খায়রুল আলম সুজন
সাবেক সহসভাপতি বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্রগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর নিঃসন্দেহে অন্যতম। দেশের আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ এই বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়। তাই এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়, জাতীয় অর্থনীতির স্পন্দিত হৃদয়। এই বাস্তবতায় একজন দায়িত্বশীল ফরোয়ার্ডার হিসেবে, বিশেষ করে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েনের (বাফা) সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে আমি এমন একটি বন্দর প্রত্যাশা করি যা হবে আধুনিক, গতিশীল, স্বচ্ছ এবং অংশীদারত্বভিত্তিক।
প্রথমত, বন্দরের কার্যক্রমে গতি ও পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। জাহাজের অপেক্ষার সময় (turnaround time), কনটেইনার হ্যান্ডলিং এবং কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, প্রতিটি ধাপেই সময় কমাতে হবে। এ ক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশনই সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। সম্পূর্ণ অটোমেশন, একক উইন্ডো সিস্টেম এবং রিয়েল-টাইম ডাটা শেয়ারিং চালু হলে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। আমরা এমন একটি ব্যবস্থাপনা চাই, যেখানে একটি কনটেইনার বন্দরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই তার প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছভাবে ট্র্যাক করা যাবে এবং সংশ্লিষ্ট সবাই তাৎক্ষণিক তথ্য পাবে।
ইতোমধ্যে বন্দরের সহযোগিতায় ইলেকট্রনিক ডেলিভারি অর্ডার (EDO) চালু হওয়ায় সেবার মান যেমন উন্নত হয়েছে, তেমনি জাল ডিও (Fake DO) প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে, এটি একটি বড় সাফল্য। এখন প্রয়োজন একই ধারাবাহিকতায় এক্সপোর্ট জেনারেল ম্যানিফেস্ট (EGM) প্রক্রিয়াকে পূর্ণাঙ্গভাবে ডিজিটাল ও বাধ্যতামূলক করা। এর মাধ্যমে রপ্তানির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে এবং জালিয়াতি প্রতিরোধে চট্টগ্রাম বন্দর আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। পাশাপাশি বাল্ক কার্গো ব্যবস্থাপনাতেও সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি, যাতে সামগ্রিক বাণিজ্য প্রবাহ আরও সুষম ও গতিশীল হয়।
দ্বিতীয়ত, বন্দর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। ২০২৫ সালে ট্যারিফ বৃদ্ধির ফলে ব্যবসায়িক ব্যয় বেড়েছে, এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ট্যারিফ পুনর্বিবেচনা করে আরও ব্যবসাবান্ধব কাঠামো প্রণয়ন করা সময়ের দাবি। অপ্রত্যাশিত জটিলতা এবং সিদ্ধান্তহীনতা ব্যবসার গতি কমিয়ে দেয় ও আস্থার সংকট তৈরি করে। পরিষ্কার নীতিমালা, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং জবাবদিহিমূলক কাঠামো বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তৃতীয়ত, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছাড়া বন্দরের টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়। আধুনিক টার্মিনাল, পর্যাপ্ত ইয়ার্ড এবং উন্নত লজিস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে সড়ক ও রেল যোগাযোগ শক্তিশালী করা প্রয়োজন, যাতে পণ্য দ্রুত ও কম খরচে দেশের অভ্যন্তরে পৌঁছাতে পারে। একটি কার্যকর বন্দর মানেই একটি সমন্বিত, দক্ষ ও সংযুক্ত লজিস্টিক নেটওয়ার্ক।
তবে সব দায় কেবল বন্দরের নয়, বাফার সদস্য হিসেবেও আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ গ্রহণ, প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষমতা অর্জন এবং সর্বোপরি নৈতিকতা বজায় রাখা, এসব আমাদেরই নিশ্চিত করতে হবে। স্বচ্ছতা শুধু দাবি করলেই হবে না, নিজেদের মধ্যেও তা চর্চা করতে হবে। অনিয়ম বা শর্টকাটের সংস্কৃতি পরিহার না করলে আমরা নিজেরাই উন্নয়নের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াব।
এ ছাড়া বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটি সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলা অপরিহার্য। সমালোচনার পাশাপাশি সমাধানে অংশীদার হওয়াটাই প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয়। নিয়মিত সংলাপ, যৌথ উদ্যোগ এবং তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে একটি আস্থাভিত্তিক ও কার্যকর পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।