সুবিধা বণ্টনে দ্বৈতনীতি সংকটে শিক্ষক সমাজ

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার মূল শক্তি শিক্ষক সমাজ। এই শক্তির বড় অংশজুড়ে রয়েছেন এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা। তারা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত হলেও, তাদের বেতন আসে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত শিক্ষার বিস্তার, জ্ঞানচর্চার পরিবেশ সৃষ্টি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাদের অবদান অপরিসীম। সীমিত সুযোগ-সুবিধা সত্ত্বেও তারা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে। তবুও নীতিগত সুবিধা বণ্টনের ক্ষেত্রে তারা বারবার বঞ্চিত হচ্ছেন, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সাবস্টেনটিভ গ্রেডভিত্তিক ১৫% বিশেষ সুবিধা চালু করা হয়েছে। এটি সরকারি কর্মচারীদের জন্য একটি আর্থিক সুবিধা। এই সুবিধা মূল বেতনের ওপর নির্ধারিত। গ্রেড-ভিত্তিকভাবে এটি প্রদান করা হয়। এর উদ্দেশ্য কর্মীদের আর্থিক স্বীকৃতি দেওয়া। সাবস্টেনটিভ গ্রেড বলতে বোঝায়, কর্মচারীর মূল গ্রেড। এটি চাকরির শুরুতে নির্ধারিত হয়। পরে পদোন্নতি হলেও, এটি অনেক সময় অপরিবর্তিত থাকে। এই গ্রেডের ভিত্তিতেই বেতন কাঠামো নির্ধারিত হয়। তাই এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, গ্রেড ১ থেকে ৯ পর্যন্ত কর্মচারীরা ১০% সুবিধা পান। গ্রেড ১০ থেকে ২০ পর্যন্ত কর্মচারীরা ১৫% সুবিধা পান। এই সুবিধা মূল বেতনের সঙ্গে যোগ হয়। একটি নির্দিষ্ট ন্যূনতম সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি আর্থিক সহায়তার একটি উদ্যোগ। তবে বাস্তবে এই সুবিধা, সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর হয়নি। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিয়েছে। অনেক শিক্ষক ১০ম গ্রেডে নিয়োগ পান। পরে তারা ৯ম গ্রেডে উন্নীত হন। কিন্তু সুবিধাপ্রাপ্তিতে তারা অনেক সময় বাদ পড়ে যান। একই যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও এই পার্থক্য তৈরি হয়। একই কাজ করা সত্ত্বেও সবাই সমান সুবিধা পান না। এটি একটি স্পষ্ট বৈষম্যের চিত্র তৈরি করে। ফলে প্রশ্ন উঠছে ন্যায়বিচার নিয়ে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বড় অংশ এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ওপর নির্ভরশীল। শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার কাজে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত শিক্ষা পৌঁছে দেন। যেখানে সরকারি স্কুল-মাদ্রাসা কম, সেখানে তারা মূল ভরসা। তারা শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেন প্রতিটি এলাকায়। সবসময় তারা সরকারি শিক্ষকদের সমান কাজ করেন। তারা পাঠদান, মূল্যায়ন এবং শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করেন। কিন্তু সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে পার্থক্য থেকে যায়। এই পার্থক্য দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার বিষয়। তাদের ছাড়া শিক্ষাব্যবস্থা অচল হয়ে পড়বে। তবুও তাদের আর্থিক অবস্থান তুলনামূলকভাবে দুর্বল।

সরকারি শিক্ষকদের তুলনায় তাদের বেতন কম। পদোন্নতির সুযোগও সীমিত। অন্যান্য সুবিধার ক্ষেত্রেও তারা পিছিয়ে। নতুন ১৫% সুবিধা তাদের জন্য আরও একটি দূরত্ব তৈরি করেছে। এই বৈষম্যের একটি বড় কারণ প্রশাসনিক কাঠামো। সরকারি কর্মচারী এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক, এই দুই শ্রেণির পার্থক্য রয়েছে। নীতিমালা সব ক্ষেত্রে একভাবে প্রয়োগ হয় না। ফলে সুবিধা বণ্টনে অসামঞ্জস্য দেখা দেয়। নতুন এই ১৫% বিশেষ সুবিধা থেকে বাদ পড়া সেই ব্যবধানকে আরও গভীর করেছে এবং তাদের মধ্যে হতাশা ও অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। এটি জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যদিও এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে বেতন পান। তবুও তাদের অনেক সুবিধা সীমিত রাখা হয়। এটি নীতিগত অস্পষ্টতার কারণে হয়। জাতীয় শিক্ষানীতিতে সমতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তার পূর্ণ প্রয়োগ দেখা যায় না। আরেকটি সমস্যা হলো, প্রযুক্তিগত জটিলতা। অনেক সময় ভুল তথ্য এন্ট্রি হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদনে দেরি হয়। এতে শিক্ষকরা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। কিছু কর্মকর্তা দায়িত্ব নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। কারণ ভুল হলে দায় তাদের ওপর পড়ে। তাই প্রক্রিয়াটি আরও জটিল হয়ে যায়। এর ফলে বাস্তবায়ন ধীরগতির হয়। শিক্ষকরা অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন। এই বৈষম্যের প্রভাব শুধু অর্থনৈতিক নয়। এটি মানসিক অবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলে। শিক্ষকরা নিজেদের অবমূল্যায়িত মনে করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে আর্থিক বৈষম্য কর্মদক্ষতা কমিয়ে দেয় এবং পেশাগত সন্তুষ্টি হ্রাস করে। ফলে এটি দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শ্রেণিকক্ষে যার প্রভাব সরাসরি পড়ে। শিক্ষার্থীদের শেখার মানে পরিবর্তন আসে।

শিক্ষক যদি মনোবল হারান, শিক্ষা প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি দীর্ঘমেয়াদে বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, আর্থিক বৈষম্য কর্মদক্ষতা কমায়। এটি পেশাগত সন্তুষ্টি হ্রাস করে। শিক্ষক সমাজে এটি আরও বেশি প্রভাব ফেলে। কারণ তারা সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি। তাদের মনোবল খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের এই ১৫% সুবিধার আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, নীতিমালার স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। যাতে বিভ্রান্তি না থাকে। তৃতীয়ত, প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে হবে। সিস্টেমকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করতে হবে। তথ্য যাচাই ও অনুমোদন দ্রুত করতে হবে। ভুল এড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণ দরকার। চতুর্থত, সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মধ্যে ব্যবধান কমাতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার। ধাপে ধাপে সমতা আনার উদ্যোগ নিতে হবে। এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। সাবস্টেনটিভ গ্রেডভিত্তিক ১৫% বিশেষ সুবিধা একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও, এর অসম প্রয়োগ একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাদ দেওয়া ন্যায়সংগত নয়। এটি তাদের পেশাগত মর্যাদা ও আত্মসম্মানের প্রশ্ন। একটি উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে, সমতা প্রয়োজন। একটি বৈষম্যমুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে,  এই অসামঞ্জস্য দূর করা এখন সময়ের দাবি।

লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

foysal.babul@gmail.com