ঢামেক হাসপাতালে দালালচক্র নেপথ্যে কারা?

১৯৩৯ সালে পরিকল্পনা হলেও, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে পিছিয়ে ১৯৪৬ সালের ১০ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে প্রায় ৪৫০০+ শয্যা, ৪২টিরও বেশি বিভাগ এবং বার্ন ইউনিট, বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টেশনসহ বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞ বলেন, ঢাকা এবং পূর্বের পঙ্গু হাসপাতালে যে যন্ত্রপাতি এবং বোদ্ধা চিকিৎসক দল রয়েছে তারা বিশে^র সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক চিকিৎসা করতে সক্ষম। তবু কীসের অনীহা, তা বোঝা দুষ্কর। অথচ তারাই বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছেন। এটি কেন হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার। জানা যাচ্ছে, হাসপাতালে রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ থেকে রোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। বাস্তবতা হচ্ছে, ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালসহ রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোতে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য চরমে, যা সঠিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা। দালালচক্রের সদস্যরা রোগীদের ভুল বুঝিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে নিচ্ছে, পরীক্ষার সিরিয়াল দ্রুত করিয়ে দেওয়ার নামে অতিরিক্ত টাকা আদায় এবং জরুরি বিভাগে চিকিৎসার নামে অর্থ হাতানো তাদের নিয়মিত কাজ। অন্যদিকে হাসপাতালে সিট পাইয়ে দেওয়া, ট্রলি সুবিধা এবং রক্ত সংগ্রহের কথা বলে অসহায় রোগী থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হচ্ছে। আবার মৃতদেহ হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও টাকা দাবি করা হয়! স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ঢামেক হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে ঘোষণা করেছেন, ‘যেকোনো মূল্যে হাসপাতাল থেকে দালালের দৌরাত্ম্য ও ট্রলি বাণিজ্য নির্মূল করা হবে। হাসপাতালের ভেতরের কর্মচারী পরিচয়ে যেন কেউ প্রতারণা করতে না পারে, সেজন্য নির্ধারিত আইডি কার্ড ও পোশাক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।’ এর আগেও, অনেকে এমনটি বলেছেন। কিছুদিন ধরপাকড়, হা-হতোস্মি, তারপর সব আগের মতো।

বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দালাল নির্মূলের ঘোষণা দেয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, চক্রটি সক্রিয়। নেপথ্যে শুধু দালালই রয়েছে, এমনটি ভাবার কারণ নেই। তিন পর্বে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নিয়ে দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত তথ্যে, দালালচক্রের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। যার মূল কথা হচ্ছে, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের মুখে কিছু রাখঢাক করা হয়। কিন্তু দুই-তিন পর আবার দালালদের তৎপরতা। এখন দিনের বেলা প্রশাসনের তৎপরতার মুখে দালালদের আনাগোনা কিছুটা কম চোখে পড়লেও রাত হলেই বেড়ে যায় তাদের দৌরাত্ম্য। রোগীদের বেড পাইয়ে দেওয়ার জন্য তৎপর রয়েছে দালালচক্র। সম্প্রতি ঢামেক হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে ৫৮ দালালকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) ভ্রাম্যমাণ আদালত। ৫৮ জনের মধ্যে ৫০ জনই ছিল হাসপাতালের ভেতরে আর আটজন বাইরে। এ ঘটনার মাধ্যমে হাসপাতালের ভেতরে দালালচক্রের অবস্থানের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে।

প্রায়ই শোনা যায়, এক্স-রে, ইসিজি, এনজিওগ্রাম, সিটিস্ক্যান, এমআরআইসহ কোনো না কোনো মেশিন নষ্ট। প্রতিদিন রাজধানীসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে হাজার হাজার রোগী চিকিৎসাসেবার জন্য ছুটে আসেন ঢামেক হাসপাতালে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের প্রবেশ মুখে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে রোগী ও তাদের স্বজনদের। অ্যাম্বুলেন্স ও অন্যান্য যানবাহন জটে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের সময়মতো হাসপাতালে প্রবেশ করতে বেগ পোহাতে হচ্ছে। ঢামেক এলাকায় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা জানান, নিয়মিতভাবে অবৈধ পার্কিং উচ্ছেদ, দালালদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হলেও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। আসলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা ছাড়া সমস্যা সমাধান অসম্ভব। মূল যে বিষয় আমাদের উদ্বিগ্ন করে, আসলে এই চক্রের নেপথ্যে শক্তিশালী কারা? তারা কি হাসপাতালের বাইরের কেউ!