শিক্ষার আলোয় ফিরতেই উচ্ছেদের শঙ্কা

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০২:১২ এএম

রাজশাহী নগরীর ভদ্রা এলাকায় আরডিএ পার্কের বিপরীতে রেলওয়ে কলোনির বস্তিতে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে কোনো বিদ্যালয় ছিল না। জীবিকার তাগিদে যেখানে শিশুরা ভাঙাড়ি সংগ্রহ, গৃহস্থালির কাজ কিংবা অন্য অনানুষ্ঠানিক শ্রমে যুক্ত হয়ে পড়ত, সেখানে ‘বিকল্প পাঠশালা’ তাদের জীবনে নতুন করে শিক্ষার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে শিক্ষার এই আলো নিভে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বস্তি উচ্ছেদের জন্য নোটিস দিয়েছে বলে দাবি করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও স্কুল পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। এতে একদিকে বসতি হারানোর শঙ্কা, অন্যদিকে বন্ধ হয়ে যেতে পারে শিশুদের এই বিকল্প পাঠশালাটিও।

সরেজমিনে কলোনি বস্তিতে দেখা যায়, ঘিঞ্জি বসতি, অভাব-অনটন আর জীবনসংগ্রামের মধ্যেই বসবাস করেন এখানকার মানুষ। কেউ ভিক্ষা করেন, কেউ অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন, আবার কেউ শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে ভাঙাড়ি সংগ্রহ করে সংসার চালান। স্থানীয়দের দাবি, এই বস্তিতে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ পরিবারের বসবাস। তারা তিন-চার দশক ধরে এখানে আছেন। কিন্তু এত দীর্ঘ সময়েও এখানে গড়ে ওঠেনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা। এমন বাস্তবতায় ‘সম্পর্ক সমাজকল্যাণ সংস্থা’র উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বিকল্প পাঠশালা’। স্কুলটিতে প্রায় ৪৫-৫০ জন শিশু নিয়মিত পড়াশোনা করছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ও রাজশাহী কলেজের প্রায় ১৫জন স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষার্থী বিনা পারিশ্রমিকে শিশুদের পাঠদান করান। শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ের পাঠ দেওয়া হচ্ছে। শুধু শিশুদের জন্য নয়, প্রতি শুক্রবার বস্তির বয়স্কদের জন্যও চালু হয়েছে শিক্ষা কার্যক্রম। বিকল্প পাঠশালার তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী বলে, ‘আমাগো এই বস্তিতে কোনো স্কুল ছিলো না। এখন ভার্সিটির ভাইয়েরা আমাদের নিয়মিত পড়াশোনা করান। সপ্তাহে ছয় দিন আমরা স্কুলে আসি’ শিশু শ্রেণির শিক্ষার্থী কামরুলের কাছেও স্কুলটি এখন আনন্দের জায়গা। তার ভাষায়, ‘প্রতিদিন বিকেলে ক্লাস হয় আমাদের। যোগ, বিয়োগ, ড্রয়িং সবকিছুই শেখানো হচ্ছে।’

শিশুদের এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন রাবির স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের গ্রাফিকস ডিজাইন বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তাসনুভা আমিন নিয়মিত এই স্কুলে ক্লাস নেন। তিনি বলেন, ‘এই এলাকাটি খুবই অবহেলিত। এখানকার কেউ গৃহকর্মী, কেউ রাজমিস্ত্রি, আবার কেউ কেয়ারটেকার। তাদের সন্তানরাই এখানে পড়ে। অবহেলিত এসব শিশুদের নিয়ে এই কর্মসূচি শুরু থেকেই যুক্ত আছি। রাবির শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগের শিক্ষার্থী কামরুল হাসানও মনে করেন, ‘এখানকার ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা থেকে অনেক দূরে। কারণ অধিকাংশ পরিবারই অত্যন্ত দরিদ্র। তারা শিক্ষার আলো থেকে দূরে থাকবে এটা আমরা চাই না।’

স্কুল বদলেছে শিশুদের স্বপ্ন : শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আগ্রহ তৈরি হওয়াকে বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন স্কুল পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। স্কুল কমিটির উপদেষ্টা ও রাবির ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. গোলাম সারোয়ার বলেন, ‘শিশু শ্রম থেকে বের করে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য। পাঠশালাটি স্থাপনের পর এখানকার মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথেই এখন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বস্তি উচ্ছেদের আশঙ্কা। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বস্তি উচ্ছেদের জন্য নোটিস দিয়েছে বলে শুনেছি। এতে বসবাসের জায়গা হারানোর পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষা বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উচ্ছেদের আগে অবশ্যই তাদের সুনির্দিষ্ট পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।’

‘স্কুলটা আমাদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে’ : বস্তির বাসিন্দা রোজিনা বেগম ও জেসমিন আক্তার বলেন, ‘সম্পর্ক সমাজকল্যাণ সংস্থা’র উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের মামারা একটা স্কুল চালু করেছে, ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছে। আমরা চাই সন্তানরা পড়াশোনা করুক। কিন্তু এখন শুনছি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বস্তি ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাহলে আমরা কোথায় যাব, আমাদের সন্তানদের পড়াশোনাই বা কোথায় হবে? রাজশাহী মহানগর বিপ্লবী দলের সদস্য সচিব মো. ফয়সাল শেখ বলেন, ‘এই বস্তিতে প্রায় ৩০০ পরিবারের বসবাস। এখানে প্রায় ৪০-৫০ জন শিশু নিয়মিত পড়াশোনা করছে। এসব শিশু সমাজে অনেকটাই অবহেলিত। তাদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব।’

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষায় ‘সম্পর্ক’ : সম্পর্ক সমাজকল্যাণ সংস্থার সভাপতি গোপালদেব শর্মা জানান, কলোনির বস্তির শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনতে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। আমরা মূলত সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করি। রাবির প্রায় ১৫ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাস নেন। পাশাপাশি শুক্রবার বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। বস্তির শিশুদের পড়াশোনার খরচ বহন করা অভিভাবদের জন্য কঠিন। কয়েক দশক পর এখানে শিক্ষার আলো পৌঁছেছে, উচ্ছেদের পর তা নিভে যাবে। উচ্ছেদের আগে বস্তিবাসীর পুনর্বাসনের বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত