শশীভূষণের ক্যামেরায় শত বছর আগের বলীখেলা

শশীভূষণ দস্তিদার নামে চট্টগ্রামে একজন প্রসিদ্ধ ফটোগ্রাফার ছিলেন। গত শতকের দ্বিতীয় দশকে তিনি চট্টগ্রাম শহরে ‘ফাইন আর্ট গ্যালারি’ নামে একটি স্টুডিও স্থাপন করেন। ওই সময় শশীভূষণ তার ছবি তোলার চর্চাকে স্টুডিওর ভেতরেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। এই চর্চা নিয়ে গেছেন মানুষের কাছে। আউটডোর ফটোগ্রাফির জন্য চারদিকে তার নামডাক ছড়িয়ে পড়ে। একসময়ের তুখোড় এই ফটোগ্রাফার এখন একেবারেই বিস্মৃত। ১৯১৫ সালের ২৬ এপ্রিল বক্স ক্যামেরা আর গ্লাস প্লেট নেগেটিভ তিনি চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলীখেলার ছবি তোলেন। তিনি যখন এই ছবি তোলেন তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে। এই ছবি তোলার মাত্র ছয় বছর আগে ১৯০৯ সালে চট্টগ্রাম শহরের পুরনো কাছারি ময়দানে [বর্তমানে লালদিঘি মাঠ] অভিষেক হয় ঐতিহ্যবাহী এই বলীখেলার। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বাংলার যুবসমাজকে শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী করার অভিপ্রায়ে বকশিরহাটের  ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর এই খেলার প্রবর্তন করেছিলেন।

শশীভূষণ বলীখেলার যেসব ছবি তুলেছিলেন তার থেকে দুটি ছবি ছাপা হয়েছিল ভারতের বিখ্যাত প্রবাসী পত্রিকায়। ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে পুরনো পত্রিকা ঘাঁটতে গিয়ে প্রবাসীর পৃষ্ঠায় আমি এই দুটি দুর্লভ আলোকচিত্রের সন্ধান পাই। ১৯১৫ সালের জুন মাসে রমানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত  প্রবাসী পত্রিকার [আষাঢ় ১৩২২, ১৫শ ভাগ, প্রথম খণ্ড, তৃতীয় সংখ্যা] ৩৫৩ থেকে ৩৫৬ নম্বর পৃষ্ঠায় মোহিনীমোহন দাসের একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ ছাপা হয়। তার প্রবন্ধের শিরোনাম ‘চট্টগ্রামের বলীখেলা’। এই প্রবন্ধের সঙ্গেই ছবি দুটি ছাপা হয়। মোহিনীমোহন তার প্রবন্ধের পাদটিকায় উল্লেখ করেন, ‘চট্টগ্রামের প্রসিদ্ধ ফটোগ্রাফার বন্ধুবর শ্রীযুক্ত শশীভূষণ দস্তিদার মহাশয় কষ্টস্বীকার করিয়া চিত্রগুলি তুলিয়া দিয়া আমাদের চিরকৃতজ্ঞতা ভাজন হইয়াছেন।’

শশীভূষণের তোলা এই দুটি ছবিই জব্বারের বলীখেলার আদি নিদর্শন। তার আগে এই খেলার ছবি কেউ তুলেছেন বলে জানা যায় না। তুলে থাকলেও এর প্রমাণ এই মুহূর্তে আমাদের হাতে নেই। আজ থেকে শত বছরেরও বেশি আগে শশীভূষণ যে চট্টগ্রামের বলীখেলার দৃশ্য-ইতিহাস নির্মাণ করে গেছেন, সেই সম্পর্কে ইতিহাসে তেমন কিছু লেখা নেই। ফলে ইতিহাসের অতল গহিনে হারিয়ে গেছেন বিশ শতকের প্রথম দিকের এই গুরুত্বপূর্ণ আলোকচিত্রী। শশীভূষণের নাম আমি প্রথম জানতে পারি চট্টগ্রাম ফটোগ্রাফিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মউদুদুল আলমের লেখা একটি প্রবন্ধ পড়ে। ১৯৯৫ সালে দৈনিক আজাদীর ৩৫ বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘হাজার বছরের চট্টগ্রাম’ নামে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। সেই সংখ্যার ১৫৬ থেকে ১৫৮ পৃষ্ঠায় ‘ফটোগ্রাফি’ শিরোনামে মউদুদুল আলমের প্রবন্ধটি ছাপা হয়। সেই প্রবন্ধে মউদুদুল আলম শশীভূষণের নাম লিখেছিলেন শশী দস্তিদার। আজাদীর বর্ষপূর্তি সংখ্যার অতি পুরনো একটি কপি উপহার হিসেবে আমাকে কুরিয়ারে পাঠান পত্রিকাটির সাহিত্য সম্পাদক আসমা বীথি।

মউদুদুল আলম লিখেছেন, ‘১৯১৩ সালে শশী দস্তিদার নামে এক রেল কর্মচারী চট্টগ্রাম প্রধান ডাকঘরের বিপরীত দিকে ‘ফাইন আর্ট গ্যালারি’ নামে একটি স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করেন। তার আগে জমিদারপুত্র নবীন দাশগুপ্ত ও সারদা প্রসন্ন গুহ চট্টগ্রাম শহরে ফটোগ্রাফি চর্চা শুরু করেন। বিশ শতকের শুরুর দিকে তারা চেরাগি পাহাড়ের উত্তর-পূর্ব কোণে ‘অরিয়েন্টাল ফটোগ্রাফারস’ এবং কোতোয়ালির মোড়ে ‘চট্টল আর্ট স্টুডিও’ স্থাপন করেন। তাদের হাত ধরেই চট্টগ্রাম শহরে বাণিজ্যিক ফটোগ্রাফির অভিষেক ঘটে। শশীভূষণ তার ছবি তোলা স্টুডিওর ভেতরেই সীমিত রাখেননি, এই চর্চা নিয়ে গেছেন মানুষের কাছে। ওই সময় আউটডোর ফটোগ্রাফি করে তিনি বেশ নাম কামান।’ এই লেখা পড়ে আমি মউদুদুল আলমকে ফোন করি শশীভূষণের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে। তিনি জানালেন, শশীভূষণকে জানার সম্ভাবনা এখন খুবই ক্ষীণ। কারণ বহুকাল আগেই তিনি বিস্মৃত হয়ে গেছেন। শশীভূষণের নাম তিনি শুনেছেন তার বাবা কবি-গবেষক ও সংগ্রাহক ওহীদুল আলমের কাছে। ওহীদুল আলমের সঙ্গে শশীভূষণের সুসম্পর্ক ছিল। ১৯৫৬ সালে মউদুদুল আলমের জন্ম। তার আগেই শশীভূষণের ফাইন আর্ট গ্যালারি বিলুপ্ত হয়ে যায়।

মোহিনীমোহনের প্রবন্ধে শশীভূষণের ছবি দুটির বর্ণনা পাওয়া যায়। প্রথম ছবিতে দেখা যায়, ময়দানের মাঝখানে বলীদের নির্দিষ্ট রঙ্গস্থল বাদে চারদিকে কাঁটাতারের দোহারা বেড়া। রঙ্গস্থলের মাঝ বরাবর একটি উঁচু সুপারিগাছের থাম। তার উপরিভাগে একটি বায়ুচক্র বসানো, তা বাতাসে ঘুরছে। সুপারিগাছের থামটি কাগজে মোড়ানো। তার অগ্রভাগ থেকে কতগুলো রশিতে ঝোলানো বিচিত্র বর্ণের পতাকা। রঙ্গস্থলের একপাশে কয়েকটি সামিয়ানা টাঙানো। বোঝা যায় উচ্চপদের রাজকর্মচারী, উকিল, আমলা, সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ আর নিমন্ত্রিত অতিথিদের বসার জন্যই এই ব্যবস্থা। মোহিনীমোহন লিখেছেন, দর্শকদের পনেরো আনাই যে মুসলমান, ছবিতে টুপিপরা মানুষের বাহুল্য দেখলেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। ছবিটি রঙ্গস্থলের পাশের পাহাড়ের ওপর থেকে তোলা বলে প্রতীয়মান হয়। দ্বিতীয় ছবিতে দেখা যায়, পাহাড়ের ওপর থেকে হাজার হাজার ক্রীড়ামোদী মানুষ বলীখেলা উপভোগ করছেন। আর রঙ্গস্থলে বলীদের ঘিরে আছেন নিরাপত্তা প্রহরীরা। এই ছবি সম্পর্কে মোহিনীমোহন লিখেছেন, ‘রবাহূত [বিনা নিমন্ত্রণে আগত] ব্যক্তিরা চারদিকে দাঁড়াইয়া বসিয়া গাছে ছাদে চড়িয়া এই দৃশ্য দর্শন করে। পাহাড়ের ঢালুগাত্রে লোকগুলি কেমন গ্যালারির ন্যায় উপবেশন করিয়াছে তাহা ২ নম্বর চিত্র দর্শন করিলেই সহজেই অনুমান করা যাইবে।’

এই লেখা পড়ে কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারেন কে এই মোহিনীমোহন? মোহিনীমোহনের লেখার মধ্যেই তার একটা আভাস আছে। তার বাল্যকাল কাটে কলকাতায়। যৌবনে তিনি বসবাস করতেন ঢাকায়। এরপর বিশ শতকের প্রথম দশকে চট্টগ্রামে এসে থিতু হন। তিনি সম্ভবত চট্টগ্রামের কোহিনুর প্রেসের স্বত্বাধিকারী ছিলেন। কয়েক বছর চট্টগ্রামে বসবাস করে এখানকার বলীখেলার মধ্যে তিনি যে একটি সজাগ চিত্র দেখতে পেয়েছিলেন কিংবা এর ভেতরে যে একটা চেতনার আভাস আছে তা তুলে ধরতেই প্রবাসীতে লিখতে উদ্বুদ্ধ হন।

মোহিনীমোহন তার প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘সুবেবাঙ্গালার অন্যান্য জিলায় এরূপ সমারোহ মল্লক্রীড়া [বলীখেলা] অনুষ্ঠিত হয় কি না তাহা জানি না। বাল্যকালে বঙ্গদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ নগরী কলিকাতায় এবং যৌবনে ঢাকায় বাসকালে ২/১টি পশ্চিমি পালোয়ানের কুস্তীক্রীড়ার অভিনয় দর্শন করিয়াছি, কিন্তু এত সমারোহ ও এত আড়ম্বর তাহাতে দেখি নাই। এবং সেখানে মল্লক্রীড়া এরূপ কৌলিক [বংশগত] বার মাসে তেরো পার্ব্বণের পর্যায়ভুক্ত নহে। এখানকার মল্লক্রীড়ার অনুষ্ঠাতারা (আয়োজক) প্রত্যেক বৎসর নির্দিষ্ট দিনে এই ব্যাপারের অনুষ্ঠান করিয়া থাকেন। পিতার অনুষ্ঠান পুত্রে রক্ষা করিয়া আসিতেছে। অনুষ্ঠানের তারিখ পূর্ব্ব হইতে সর্ব্বত্র বিজ্ঞাপনাদি এবং নিমন্ত্রণপত্র বিলি করিয়া প্রচারিত হইয়া থাকে। নানা স্থানের বলীগণকে আহ্বান করা হইয়া থাকে।’

তিনি আরও লিখেন, “চট্টগ্রামের বলীখেলার একটা সর্বজনীনতা আছে। এই জিলার প্রায় প্রত্যেক গ্রামে বলীখেলার ছোট বড় মেলা হইয়া থাকে। গাজনের ঢাকে কাঠি পড়িলে যেমন পূর্ব্বকালে চড়কের সন্ন্যাসীদের পিঠ সুড়সুড় করিত, চৈত্র মাসে চট্টগ্রামের বলীদের মধ্যেও তেমনি একটি উন্মাদনা পরিলক্ষিত হয়। এজন্য সম্পন্ন হিন্দু ও মুসলমানগণের মধ্যে অনেকেই রাশি রাশি অর্থ ব্যয় করিয়া থাকেন। সমস্ত জিলা ব্যাপিয়া কতগুলি বলীখেলা হয় তাহার সংখ্যা (নির্ধারণ) করা দুরূহ। এক চট্টগ্রাম নিজ সহরেই ১৫/২০টি খেলার ‘থলা’ [স্থল] হইয়া থাকে। তাহাতে দেশের নানা স্থান হইতে বলীগণ আসিয়া নিজ নিজ দক্ষতা দেখাইয়া যথাযোগ্য পারিতোষিক [পুরস্কার] লাভ করিয়া থাকে। আমরা এরমধ্যে একটি সর্বশ্রেষ্ঠ খেলার বিবরণ দ্বারা পাঠকগণকে তাহার একটা আন্দাজ দিতে চেষ্টা করিব।”

মোহিনীমোহন তার প্রবন্ধে যে বলীখেলার বর্ণনা করেন তা সবার কাছে ‘আবদুল জব্বারের বলীখেলা’ হিসেবে প্রসিদ্ধ। প্রতি বছর বৈশাখ মাসের ১৩ তারিখে শহরের পুরনো কাছারি ময়দানে এই খেলা অনুষ্ঠিত হতো। খেলাকে ঘিরে আগের রাত থেকেই স্থানীয় বাদ্যকরদের ঢোল, সানাই আর বোমের আওয়াজে প্রাণ ওষ্ঠাগত হতো। আগের দিন সকালে নানা জায়গা থেকে দোকানিরা এসে পসরা সাজাতেন। মেলার মাঠে নাগরদোলা, রাধাচক্র, এমনকি ছোটখাটো সার্কাসের দলও আসত। সকাল ১০টার পর খেলা শুরু হতো। পাঁচ হাজারের বেশি দর্শক সমবেত হতো ক্রীড়াস্থলে। আর এই আয়োজন সম্পন্ন করতে ব্যয় হতো চার থেকে পাঁচ শ টাকা।