সরকার মাসুদ
চাঁদের রাত
যে রাতে জলাভূমির ওপর নেমে আসে
চাঁদের বেলুন,
হিজল গাছ হাত বাড়িয়ে দেয় আলোর
বেলুনের দিকে! ওই রাতে
সরোবরের ওপর দিয়ে হেঁটে যায় চাঁদ
বাগানবাড়ির দোলনা নিজে নিজে দোল খায়!
আর তখন সব দুধ পানি হয়ে যায়
আর আত্মহত্যাপ্রবণ রমণীর এলোচুল
উড়ে যেতে চায় টিলার চূড়ায়,
একটা কাঁটাগাছের নিচে বসে
আমি দেখি চাঁদের মুখভরা অবসাদ
অশ্বত্থের ডালে ডালে পাতা থাকে মনোহর ফাঁদ
ওমর কায়সার
এইবার তুমি ফিরে চলে যাও
কথারা কীভাবে
সুর হয়ে কাঁদে
শুনতে চেয়েছ গানে গানে
চাঁদ কেন এত
নীল হয়ে ওঠে
সাগরের মোহে অঘ্রানে।
বুঝতে চেয়েছ
মানুষের ভাষা
রহস্যভরা গোধূলির
কোলাহলহীন
পূর্ণিমা রাতে
মরীচিকাময় নদীতীর।
কেন যে এসেছ
ভিনগ্রহ থেকে
পৃথিবী ঘুরতে ন-মানুষ
দেখেছ এখানে
লাশ কাঁধে নিয়ে
উল্লাসরত অমানুষ।
এইবার তুমি
ফিরে চলে যাও
মহাশূন্যের বেদুঈন
মানুষ এখন
যুদ্ধবন্দি
পৃথিবীতে বড় দুর্দিন।
অনিকেত সুর
অপেক্ষা
ভিড়ের লোকে হারিয়ে যাবে ভিড়ে
শুধু একটি মানুষ ত্রস্ত ব্যাকুল পায়ে
কাজের শেষে আসবে কাছে ফিরে
তারই জন্য খুলবে দুয়ার, নারী!
খুলবে বলে পরান তোমার প্রণয়মুগ্ধাবেশে
একটি তারা হৃদয়তারা স্তব্ধ সুরের মিড়ে
সন্ধ্যাপথের আকাশ দেবে পাড়ি—
কে সেই পুরুষ, কার কপালে অমন ভাগ্যলেখা?
ছায়াপথের প্রান্তসীমায় আজ কি হঠাৎ
সুলক্ষণা
তার পেয়েছ দেখা?
রওশন আরা মুক্তা
শূন্যক্ষেত্র
বলে কী হবে ভেবে
কত কথা চেপে রেখেছি
ভাষা খুঁজে পাইনি বলে
কতবার চুপ থেকেছি
নিজের ভেতরে হাতড়াতেই দেখি
অন্ত্যমিলের গোঁজামিলে
সরল সত্যগুলো কবর দেওয়া আছে
দিন দিন হাত-পা হয়ে যাচ্ছে
পূর্বনারী-পুরুষদের মতন
বায়ুমণ্ডলে জমা আছে তাদের কথাগুলো
হয়তো নিশ্বাসের শব্দও
প্রতিমুহূর্তে আরেকটা ধ্বংসলীলার শঙ্কায়
ডুবিয়ে রেখেছি পুরো সভ্যতা
খাদ্যের পরতে পরতে মেখে রেখেছি ধোঁকা
পাতায় পাতায় এত বিষ ছড়ানোর পরও
ইট-কাঠের জঙ্গলে মোলায়েম বাতাস ভেসে আসে
কীভাবে আসে এত মায়া এ ধরণীর?
‘কোথা থেকে শুরু হলো সব কিছুর?’
এই একটা প্রশ্নে এসে থামি
‘এও কি সম্ভব?’—এ প্রশ্ন করেই বুঝি
হয়তো বেশি বেশি ভাবছি।
সোহরাব পাশা
বালিকা জানে না
তুমুল ঝড়ো হাওয়ায় ছেঁড়া—
পা-ুর কোলাজ
ধুলোপড়া ঘোর সন্ধেকাল
মেঘের তরঙ্গ,
সন্তাপের অ্যালবাম
নীলপাতা ওড়ে
অন্ধ প্রজাপতির ডানায়
রুগ্ন-রোদ
কী সুন্দর করুণ দহন
ভালোবাসার নিদ্রিত ঘ্রাণে
বিষাদের পিনকোড
জানে না বালিকা
দু চোখে উচ্ছৃঙ্খল মেঘ
পা ফেলতেই অন্ধকারের কাদা।
আফরোজা সোমা
পৌনঃপুনিক
আবার তোমাদের দেখা হবে,
আবার প্রেমে পড়বে।
তোমার শাড়ির আঁচল সিনেমার মতন
আটকে যাবে ওর ঘড়ির ফিতায়;
যেতে গিয়ে হঠাৎ লাগবে টান।
আবার কফিশপে ওর হাতের কফি
ছিটকে পড়বে তোমার গায়ে,
এক বেমক্কা ধাক্কায়।
আবার তোমরা ট্রেনের কামরায়
যেতে পথে গল্পে গল্পে
আটকে যাবে চোখের তারায়।
আবার তোমাদের দেখা হবে,
আবার প্রেমে পড়বে।
অনুভব আহমেদ
মৃত্যুরূপেন সংস্থিতা
খুব ধীরলয়ে মৃত্যুর কাছাকাছি যেতে যেতে
কত দূরে চলে এলাম!
বিস্ময় লাগে, জীবনের বুঝি সমস্তই শীতকাল
সোয়েটার গেছে হারিয়ে ।
ঢেউয়ের ফণায় নাবিকের কিংকর্তব্যবিমূঢ় গান
ত্রাণের জাহাজ বন্দর খুঁজে হয়রান
তবু কত দূর চলে এলাম!
মৃত্যুর দিকেই যাচ্ছে এই জীবনযান।
বাক্যের ক্ষয়ে-ব্যয়ে প্রতিস্থাপিত হব বলে
তবু হাঁটি
শরীরের নির্জনতায় জীবনের আলাপ গাঁথি
শেষে, সব শব্দ ঝরে গেলে—
আমি এক দাঁড়ি হয়ে থামব,
কোনো এক বাক্যের শেষে নিঃশব্দে প্রতিস্থাপিত হব।