বিবিসির অনুসন্ধান

পুলিশের নাকের ডগায় লন্ডনে নারী পাচারের সাম্রাজ্য গড়েছিলেন এপস্টাইন

যৌন অপরাধী ও বিতর্কিত ধনকুবের জেফরি এপস্টাইন তার হাতে নির্যাতিত হওয়া নারীদের লন্ডনের বেশ কয়েকটি ফ্ল্যাটে রাখতেন বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে বিবিসি। ব্রিটিশ পুলিশ তার বিরুদ্ধে তদন্ত না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরবর্তী বছরগুলোতেও তিনি এই কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন।

বিবিসি জানিয়েছে, এপস্টাইন ফাইলসের অন্তর্ভুক্ত রসিদ, ইমেইল এবং ব্যাংক রেকর্ডে কেনসিংটন ও চেলসির মতো অভিজাত এলাকায় চারটি ভাড়া করা ফ্ল্যাটের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ওই ফ্ল্যাটগুলোতে অবস্থান করা অন্তত ৬ জন নারী পরবর্তীতে এপস্টাইনের নির্যাতনের শিকার হিসেবে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করেছেন।

তাদের মধ্যে রাশিয়ার ও পূর্ব ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের অনেক নারী ছিলেন। ২০১৫ সালে ভার্জিনিয়া জুফ্রে লন্ডনে আন্তর্জাতিক পাচারের শিকার হওয়ার অভিযোগ দিলেও মেট্রোপলিটন পুলিশ (মেট) তা তদন্ত না করার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপরই এই নারীদের যুক্তরাজ্যে নিয়ে আসা হয়। মেট পুলিশের দাবি, তারা সে সময় ‘যৌক্তিক তদন্ত’ পরিচালনা করেছিল এবং জুফ্রের অভিযোগের ভিত্তিতে তার একাধিক সাক্ষাৎকার নিয়ে মার্কিন তদন্তকারীদের সাথে সহযোগিতা করেছিল।

ফাইলের ইমেইল থেকে জানা যায়, লন্ডনের ফ্ল্যাটে থাকা কিছু নারীকে এপস্টাইন তার যৌন পাচার চক্রের জন্য অন্য নারীদের নিয়োগ দিতে বাধ্য করতেন। পাশাপাশি ইউরোস্টার ট্রেনের মাধ্যমে তাদের নিয়মিত প্যারিসে এপস্টাইনের কাছে নিয়ে যাওয়া হতো।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ কর্তৃক সংগৃহীত এবং এপস্টাইন ফাইলসের অংশ হিসেবে প্রকাশিত লাখ লাখ পৃষ্ঠার নথি অনুসন্ধান করেছে বিবিসি, যাতে ব্রিটেনে তার কার্যক্রমের একটি বিস্তারিত চিত্র ফুটিয়ে তোলা যায়। নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এপস্টাইনের এই অপারেশনটি আগে যতটা ভাবা হয়েছিল তার চেয়েও বিস্তৃত ছিল-যেখানে আরও বেশি ভিকটিম, আবাসনের মতো সুসংগঠিত পরিকাঠামো এবং পুলিশের সতর্কতা সত্ত্বেও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সীমান্ত জুড়ে নারীদের নিয়মিত আনা-নেওয়া করা হতো। যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ায় ভিকটিমদের গোপনীয়তা রক্ষায় তাদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০০১ সালে ভার্জিনিয়া জুফ্রেকে পাচার এবং অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরের সাথে যৌনকর্মে বাধ্য করার অভিযোগ ছাড়াও ব্রিটিশ পুলিশের কাছে এই ধনকুবেরের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার আরও সুযোগ ছিল। মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর অবশ্য সবসময়ই কোনো ধরনের অন্যায়ের কথা অস্বীকার করেছেন।

বিবিসি নিশ্চিত করেছে যে, ২০২০ সালের শুরুর দিকে দ্বিতীয় একজন নারী মেট পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছিলেন যে তিনি যুক্তরাজ্যে এপস্টাইন কর্তৃক নির্যাতিত হয়েছেন। তবে সেই অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না তা স্পষ্ট নয়। এছাড়া ২০২০ সালে এপস্টাইন কারাগারে মারা যাওয়ার পরপরই ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ জানতে পেরেছিল যে, তিনি লন্ডনের অন্তত একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলেন।

মানবাধিকার আইনজীবী টেসা গ্রেগরি বলেন, এসব তথ্য দেখার পর তিনি ‘স্তম্ভিত’ যে কেন যুক্তরাজ্যে কোনো পুলিশি তদন্ত শুরু হয়নি। তিনি বলেন, যখন মানবপাচারের নির্ভরযোগ্য অভিযোগ থাকে, তখন কোনো ভিকটিম নিজে সামনে না এলেও রাষ্ট্রের আইনি বাধ্যবাধকতা থাকে একটি দ্রুত, কার্যকর এবং স্বাধীন তদন্ত করার।

মেট পুলিশ অবশ্য জানিয়েছে, তারা ইউরোপীয় মানবাধিকার কনভেনশনের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদ (দাসত্ব ও বাধ্যতামূলক শ্রম থেকে মুক্তির অধিকার) অনুযায়ী তাদের দায়িত্ব পালন করেছে বলে আত্মবিশ্বাসী।

তবে মেট পুলিশের সাবেক জ্যেষ্ঠ ডিটেকটিভ এবং যুক্তরাজ্যের প্রথম স্বাধীন দাসত্ব-বিরোধী কমিশনার কেভিন হাইল্যান্ড বলেন, পুলিশ এই যৌন অপরাধীর বিরুদ্ধে তদন্তের সুযোগ হারিয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, মানুষ ক্ষুব্ধ যে কেউ একজন সামনে এসে বলল ‘আমাকে এই লোক পাচার করেছে’, অথচ তাকে নির্বিঘ্নে কাজ চালিয়ে যেতে দেওয়া হলো। পুলিশের মধ্যে এই সিদ্ধান্তটি কে নিয়েছিল?

হাইল্যান্ডের মতে, তদন্ত কর্মকর্তারা ট্রাভেল কোম্পানিগুলোর সাথে কাজ করে ক্রেডিট কার্ড এবং আইপি অ্যাড্রেস ট্র্যাক করতে পারতেন, যারা নিয়মিত একক নারীদের গ্রুপের জন্য টিকিট বুক করত। তিনি বলেন, এপস্টাইন মৃত, কিন্তু এটা স্পষ্ট যে তিনি একা ছিলেন না। আর কারা এর সাথে জড়িত এবং তারা কী অপরাধ করেছে? সবচেয়ে বড় কথা, অন্যদের মাধ্যমে এখনো কি এসব চলছে?

গ্রেপ্তার ও মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাস আগে এপস্টাইন লন্ডনের একটি ফ্ল্যাটে থাকা এক তরুণ রুশ নারীর সাথে স্কাইপে যোগাযোগ করেছিলেন। তিনি তাকে একটি ছবি পাঠিয়েছিলেন যা নথিতে নেই, তবে ধারণা করা হয় সেটি তার নিজেরই ছবি ছিল। ওই নারী রসিকতা করে জানতে চেয়েছিলেন ছবিতে থাকা সুদর্শন ব্যক্তিটি কে। এপস্টাইন উত্তর দিয়েছিলেন যে তিনি তার ‘বাড়িওয়ালা’—তবে অন্য বাড়িওয়ালাদের মতো নন, কারণ তিনি ভাড়া নেওয়ার বদলে ভাড়া দেন।

পরবর্তীতে ওই নারী এপস্টাইনের কাছে লন্ডনে ইংরেজি শেখার ক্লাসের খরচ এবং ফ্ল্যাটের আসবাবপত্র কেনার জন্য টাকা চেয়েছিলেন। তিনি অন্য এক রুশ নারীর আসার বিষয়ে ভিসার পরামর্শও চেয়েছিলেন। ২০১৯ সালের এই কথোপকথন প্রমাণ করে যে, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লন্ডনের নারীদের সাথে এপস্টাইনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল এবং তিনি তাদের জীবনের খুটিনাটি বিষয়ে সম্পৃক্ত ছিলেন।

এপস্টাইন ফাইলসে থাকা পুরনো ছবির বিপরীতে বিবিসি নারীদের ইনস্টাগ্রাম পোস্ট ও রুশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আধুনিক ছবিতে খুঁজে পেয়েছে। স্কাইপ চ্যাটে উল্লিখিত ফ্ল্যাটটির ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া গেছে, যা থেকে ডোরবেলে থাকা নাম দেখে ভিকটিমের লিজ এগ্রিমেন্ট শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। ১০ হাজার পৃষ্ঠার একটি ক্রেডিট কার্ড বিল থেকে আরেকটি ফ্ল্যাটের তথ্য পাওয়া গেছে, যেখানে অবস্থানরত নারীর ব্যক্তিগত খরচ এবং প্রতি মাসে ২ হাজার ডলারের ভাতার তথ্য ছিল। ইমেইল রেকর্ড থেকে চতুর্থ আরেকটি ফ্ল্যাটের অস্তিত্ব নিশ্চিত হওয়া গেছে।

