এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি সুবিধা বাতিলে বিল পাস

সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা বাতিল করে জাতীয় সংসদে বিল পাস হয়েছে। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদে ‘দ্য মেম্বারস অব পার্লামেন্ট রেমুনারেশন অ্যান্ড অ্যালাউন্সেস অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করে পাসের প্রস্তাব করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়।

বিলের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘জনগণের সেবা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সংসদ সদস্যদের নিজের নামে শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি একদিকে যেমন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, অন্যদিকে তেমনি এ ধরনের শুল্কমুক্ত সুবিধা কর প্রদানের ক্ষেত্রে দেশের মালিক জনগণের সঙ্গে দৃশ্যমান বৈষম্য তৈরি করে। এই প্রেক্ষিতে সংসদ নেতার দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে জাতীয় সংসদের সদস্যদের জন্য বিদ্যমান শুল্কমুক্ত গাড়ি সুবিধা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় ব্যয় সংকোচন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের সঙ্গে সাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে’ ওই সুবিধা বাতিলের জন্য আর্টিকেল থ্রিসি বিলুপ্তির উদ্দেশ্যে বিলটি আনা হয়েছে।

এরপর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বিলটি পাসের জন্য ভোটে দেন। বিলের ওপর কোনো সংশোধনী প্রস্তাব ছিল না। কোনো আলোচনা ছাড়াই কণ্ঠভোটে পাস হয়।

বিল পাসের ফলে ‘দ্য মেম্বারস অব পার্লামেন্ট রেমুনারেশন অ্যান্ড অ্যালাউন্সেস অর্ডার, ১৯৭৩’ এর আর্টিকেল থ্রি সি বিলুপ্ত হলো। এই ধারায় বলা ছিল একজন সংসদ সদস্য তার পুরো মেয়াদকালে শুল্কমুক্তভাবে মূল্য সংযোজন কর, উন্নয়ন সারচার্জ এবং আমদানি পারমিট ফি ব্যতীত সরকার নির্ধারিত বিবরণ ও শর্ত অনুযায়ী একটি গাড়ি, জিপ বা মাইক্রোবাস আমদানি করার অধিকারী হবেন। আরও বলা ছিল সর্বশেষ আমদানির তারিখ থেকে ৫ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর আরেকটি নতুন গাড়ি, জিপ বা মাইক্রোবাস আমদানির অধিকারী হবেন তিনি।

এর আগে ২৩ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ কমিটির সভায় সংসদ সদস্যদের এই সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট না নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন।

সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি সুবিধা স্বাধীনতার পর থেকেই ছিল না। ১৯৮৮ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে চতুর্থ সংসদ নির্বাচনের পর এ সুবিধা যুক্ত হয়। ২০২৪ সালের বাজেটেও এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি সুবিধা বাতিলের প্রস্তাব এসেছিল। ওই সময় সংসদে কয়েকজন সদস্য আগের মতোই বিনা শুল্কে গাড়ি আমদানির সুবিধা রাখার দাবি তুলেছিলেন।

সংসদে প্রধানমন্ত্রী :

পুলিশসহ জরুরি সেবায় নিয়োজিতদের জ্বালানি রেশনিং প্রত্যাহার : জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান জানিয়েছেন, পুলিশসহ জরুরি সেবায় নিয়োজিত বাহিনীর ওপর আরোপিত জ্বালানি তেলের সীমাবদ্ধতা বা রেশনিং এরই মধ্যে তুলে নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ও জনগণের নির্বিঘœ চলাচল নিশ্চিত করতে দুই দিন আগেই এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর পয়েন্ট অব অর্ডারে দেওয়া বক্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রী ফ্লোর নিয়ে এসব কথা জানান। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।

কুমিল্লার একজন কাস্টমস কর্মকর্তা হত্যার ঘটনা ও পুলিশের টহল কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে ‘তেল সংকট’ ও ‘রেশনিং’র বিষয়টি সংসদে উত্থাপিত হলে প্রধানমন্ত্রী ফ্লোর নেন।

তারেক রহমান বলেন, ‘সংসদ সদস্য যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, বিষয়টি আমরা এরই মধ্যে অ্যাড্রেস করেছি। পুলিশসহ ইমার্জেন্সি বাহিনী যারা আছে পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স বা ফায়ার ব্রিগেড, তাদের ওপর থেকে যে এমবার্গো (নিষেধাজ্ঞা) ছিল, তা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দুই দিন আগেই এ সিদ্ধান্ত আমরা গ্রহণ করেছি এবং বিষয়টি ক্লিয়ার করে দেওয়া হয়েছে। আশা করি এ সমস্যা আর হবে না।

এর আগে সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী তার বক্তব্যে অভিযোগ করেন, জ্বালানি তেলের রেশনিংয়ের অজুহাতে পুলিশ রাতে টহল কমিয়ে দিয়েছে, যার ফলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘিœত হচ্ছে। কুমিল্লার একজন কাস্টমস কর্মকর্তা হত্যার শিকার হয়েছেন। পুলিশ বলছে, জ্বালানি তেলের কারণে তারা ঠিকমতো টহল দিতে পারছে না।

 

হামলার বর্ণনা দিয়ে সংসদে নিরাপত্তা চাইলেন জামায়াত এমপি

নির্বাচনী এলাকায় হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলে ধরে সংসদে নিরাপত্তা চেয়েছেন নেত্রকোণা-৫ আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফা। সেই সঙ্গে তিনি তার গাড়িতে হামলার সঙ্গে জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তারে দাবি জানান। গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তিনি এ দাবি জানান।

তিনি অভিযোগ করেন, গত শুক্রবার সন্ধ্যায় পূর্বধলার একটি ফিলিং স্টেশনে তার গাড়িতে হামলা চালানো হয় এবং মসজিদে ঢুকে তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়।

এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।

মাছুম মোস্তফা বলেন, ‘আমি নির্বাচনী এলাকায় সাংগঠনিক কাজে, সামাজিক কাজে যাই। কাজ শেষ করে ফেরার সময় একটি ফিলিং স্টেশনে দেখতে পাই প্রচুর গাড়ির ভিড়। তখন আমি স্বাভাবিকভাবে সেখানে দাঁড়ালাম। ফিলিং স্টেশনে গাড়ি রেখে মানুষের খোঁজখবর নিলাম।’ এর মধ্যে মাগরিবের আজান হলে ফিলিং স্টেশনের নামাজের জায়গায় নামাজ পড়তে যান বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘সেই মুহূর্তে বিএনপির কিছু লোক, যারা বিএনপির নাম ধারণ করেছে, তারা সন্ত্রাসী, তারা আমার গাড়ির ওপর হামলা চালায়। আমার লোকজন যারা সাউন্ড শুনে আসে, তাদের ওপর হামলা করে। মুসল্লিরা মসজিদের দরজা বন্ধ করে দেন। এরপর হামলাকারীরা বিভিন্ন অস্ত্র দিয়ে দরজায় আঘাত করে। গালিগালাজ করে ও হত্যার হুমকি দেয়।

তিনি বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, আমি আপনার কাছে আমার নিরাপত্তা চাই। আমার পরিবারের নিরাপত্তা চাই। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়ের কাছে আমি আমার এলাকার সংগঠনের কর্মীদের নিরাপত্তা চাই।’

স্পিকার বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি পত্রিকায় দেখেছেন, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং পুলিশ ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

জবাবে মাছুম মোস্তফা বলেন, ‘পুলিশ যাদের গ্রেপ্তার করেছে, তাদের মধ্যে একজন শুধু তালিকাভুক্ত আসামি। বাকিরা নিরপরাধ। আজ ৯ জন জামিনে চলে এসেছে। আর যারা আসামি ছিলেন, তারা সকলেই এলাকায় মিছিল করতেছেন।’

এরপর স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদে ফ্লোর নিয়ে বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা সবাই এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছি এবং এতে আমরা অত্যন্ত দুঃখিত বোধ করেছি। আমাদের সংসদ নেতা পাশেই বসে আছেন। তিনি আমাকে বলেছেন যে, তিনি নিশ্চিত করবেন যেন এটা সুষ্ঠু একটি তদন্ত হয়। প্রকৃত অপরাধীদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়া হবে।’

এরপর স্পিকার বলেন, ‘একজন সংসদ সদস্যের ওপর হামলা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। পুরো সংসদ এ বিষয়ে একমত। আপনার এ বিষয়ে যাতে কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যারা প্রকৃত অপরাধী তাদেরকে ধরার ব্যাপারে মন্ত্রী এরই মধ্যে বলেছেন। আপনি ফলাফল দেখার জন্য অপেক্ষা করুন।’