শেরে বাংলা মাটি ও মানুষের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর

উপমহাদেশের প্রখ্যাত জননেতা, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের মৃত্যুবার্ষিকী আজ ২৭ এপ্রিল। এই দিনটি শুধু একটি ব্যক্তির মৃত্যুর স্মৃতিচারণ নয়; এটি আমাদের জাতীয় ইতিহাস, রাজনৈতিক চেতনা এবং সামাজিক ন্যায়সংগত সংগ্রামের এক গভীর প্রতীক। তার জীবন ও কর্ম বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত, যা আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে এবং ভবিষ্যতের পথনির্দেশনা দেয়। এ. কে. ফজলুল হক ছিলেন বাংলার মাটি ও মানুষের নেতা। তিনি কেবল রাজনীতিবিদ নন বরং ছিলেন কৃষক-শ্রমিক, নিপীড়িত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অকৃত্রিম বন্ধু। তার রাজনীতির মূল ভিত্তি ছিল, সাধারণ মানুষের কল্যাণ। সেই সময়কার সমাজব্যবস্থায় জমিদারি শোষণ, দারিদ্র্য এবং বৈষম্য ছিল প্রকট। ফজলুল হক এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন এবং কৃষকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ বাংলার গ্রামীণ জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটায়।

শেরে বাংলার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন, যা পরবর্তীকালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। যদিও এই প্রস্তাবের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ নিয়ে ইতিহাসে নানা বিতর্ক রয়েছে, তবুও এটি নিঃসন্দেহে উপমহাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তার রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি এবং নেতৃত্বগুণ এই প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফজলুল হকের অবদান শুধু একটি প্রস্তাব বা কোনো রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ছিলেন শিক্ষাবিস্তারের একজন প্রবল সমর্থক। ১৮৯৭ সালে কলকাতার রিপন কলেজ থেকে বি.এল. পাস করে স্যার আশুতোষ মুখার্জির শিক্ষানবিশ হিসেবে কলকাতা হাইকোর্টে নিজের নাম তালিকাভুক্ত করেন এ. কে. ফজলুল হক। দুই বছর শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করার পর, ১৯০০ সালে তিনি সরাসরি আইন ব্যবসা শুরু করেন। পিতার মৃত্যুর পর ১৯০১ সালে বরিশালে ফিরে আসেন এবং বরিশাল আদালতে যোগদান করেন। ১৯০৩-১৯০৪ সালে বরিশাল বার অ্যাসোসিয়েশনের সহকারী সম্পাদক পদে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। এরপর বরিশাল রাজেন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষ ড. হরেন্দ্রনাথ মুখার্জির অনুরোধে কলেজে অঙ্কশাস্ত্রের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। সময়ের স্রোতে বাংলার মানুষের মধ্যে শিক্ষা প্রসারে তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তার সময় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি পায়

তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলো শিক্ষা। ১৯১২ সালে এ. কে. ফজলুল হক মুসলিম লীগে যোগ দেন। কিন্তু এই সংগঠনের সঙ্গে সাংগঠনিক নানা বিষয়ে তার বিরোধ বাধে। ১৯১৪ সালের ঢাকার আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল বর্তমানে বুয়েট প্রাঙ্গণে মুসলিম লীগের প্রাদেশিক বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে এ. কে. ফজলুল হক প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯১৮ সালে দিল্লিতে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বাঙালিদের মধ্যে শুধু তিনিই নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। ১৯১৯ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট পদ লাভ করেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, সময়ের পরিক্রমায় তার অসামান্য অবদানকে অনেক সময় আড়াল করা হয়েছে। বিশেষ করে সাম্পতিক সময়ে একক ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রয়াসে ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় উপেক্ষিত হয়েছে। ফলে নতুন প্রজন্মের অনেকেই শেরে বাংলার প্রকৃত অবদান সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা পায় না। এটি আমাদের ইতিহাসচর্চার জন্য একটি বড় ধরনের দুর্বলতা। ইতিহাস কখনো একপাক্ষিক হওয়া উচিত নয়। একটি জাতির অগ্রযাত্রা বুঝতে হলে, সেই জাতির সব মহান ব্যক্তিত্বের অবদানকে সমানভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক এমনই একজন নেতা, যিনি তার কর্ম ও আদর্শের মাধ্যমে বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাকে অবহেলা করা মানে আমাদের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে অস্বীকার করা।

বর্তমানে যখন আমরা ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন নিয়ে আলোচনা করছি, তখন শেরে বাংলার অবদানকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তার মৃত্যুবার্ষিকী ২৭ এপ্রিলকে জাতীয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করার দাবি যৌক্তিক এবং সময়োপযোগী। এর মাধ্যমে শুধু একজন মহান নেতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাই হবে না, উপরন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে তার জীবন ও আদর্শ তুলে ধরার এক সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ ছাড়া দেশের পাঠ্যপুস্তকে তার জীবন ও কর্মকে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। এটি জাতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক কোনো সাময়িক রাজনৈতিক নির্মাণ নন; তিনি ছিলেন বাংলার আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার অবদান এতটাই গভীর ও বিস্তৃত যে, তাকে ভুলে যাওয়ার দুঃসাহস বাঙালি জাতির নেই। ইতিহাসের সত্যকে যতই আড়াল করার চেষ্টা করা হোক না কেন, তা শেষ পর্যন্ত নিজস্ব শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং শেরে বাংলার অবস্থান সেই চিরন্তন সত্যের মধ্যেই অমলিন ও চিরস্থায়ী। ২৭ এপ্রিল শুধু একটি স্মরণ দিবস নয়, এটি আমাদের জন্য এক আত্মসমালোচনা এবং ইতিহাস পুনরাবিষ্কারের দিন। এই দিনে আমরা শেরে বাংলার আদর্শকে ধারণ করে একটি ন্যায়ভিত্তিক, সমতাপূর্ণ এবং মানবিক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার করতে পারি। তার স্মৃতি ও আদর্শ চিরকাল আমাদের পথ দেখাবে এই প্রত্যাশা রইল।

লেখক : লেখক, নারী ও শিশুবিষয়ক সম্পাদক শের-ই-বাংলা ফাউন্ডেশন