অভিজাত এলাকায় হলেও ফ্ল্যাটগুলো মাঝে মাঝে অত্যন্ত ঘিঞ্জি থাকত এবং নারীদের সোফায় ঘুমাতে হতো। নথিপত্র দেখায়, নারীরা থাকার পরিবেশ নিয়ে অভিযোগ করলে এপস্টাইন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাতেন। একবার তিনি এক নারীকে বলেছিলেন, যদি সে তার জন্য ৬ মাস কাজ করে তবেই তিনি উপহার হিসেবে ভাড়া দেবেন, অন্যথায় একে ঋণ হিসেবে ধরা হবে। অন্য একটি মেসেজে তিনি ওই নারীকে গালিগালাজ করে ‘বেয়াদব’ এবং ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে উল্লেখ করেন।

২০১৯ সালের জুলাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত এপস্টাইন ইউরোস্টার ট্রেনের মাধ্যমে নারীদের যুক্তরাজ্যে আনা-নেওয়া করতেন। ২০১১ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে তিনি নারীদের জন্য অন্তত ৫৩টি টিকিট কিনেছিলেন, যার মধ্যে ৩৩টিই কেনা হয়েছিল ২০১৫ সালে জুফ্রের অভিযোগের পর। এমনকি তার মৃত্যুর শেষ ৬ মাসেও ১০ বার নারীদের লন্ডনে আনা-নেওয়া করা হয়।

প্যারিস প্রসিকিউটরের কার্যালয় ইতোমধ্যে এপস্টাইনের মানবপাচার ও মানি লন্ডারিং নিয়ে দুটি তদন্ত শুরু করেছে। বিবিসি যুক্তরাজ্যে এপস্টাইনের সাথে সংশ্লিষ্ট ১২০টিরও বেশি ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক ফ্লাইটের তথ্য পেয়েছে, যার অনেকগুলোতে ব্রিটিশ ভিকটিমরাও ছিলেন।

বিবিসি এপস্টাইন ও তার সহযোগী গিসলেইন ম্যাক্সওয়েলের হয়ে কাজ করা বেশ কিছু ব্রিটিশ কর্মীকে শনাক্ত করেছে। তাদের মধ্যে একজন চালক এবং ম্যাক্সওয়েলের সহকারী রয়েছেন। ম্যাক্সওয়েল বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। এছাড়া এপস্টাইনের পূর্ব লন্ডনের ফ্ল্যাটে থাকা একজন সাবেক কর্মীকে খুঁজে পাওয়া গেলেও তিনি সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।

২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের বিভিন্ন বিবৃতিতে মেট পুলিশ দাবি করেছে যে, আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষগুলোই এই তদন্তের জন্য যোগ্য ছিল। তারা জানায়, জুফ্রের সাক্ষাৎকার নেওয়া হলেও যুক্তরাজ্যভিত্তিক কারও বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে ২০২০ সালে ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) এফবিআই-এর কাছে ক্লারি হ্যাজেল নামক এক ব্রিটিশ কাউন্টেসের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগের তথ্য পাঠিয়েছিল।

বর্তমানে মেট পুলিশ জানিয়েছে, তারা নতুন করে জাতীয় পর্যায়ে এই তথ্যগুলো মূল্যায়ন করছে, যার মধ্যে লন্ডন বিমানবন্দরগুলোকে পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টিও রয়েছে। তবে ইউরোস্টার বা লন্ডনের ফ্ল্যাটগুলো নিয়ে বিবিসি-র প্রাপ্ত তথ্যের সরাসরি কোনো জবাব তারা দেয়নি।

সারভাইভার লিসা ফিলিপস এই ঘটনার পাবলিক ইনকোয়ারি বা প্রকাশ্য তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। মানবাধিকার আইনজীবী টেসা গ্রেগরিও মনে করেন, কীভাবে এত বছর ধরে জনগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাকের ডগায় এই অপরাধগুলো শনাক্ত হয়নি, তা খতিয়ে দেখতে রাষ্ট্রীয় তদন্ত প্রয়োজন।