ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছেই না। বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের মুখে কিছু রাখঢাক করা হয়। কিন্তু দুই-তিন পরই আবার শুরু হয়ে যায় দালালদের তৎপরতা। এখন দিনের বেলা প্রশাসনের তৎপরতার মুখে দালালদের আনাগোনা কিছুটা কম চোখে পড়লেও রাত হলেই বাড়ে যায় এদের দৌরাত্ম্য।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢামেক হাসপাতালের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সক্রিয় রয়েছে দালালচক্র। চিকিৎসার ধরন বুঝে কোন হাসপাতালে কাকে নেওয়া যাবে বা রোগীভেদে কমিশন কত পাওয়া যাবে তা নিয়ে চলে দেনদরবার। কেউ কেউ চিকিৎসার মোট ব্যয় উল্লেখ করে ভিজিটিং কার্ড দিয়ে যান রোগীদের। কেউ আবার রোগীর স্বজন সেজে ভাগিয়ে নিয়ে যান অন্যত্র। দালালদের পাশাপাশি রোগীর স্বজন সেজে চোরচক্রের তৎপরতার অভিযোগও অনেক পুরনো। যারা রোগী কিংবা তাদের স্বজনদের অসতর্কার সুযোগে লোপাট করে নিয়ে যায় সব কিছু। এ ছাড়া রোগীদের বেড পাইয়ে দেওয়ার জন্যও তৎপর রয়েছে দালালচক্র।
ঢামেক হাসপাতালে নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন প্রায় ৩৫০ জন আনসার সদস্য। তারা তিন ভাগে হাসপাতালের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালন করেন। দালাল প্রতিরোধ ও দর্শনার্থী নিয়ন্ত্রণ, প্রধান দুটি দায়িত্ব তাদের। তার মধ্যেও দালাল ও চোরদের দৌরাত্ম্য চলছে। কারও কারও সঙ্গে সমঝোতা করেই এসব চলে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত ৯ এপ্রিল রাত ১১টায় দায়িত্বরত এক আনসার সদস্যের সঙ্গে কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাসপাতালে প্রবেশের প্রতিটি দুয়ারে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকেন আনসার সদস্যরা। এর মধ্যেও দালালরা বিভিন্নভাবে প্রবেশ করছে। আমরাও প্রায় সময় দালাল ও চোর ধরে কর্র্তৃপক্ষকে অবগত করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে থাকি।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) হাসপাতালের একটি বিশেষায়িত বিভাগ। কিন্তু ঢামেক হাসপাতালে প্রয়োজনের তুলনায় আইসিইউর সংখ্যা খুবই কম। সংকটাপন্ন রোগীদেরও দিনের পর দিন আইসিইউর জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয়। কখনো সরাসরি আইসিইউ পাওয়া যায় না। এ সুযোগ নিয়ে থাকে দালালচক্র। রাত হলেই আইসিইউকে কেন্দ্র করে দালালদের সংখ্যা বেড়ে যায়।
সরেজমিন গত ২০ এপ্রিল রাত সাড়ে ১১টায় ঢামেক হাসপাতালে ঢুকেই দেখা যায়, ঢাকার বাইরে থেকে হাসপাতালে আসা অ্যাম্বুলেন্স ঘিরে রেখেছে সাত-আটজন লোক। তারা বলছে, ‘এখানে আইসিইউ পাওয়া যাবে না। আপনারা চাইলে পাশেই একটা প্রাইভেট হাসপাতাল রয়েছে সেখানে যেতে পারেন।’ এরপরে জরুরি বিভাগে প্রবেশ করতেই দেখা গেল, দিনের মতোই মধ্যরাতেও চলছে হইচই। রোগীদের স্বজনরা পাটি বিছিয়ে হাঁটার পথে, এমনকি সিঁড়িতেও শুয়ে আছেন কেউ কেউ। নিচতলার বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডের সামনে তিন-চারজন করে যুবক দাঁড়িয়ে আছে। হাসপাতালে কিছু লাগবে কি না তারা জানতে চায়। দ্বিতীয় তলার শিশু ওয়ার্ডের আইসিইউর সামনেও অনেক লোকের সমাগম। কেউ শিশু কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কেউ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে পায়চারি করছেন। কিছু লোক তাদের সঙ্গে কথা বলছে। এসব লোক দালালচক্রের লোক বলে জানা যায়। তবে রাতে আনসার সদস্যদের তৎপরতাও চোখে পড়ে। কেউ বসে আছেন ওয়ার্ডের সামনে, আবার কেউ হাসপাতালের এ মাথা থেকে ওই মাথা রাউন্ড দিচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দায়িত্বরত এক আনসার সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা যাদের দালাল বলে চিনি-জানি তাদের দেখলেই আটক করি। কিন্তু নতুন মানুষদের আমরা কী বলব। কেউ কেউ রোগীদের স্বজন সেজে তাদের ভাগিয়েও নেয়। বিকেলে ও রাতে দালালচক্রের আনাগোনা বাড়ে, তাই এ সময়ে আনসার সদস্যদেরও বাড়তি নজরদারি থাকে।
হাসপাতালের দালালচক্রের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান দেশ রূপান্তরের কাছে দালালচক্রের দৌরাত্ম্যের কথা অস্বীকার করেননি। তিনি বলেন, যখন-তখন আইসিইউ ও অপারেশনের সিরিয়াল পাওয়া যায় না, এ সুযোগে দালালচক্র রোগীদের নানা কৌশলে হাসপাতালে থেকে ভাগিয়ে নিয়ে যায়। তবে হাসপাতাল দালালমুক্ত রাখতে সবসময়ই আমাদের বাড়তি নজরদারি রয়েছে। প্রতিটি প্রবেশদ্বারে আনসার সদস্যরা দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও এত দালাল কীভাবে প্রবেশ করে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সম্প্রতি ঢামেক হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে ৫৮ দালালকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) ভ্রাম্যমাণ আদালত। ৫৮ জনের মধ্যে ৫০ জনই ছিল হাসপাতালের ভেতরে, আর ৮ জন বাহিরে। এ ঘটনার মাধ্যমে হাসপাতালের ভেতরে দালালচক্রের অবস্থানের বিষয়টি প্রমাণিত হয়। হাসপাতালের ভেতরেই দালালদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দানকারীরা না থাকলে তাদের তৎপরতাও যে সম্ভব হতো না সে বিষয়টিও সামনে আসে।
দালালদের গ্রেপ্তারের পর র্যাব ৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছিলেন, তারা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এখান থেকে রোগী ভাগিয়ে নেওয়া, সিট পাইয়ে দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করা এবং বিভিন্ন ব্লাডব্যাংকে মাদকসেবীদের ধরে ব্লাড নিয়ে বিক্রির নির্দিষ্ট তথ্য পেয়ে অভিযান পরিচালনা করেছেন। তারা জানতে পেরেছেন, হাসপাতালে দালালচক্রের বিশাল সিন্ডিকেট রয়েছে। এর হোতাসহ যারা এ চক্রের সঙ্গে জড়িত তাদেরও গ্রেপ্তারে অভিযান চলবে। একই সঙ্গে এখান থেকে যেসব হাসপাতালে রোগী ভাগিয়ে নেওয়া হয়, সে হাসপাতালগুলোতেও অভিযান চালানো হবে।
এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন গত ৪ মার্চ আকস্মিক ঢামেক হাসপাতাল পরিদর্শনকালে দালালচক্র দমনে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, হাসপাতালে কাউকে দালালি করতে দেওয়া হবে না। দালালমুক্ত হাসপাতাল নিশ্চিত করতে তিনি জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেন। কিন্তু এরপরও পরিস্থিতির কোনো উত্তরণ হয়নি।