বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক জটিল সময় অতিক্রম করছে। প্রবৃদ্ধি মন্থর, মূল্যস্ফীতি উচ্চ, বিনিয়োগ স্থবির, এবং রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে। এমন প্রেক্ষাপটে সরকার যখন বড় আকারের বাজেট প্রণয়নের কথা ভাবছে, তখন প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়: রাজস্ব বাড়ানোর কার্যকর, টেকসই এবং জনকল্যাণমূলক উপায় কী হতে পারে? এর একটি শক্তিশালী ও প্রমাণভিত্তিক উত্তর হলো তামাকজাত দ্রব্যের ওপর কর বৃদ্ধি।
তামাক: রাজস্বের উৎস না অর্থনীতির বোঝা?
বাংলাদেশে তামাক খাত দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব আয়ের একটি উৎস হিসেবে বিবেচিত হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। গবেষণায় দেখা গেছে, তামাক থেকে যে পরিমাণ রাজস্ব আসে, তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যয় হয় তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা, উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং অকালমৃত্যুর কারণে। অর্থাৎ, এটি নিট অর্থনৈতিক ক্ষতির খাত।
প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ মানুষ তামাকজনিত রোগে মারা যায়, এবং লাখো মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে। এতে কর্মক্ষম জনশক্তি কমে যায়, স্বাস্থ্য খাতে চাপ বাড়ে এবং পরিবারগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে জাতীয় অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
কর বৃদ্ধি কীভাবে কাজ করে
তামাকপণ্যের ওপর কর বাড়ালে সরাসরি এর মূল্য বৃদ্ধি পায়। অর্থনীতির সাধারণ নীতি অনুযায়ী, কোনো পণ্যের দাম বাড়লে তার চাহিদা কমে—বিশেষ করে তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে। তামাকের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য।
বর্তমানে বাংলাদেশের তামাক কর কাঠামো জটিল এবং বহুস্তরবিশিষ্ট, যার কারণে বাজারে সবসময় সস্তা বিকল্প পাওয়া যায়। এ অবস্থায় কর কাঠামো সহজ করে উচ্চ হার নির্ধারণ করলে দুইটি বড় পরিবর্তন আসে: তামাকের ব্যবহার কমে, সরকারের রাজস্ব বাড়ে।
রাজস্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনা
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, তামাক কর সংস্কার করা হলে সরকারের রাজস্ব আয় প্রায় দ্বিগুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এটি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে কর বৃদ্ধি মানেই রাজস্ব বৃদ্ধি, যা সব খাতে দেখা যায় না। অর্থাৎ, তামাক কর বৃদ্ধি একটি “win-win” পরিস্থিতি তৈরি করে—ব্যবহার কমে, পাশাপাশি রাজস্ব বাড়ে।
স্বাস্থ্য ব্যয় হ্রাস ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি
তামাক ব্যবহারের কারণে যে বিপুল স্বাস্থ্য ব্যয় হয়, তা কমানো গেলে সেই অর্থ অন্য খাতে বিনিয়োগ করা সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে: অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি একই সঙ্গে, সুস্থ জনগোষ্ঠী মানে বেশি উৎপাদনশীল কর্মশক্তি। যারা অসুস্থ নয়, তারা বেশি কাজ করতে পারে, বেশি আয় করতে পারে এবং অর্থনীতিতে বেশি অবদান রাখতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
দারিদ্র্য হ্রাসে ভূমিকা
তামাক ব্যবহারের সঙ্গে দারিদ্র্যের একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষ তাদের আয়ের একটি অংশ তামাকে ব্যয় করে, যা খাদ্য, শিক্ষা বা স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় হতে পারত। তামাকের দাম বাড়লে তারা হয় ব্যবহার কমায়, নয়তো ছেড়ে দেয়। ফলে সেই অর্থ পরিবারের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়। এটি দারিদ্র্য হ্রাসে সহায়ক।
তরুণ প্রজন্মকে সুরক্ষা
তামাকের সহজলভ্যতা তরুণদের মধ্যে এর ব্যবহার বাড়িয়ে দেয়। কম দাম এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করে। কর বাড়িয়ে দাম বৃদ্ধি করলে নতুন ব্যবহারকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম স্বাস্থ্যবান ও উৎপাদনশীল হয়ে ওঠে, যা একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিনিয়োগবান্ধব অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য
বর্তমান সরকার বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার কথা বলছে। এই লক্ষ্য অর্জনে একটি সুস্থ, দক্ষ এবং কর্মক্ষম জনশক্তি অপরিহার্য। তামাক নিয়ন্ত্রণ সেই লক্ষ্যকে সরাসরি সহায়তা করে। একই সঙ্গে, স্বাস্থ্যবান সমাজ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও ইতিবাচক বার্তা দেয়। তারা এমন দেশেই বিনিয়োগ করতে আগ্রহী যেখানে শ্রমশক্তি স্থিতিশীল এবং উৎপাদনশীল। প্রচলিত ভুল ধারণার জবাব
তামাক কর বাড়ানোর ক্ষেত্রে কিছু সাধারণ আপত্তি শোনা যায়
১. খুচরা বিক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে
বাস্তবে, বেশিরভাগ খুচরা বিক্রেতা শুধু তামাক নয়, অন্যান্য পণ্যও বিক্রি করে। তামাক বিক্রি কমলে তারা বিকল্প পণ্যে ঝুঁকে পড়ে।
২. চোরাচালান বাড়বেবাংলাদেশে তামাকের দাম এখনও অনেক দেশের তুলনায় কম। ফলে বাইরের দেশ থেকে চোরাচালানের প্রণোদনা খুব কম। তাই তামাক কোম্পানির এই যুক্তিগুলো বাস্তব তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বাজেট ঘাটতি মোকাবেলায় কার্যকর উপায়
বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকার বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতির মুখে রয়েছে। নতুন কর আরোপ বা বিদ্যমান খাতে কর বাড়ানো অনেক সময় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কিন্তু তামাক কর বৃদ্ধি একটি ব্যতিক্রম।
এটি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে:
* জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত হয়
* রাজস্ব বাড়ে
* অর্থনীতিতে নেতিবাচক চাপ পড়ে না
ফলে বাজেট ঘাটতি মোকাবেলায় এটি একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। কর কাঠামো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা শুধু কর বাড়ালেই হবে না, কর কাঠামোও সহজ করতে হবে। বর্তমান বহুস্তর কাঠামোর পরিবর্তে:
* কম স্তর
* নির্দিষ্ট মূল্যভিত্তিক কর
* নিয়মিত মূল্য সমন্বয়
এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করলে কর ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়বে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় তামাক কর বৃদ্ধি একটি সময়োপযোগী এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত হতে পারে। এটি কেবল রাজস্ব বাড়ানোর একটি উপায় নয়, বরং একটি সমন্বিত উন্নয়ন কৌশল।
একদিকে এটি লাখো মানুষের জীবন রক্ষা করবে, অন্যদিকে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াবে। স্বাস্থ্যবান জনগোষ্ঠী, কম স্বাস্থ্য ব্যয়, বেশি উৎপাদনশীলতা এবং বাড়তি রাজস্ব—সব মিলিয়ে এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে পারে। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। একটি সাহসী পদক্ষেপই পারে জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতিকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে।
লেখক
ইকবাল মাসুদ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