতুন কারখানা ও প্রতিষ্ঠান তৈরির ঝুঁকি নিয়েছিলেন।

ব্যাংক গড়ার উদ্যোগেও ছিলেন সামনের কাতারে

শিল্পের পাশাপাশি বাংলাদেশের বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের সূচনালগ্নেও যুক্ত ছিলেন আনোয়ার হোসেন। আশির দশকের শুরুতে দেশে বেসরকারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হলে উদ্যোক্তাদের যে দলটি এগিয়ে আসে, তিনি ছিলেন তাদের একজন। দ্য সিটি ব্যাংক লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ছিলেন তিনি; পরে একাধিক মেয়াদে চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৩ সালের ২৮ মার্চ ব্যাংকটি কার্যক্রম শুরু করে। নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াটি সহজ ছিল না আইন, অনুমোদন, মূলধন, পরিচালনা কাঠামো সবকিছু নিয়েই তখন নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি হচ্ছিল। ব্যাংকিং ছিল তার পারিবারিক ব্যবসার পরিচিত ক্ষেত্র নয়। কিন্তু সম্ভবত এখানেও কাজ করেছে একই উদ্যোক্তা-মন নতুন ক্ষেত্র দেখলে সেটি বোঝার চেষ্টা করা, আর সুযোগ থাকলে সেখানে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি এবং সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও তার উদ্যোক্তা ও নেতৃত্বের সম্পৃক্ততা ছিল।

নিজের ব্যবসার বাইরেও ছিলেন সক্রিয়

ব্যবসায়ী হিসেবে সফল হওয়ার পরও আনোয়ার হোসেন নিজেকে শুধু নিজের কোম্পানির মধ্যে আটকে রাখেননি। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নির্বাহী পরিষদে বিভিন্ন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক ছিলেন। ইসলামপুর বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালকদের একজন হিসেবেও কাজ করেছেন। এই সম্পৃক্ততার তাৎপর্য ছিল অন্য জায়গায়।

তিনি এমন একটি সময়ের ব্যবসায়ী, যখন বাংলাদেশের বেসরকারি খাত নিজেই নিজের ভাষা ও পরিচয় তৈরি করছিল। আজ যে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো নীতি, কর, বিনিয়োগ কিংবা বাণিজ্যের বিষয়ে নিয়মিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে, সেই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার প্রাথমিক সময়টির সঙ্গেও তার কর্মজীবনের যোগ ছিল।

কারখানা থেকে সংসদে

ব্যবসা ছিল তার প্রধান পরিচয়। কিন্তু একসময় রাজনীতিতেও আসেন। ১৯৮৮ সালে ঢাকা-৮ আসন থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন আনোয়ার হোসেন। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি সংসদ সদস্য ছিলেন। এর আগে ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট বর্তমান রাজউকের পূর্বসূরি প্রতিষ্ঠান-এর ট্রাস্টির দায়িত্ব পালন করেন। পুরান ঢাকার সঙ্গে তার সম্পর্ক শুধু জন্মস্থান বা ব্যবসার ঠিকানায় সীমাবদ্ধ ছিল না। লালবাগ, হাজারীবাগ ও কামরাঙ্গীরচরের মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয় ছিল তার।

সংসদ সদস্য থাকাকালে দক্ষিণ ঢাকাকে বন্যার হাত থেকে রক্ষায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং লালবাগের বিভিন্ন সড়কে উন্নত আলোর ব্যবস্থা করার উদ্যোগের কথাও তার রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিতে উঠে এসেছে। রাজনীতি অবশ্য তাকে শেষ পর্যন্ত গ্রাস করেনি। তিনি আবার ফিরে গেছেন তার পরিচিত জগতে ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠান গড়ায়। সম্ভাব্য কারণ, তার কাছে প্রভাব বিস্তারের সবচেয়ে কার্যকর ভাষা ছিল পদ নয়, কাজ।

সম্পদ তৈরি করেছেন, আবার সমাজেও বিলিয়ে দিয়েছেন

আনোয়ার হোসেনের জীবনের আরেকটি বড় অধ্যায় সমাজকল্যাণ। তার উদ্যোগ ও সম্পৃক্ততায় শিক্ষা, চিকিৎসা, শিশু কল্যাণ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক উন্নয়নের নানা উদ্যোগ গড়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠা করেন আলহাজ আনোয়ার হোসেন ফাউন্ডেশন। সিটি ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার প্রতিষ্ঠিত বা পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া উদ্যোগের মধ্যে ছিল দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্র, চক্ষু চিকিৎসাকেন্দ্র, প্রাথমিক বিদ্যালয়, কম্পিউটার সেন্টার এবং শিশুদের শিল্পচর্চার কেন্দ্র।

এই কাজগুলোকে তার ব্যবসাজীবনের বাইরে আলাদা কোনো ‘দানশীলতার অধ্যায়’ হিসেবে দেখলে সম্ভবত পুরো বিষয়টি ধরা যায় না। কারণ মানুষের জন্য কিছু করার যে সংস্কৃতি তিনি পেয়েছিলেন, সেটি ছিল পারিবারিক। তার মা বিনা পারিশ্রমিকে পড়িয়েছেন, গরিব মানুষকে সাহায্য করেছেন। বড় ভাই নাজির হোসেনও দীর্ঘদিন পুরান ঢাকার সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কাজে যুক্ত ছিলেন। অর্থাৎ ব্যবসার পাশাপাশি সমাজের প্রতি দায়িত্ব নেওয়ার ধারণাটি তাদের পরিবারে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বহমান ছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত