প্রভাবশালীদের থাবা কায়ুকখালী খালে

শত বছর আগে প্রায় ২০০ ফুট প্রস্থের কায়ুকখালী খালকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল কক্সবাজারের টেকনাফের মানব বসতি। বছর দশেক আগেও টেকনাফের প্রধান বাণিজ্যিক পথ ছিল এটি। কিন্তু এখন প্রভাবশালীদের থাবায় খালটি পরিণত হয়েছে সরু নালায়। ফলে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি নামতে না পেরে প্লাবিত হয় উজানের শত শত বাড়িঘর, ফসলের মাঠ। টেকনাফের প্রাণ হিসেবে খ্যাত এ খাল রক্ষার্থে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন দখলকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বললেও প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে প্রতিনিয়ত খালের নতুন নতুন পয়েন্টে জমি দখলে মেতে উঠেছে প্রভাবশালী মহল। খালটি খননে বর্তমান সরকার ১৭ কোটি টাকা বাজেট করেছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, নাফ নদী থেকে কায়ুকখালী খাল পর্যন্ত প্রায় ৩ কিলোমিটার এলাকার দুপাশ দখল করেছে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাসহ অর্ধশতাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি।

কায়ুকখালী খালের উত্তর পাড়ে রয়েছে মৃত শেখ আহম্মদের ছেলে হাজি মো. ইউনুচের পাকা দোকান ঘর, টেকনাফ পৌরসভার অলিয়াবাদ এলাকার মৃত মো. ইদ্রিসের ছেলে আবুল কালামের কাঁচা বসতবাড়ি ও কে কে পাড়ার আমিরচ্ছফার স্ত্রী আছিয়া খাতুনের কাঁচা বসতবাড়ি। আরও আছে টেকনাফ পৌরসভার ইসলামাবাদের নুর ইমামের ছেলে মো. সালামের কাঁচা বসতবাড়ি, একই এলাকার মৃত আব্দুল আহমদের ছেলে আব্বাসের কাঁচা বসতবাড়ি, ইসলামাবাদের অলিপুতুর ছেলে মো. হোসনের টিনের বসতবাড়ি, রশিদ আহমেদের ছেলে আমির আহমদের বসতবাড়ি, মৃত অলিপুতুর স্ত্রী নুর বেগমের বসতবাড়ি এবং সুলতান আহমদের মেয়ে রশিদা বেগমের বসতবাড়ি।

খালের দক্ষিণ পাশে রয়েছে মৃত গুরা মিয়ার ছেলে মো. আলমের বাঁশমহাল, পশ্চিমে একই এলাকার মৃত গুরা মিয়ার দুই ছেলে মো. ছৈয়দ আলম ও জাফরের কাঁচা বসতবাড়ি, গ্যারেজ ও বহুতল ভবন; আবুল কাশেমের ছেলে এনায়েত উল্লাহর বসতবাড়ি। একই এলাকার মৃত আয়ুব আলীর ছেলে আবু মুসার একতলা ভবন। মৃত হাজি ছোট কালা মিয়ার ছেলে টেকনাফ পৌরসভা বিএনপির সভাপতি আবদুর রাজ্জাকের ৪তলা ভবন ও তার ভাই আব্দুস সালামের ভবন, একই এলাকার মৃত হাজি বড় কালা মিয়ার ছেলে হাজি মো. ইউনুচের ভবন ও হাজি রোশন আলীর গ্যারেজ।

খালের পূর্ব পাশে রয়েছে আব্দুল রশিদের ছেলে কাদির হোছনের পাকা দেয়ালঘর, লামার বাজারের মৃত মো. করিমের ছেলে ইলিয়াছের বাড়ি, একই এলাকার মৃত হাজি ইসলামের দুই ছেলে কায়সার ও শহীদের বাড়ি, আব্দুল জলিলের ভবন, হাজি আব্দুল গনির দালান,  ও মাপ্র-এর ছেলে অংছিপ্রর পাকা দালান এবং মৃত আলী হোছনের ছেলে মো. আয়ুবের পাকা দালান।

গত কয়েক দিন ধরে পৌরসভার ময়লা ফেলে খালের মোহনা দখলে মেতে উঠেছে একটি প্রভাবশালী মহল। তাছাড়া প্রধান সড়কের পাশে অলিয়াবাদ ব্রিজসংলগ্ন খালের দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকায় নিত্যনতুন দখলের পাঁয়তারা চলছে।

এর কয়েক বছর আগে ভূমি প্রশাসন দফায় দফায় অভিযান চালিয়ে কায়ুকখালী খালের ওপর নির্মিত নতুন ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় অবৈধ দখল উচ্ছেদ করেছিল। কিন্তু তা ফের দখল হয়ে গেছে।

টেকনাফ পৌরসভার সচিব মুহিউদ্দিন ফয়েজ বলেন, ‘অভিযোগ পেলে পৌরবাসীকে সঙ্গে নিয়ে খালটি উদ্ধারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী (পুর) তহিদুল ইসলাম বলেন, আমি নতুন দায়িত্বে নিয়েছি। খাল দখলের বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমামুল হাফিজ নাদিম বলেন, ‘আমার জানামতে খাল দখলকারীদের উচ্ছেদের বিষয়ে ভূমি কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া আছে। সরকার খাল খননের জন্য ১৭ কোটি টাকা বাজেট করেছে। ইতিমধ্যে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আশা করছি, আগামী মাসের মধ্যভাগ থেকে খনন কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।’