বিদেশি বিনিয়োগে বিশ্বমানের হবে চট্টগ্রাম বন্দর

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের ৯৩ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবাহিত হয়। এই বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অপারেটর। ১৩৯তম বন্দর দিবস উপলক্ষে বন্দরের পরিচালনা ও প্রবৃদ্ধির বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলেন দেশ রূপান্তর চট্টগ্রাম ব্যুরোপ্রধান ভূঁইয়া নজরুল

দেশ রূপান্তর : ১৯৭৭ সালে মাত্র ছয়টি কনটেইনার দিয়ে যাত্রা শুরু করে এখন বছরে ৩৪ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করছে চট্টগ্রাম বন্দর। এই প্রবৃদ্ধি কি যথেষ্ট?

রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান : দেখুন, ১৯৭৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের এই অগ্রযাত্রা নিঃসন্দেহে ঈর্ষণীয়। বিশেষ করে ২০২৪-২৫ অর্থবছর এবং ২০২৫ ক্যালেন্ডার বর্ষে আমরা অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছি। তবে আমরা এতেই সন্তুষ্ট হয়ে বসে নেই। বন্দরের এই প্রবৃদ্ধি মূলত দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির প্রতিফলন। আমাদের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধির সুযোগ অবশ্যই ছিল এবং আছে। সে লক্ষ্যেই আমরা অত্যন্ত যতেœর সাথে পরিকল্পনা করে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন করছি। বিশেষ করে গ্যান্ট্রি ক্রেন সংযোজন এবং ডিজিটাল অটোমেশনের মাধ্যমে আমরা হ্যান্ডলিং সক্ষমতা আরও বাড়ানোর জন্য কাজ করে যাচ্ছি।

দেশ রূপান্তর : চট্টগ্রাম বন্দরের বে-টার্মিনাল প্রকল্পটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর নির্মাণকাজ শুরু হতে দেরি হচ্ছে কেন? এই বৃত্ত থেকে উত্তরণের উপায় কী?

রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান : বে-টার্মিনাল আমাদের স্বপ্নের প্রকল্প এবং এটি কৌশলগতভাবে বাংলাদেশের জন্য সামগ্রিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি চালু হলে জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভরতা ছাড়াই বড় জাহাজ ২৪ ঘণ্টা ভিড়তে পারবে। বড় কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমি অধিগ্রহণ ও বিদেশি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে কিছুটা সময় লাগে, একে আমরা ব্যর্থতা বলব না বরং এটি একটি প্রক্রিয়ার অংশ। তবে আশার কথা হলো, আমরা এখন আর বৃত্তে নেই। ল্যান্ডলর্ড মডেলের আওতায় বিশ্বখ্যাত বিভিন্ন অপারেটরের সাথে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে। আশা করছি খুব শীঘ্রই আপনারা বে-টার্মিনাল নির্মাণসংক্রান্ত কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে পাবেন।

দেশ রূপান্তর : লালদিয়া টার্মিনাল নিয়ে এপি মুলারের সাথে চুক্তি হয়েছে। তারা কবে কাজ শুরু করবে এবং এতে ব্যবসায়ীরা কীভাবে লাভবান হবেন?

রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান : লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নিয়ে এপি মুলারের সাথে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তি সম্পাদনের পর হতে তারা বিভিন্ন প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক অগ্রগতি সাধিত হওয়ায় তারা প্রকল্প এলাকায় কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইতিমধ্যে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী মহোদয় প্রকল্পটি পরিদর্শন করেছেন। আশা করি তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নির্মাণ কার্যক্রম শুরু করতে পারবে। এটির নির্মাণ যথাসময়ে শেষ হলে বন্দরের আয় যেমন বাড়বে, তেমনি ব্যবসায়ীরাও দ্রুত সময়ে পণ্য খালাসের সুবিধা পাবেন। অধিক দৈর্ঘ্যরে এবং বেশি টিইউস ধারণক্ষমত সম্পন্ন জাহাজ টার্মিনালটিতে ভিড়তে পারবে, যা পরোক্ষভাবে ব্যবসায়ীদের খরচ কমিয়ে আনবে। এ ছাড়া এটি Green Port  হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করবে বিধায় পরিবেশের ওপর কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে না। ফলে IMO ২০৫০ এর আওতায় একটি Green Initiative Compliant Terminal হবে।

দেশ রূপান্তর : টার্মিনালগুলোতে বিদেশি অপারেটর আসায় কি দেশীয় অপারেটরদের সুযোগ কমছে? এতে কি ভবিষ্যতে দক্ষতার শূন্যতা তৈরি হবে?

রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান : বিষয়টি তেমন নয়। বিদেশি অপারেটর আসার ফলে আমাদের দেশীয় অপারেটরদের সাথে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা আমাদের দেশে আসবে, যা দেশীয় কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতেই সাহায্য করবে। এনসিটি (NCT) বা পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে বিদেশি অংশগ্রহণ আমাদের সক্ষমতাকেই বিশ্বমানে নিয়ে যাবে, কোনো শূন্যতা তৈরি করবে না।

দেশ রূপান্তর : কর্ণফুলী ড্রাইডকের ইয়ার্ডে বাল্ক জাহাজ ভিড়ছে। এটি আমাদের শিপিং সেক্টরে কেমন প্রভাব ফেলবে?

রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান : কর্ণফুলী ড্রাইডক এলাকায় জাহাজ ভেড়া আমাদের সক্ষমতা বৃদ্ধিরই একটি অংশ। মূল বন্দরের ওপর চাপ কমাতে এবং বেসরকারি অংশগ্রহণ উৎসাহিত করতে এটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এটি বাণিজ্যিকভাবে পুরোপুরি সফল হলে আমাদের শিপিং সেক্টরে পণ্য পরিবহনের গতি বাড়বে এবং লজিস্টিক খরচ কমে আসবে।

দেশ রূপান্তর : বন্দর পরিচালনা বোর্ডে কি বেসরকারি প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজন আছে বলে আপনি মনে করেন?

রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান : চট্টগ্রাম বন্দর একটি রাষ্ট্রীয় সেবামূলক প্রতিষ্ঠান এবং আমরা সবসময়ই সকল স্টেকহোল্ডারদের সাথে সমন্বয় করে কাজ করি। তাদের পরামর্শ আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সবসময়ই গুরুত্ব পায়। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এবং চবক আইন ২০২২ অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালনায় যে সুফল পাচ্ছে, এতে নতুন কোনো পরীক্ষামূলক কার্যক্রম গ্রহণের পূর্বে আরও গভীর ভাবনা চিন্তা ও গবেষণার প্রয়োজন আছে। চবক সবসময়ই এ বিষয়ে সচেষ্ট থেকে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা সদাশয় সরকারকে সুপারিশ আকারে উপস্থাপন করবে।