সংকট ও সংস্কার দোলাচলে পুলিশ

যখন পুলিশ বাহিনীর ভেতরে অস্থিরতা, অসন্তোষ আর অবিশ্বাসের কালো মেঘ দানা বাঁধতে শুরু করে তখন রাষ্ট্রযন্ত্রের স্থিতিশীলতা পড়ে হুমকির মুখে। ২০২৪ সালের আগস্টের পটপরিবর্তনের পর, বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীতে যে কাঠামোগত ও মানসিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, ২০২৬ সালের এপ্রিলে এসে তা জটিল ও সংকটাপন্ন মোড় নিয়েছে। বাহিনীর খোলনলচে বদলে ফেলার নানা উদ্যোগ এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ফারাক সৃষ্টি হওয়ায়, পুলিশ বাহিনীর ভেতরে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে যখন নিজস্ব পরিচয়, পোশাক এবং নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় তখন সেই বাহিনী দিয়ে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। ২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এটি স্পষ্ট যে, পুলিশ বাহিনী এখন চরম ক্রান্তিকাল পার করছে। এমন মানসিক অস্থিরতার সবচেয়ে ভয়ংকর ও করুণ বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, পুলিশ সদস্যদের আত্মহত্যার ঘটনার মধ্য দিয়ে। গত কয়েক মাসে পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন পদমর্যাদার সদস্যদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে, যা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ মানসিক স্বাস্থ্যের ভঙ্গুর দশাকে স্পষ্ট করে দেয়। আমরা যদি সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার দিকে তাকাই, তবে শিউরে উঠতে হয়। গত মাসে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের এক কনস্টেবল ব্যারাকের ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তার মরদেহের পাশে পাওয়া সুইসাইড নোটে লেখা ছিল ‘ছুটি নেই, ঘুম নেই, এই জীবন আর টানতে পারছি না।’ একইভাবে, চট্টগ্রামে এক নারী পুলিশ সদস্য ফেসবুক স্ট্যাটাসে কর্মক্ষেত্রের নিগ্রহের কথা লিখে বিষপান করেন।

এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এগুলো প্রমাণ করে যে পুলিশ সদস্যদের মানসিক স্থিতিশীলতা এখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। পরিসংখ্যান বলছে, কেবল গত এক বছরেই বাহিনীতে আত্মহত্যার হার আগের চেয়ে ২০% বেড়েছে। পুলিশ সদস্যদের জন্য কোনো বিশেষায়িত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বা কাউন্সিলিং সেন্টার না থাকায়, তারা  চাপা ক্ষোভ ও দুঃখের নিকাশ খুঁজে পাচ্ছেন না। যখন একজন রক্ষক নিজেই নিজের প্রাণ কেড়ে নিতে বাধ্য হন, তখন বুঝতে হবে সিস্টেমের গোড়ায় বড় গলদ রয়েছে। মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের মনোবল ভেঙে যাওয়ার পেছনে আবাসন সংকট বিশাল ফ্যাক্টর। রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরগুলোতে, পুলিশ সদস্যদের জন্য মানসম্মত আবাসনের তীব্র অভাব রয়েছে। হাজার হাজার পুলিশ সদস্য অত্যন্ত ঘিঞ্জি ব্যারাকে, গাদাগাদি করে বাস করেন। যেখানে ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা নেই। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি ছোট ঘরে ১০-১২ জন সদস্যকে থাকতে হচ্ছে, যেখানে তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা বিশ্রামের সুযোগ নেই। মফস্বল এলাকার থানার অবস্থা আরও শোচনীয়। জরাজীর্ণ ভবন, স্যাঁতসেঁতে দেয়াল আর অস্বাস্থ্যকর টয়লেট ব্যবহার করে তাদের দিনের পর দিন কাটাতে হয়। নিজ আবাসস্থলের এই দুরবস্থা, মানসিক অশান্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। পরিবারের সঙ্গে থাকার সুযোগ না পাওয়া এবং দিনের পর দিন ব্যারাক জীবনের একঘেয়েমি তাদের খিটখিটে ও হতাশ করে তুলছে। উন্নত বিশ্বের পুলিশ সদস্যদের যেখানে সুসজ্জিত ডরমিটরি ও ফ্যামিলি কোয়ার্টার থাকে, সেখানে আমাদের দেশে পুলিশ সদস্যদের জীবন যেন অনেকটা ‘ক্যাম্প’ জীবনের মতো দুর্বিষহ। বেতন বৈষম্য এবং আর্থিক অনটন এই অস্থিরতার আগুনে ঘি ঢালছে। পুলিশ কনস্টেবল থেকে শুরু করে সাব-ইন্সপেক্টর পর্যায়ের সদস্যদের যে বেতন কাঠামো, তা বর্তমান আকাশছোঁয়া দ্রব্যমূল্যের বাজারে টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট নয়। অথচ তাদের কাজের ঝুঁকি ও সময়সীমা সিভিল সার্ভিসের যেকোনো ক্যাডারের চেয়ে বেশি।

একজন পুলিশ সদস্যকে ২৪ ঘণ্টা অন-কলে থাকতে হয়, তার কোনো সাপ্তাহিক ছুটি নেই, নেই উৎসব বোনাসের বাড়তি বিশ্রাম। কিন্তু মাস শেষে তিনি যে বেতন পান, তা দিয়ে ঢাকা শহরে একটি সাধারণ পরিবার চালানো অসম্ভব। এই আর্থিক টানাটানির কারণে অনেক সদস্য অনিচ্ছা সত্ত্বেও, দুর্নীতির দিকে ধাবিত হন, যা পরে তাদের মধ্যে অপরাধবোধ ও আত্মগ্লানি তৈরি করে। বেতন বৈষম্য কেবল আর্থিক বিষয় নয়, এটি মর্যাদারও প্রশ্ন। যখন একজন সদস্য দেখেন যে, তার চেয়ে কম ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা অন্য কোনো সরকারি অফিসের পিয়নও তার সমান সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন, তখন তার পেশাদারিত্বে ধস নামে। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন বারবার বেতন ও ঝুঁকিভাতা বাড়ানোর দাবি করলেও, আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা আলোর মুখ দেখছে না। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রভাবে পুলিশ প্রশাসনে যে ব্যাপক রদবদল হয়েছে, তা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ চেইন অব কমান্ডকে দুর্বল করেছে। নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর পূর্ববর্তী প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত শত শত সদস্যকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো বা তদন্তের মুখোমুখি করা হয়েছে। যদিও স্বচ্ছতার খাতিরে এটি জরুরি ছিল, কিন্তু ঢালাওভাবে তদন্তের মুখে থাকার ভীতি সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনেক কর্মকর্তাই বড় কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বা অপরাধ দমনে সক্রিয় হতে ভয় পাচ্ছেন। তাদের মনে সার্বক্ষণিক এই আতঙ্ক কাজ করছে যে, আজ যে পদক্ষেপটি তারা নিচ্ছেন, কাল রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে সেটিই হয়তো তাদের বিরুদ্ধে মামলা বা বহিষ্কারের কারণ হবে। এই ‘ভীতি-সংস্কৃতি’ পুলিশ বাহিনীকে এক ধরনের স্থবিরতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। শীর্ষ কর্মকর্তাদের কঠোর সিদ্ধান্ত এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয়হীনতা, পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে কিশোর গ্যাং, ছিনতাই এবং বড় ধরনের ডাকাতির ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে মাঠপর্যায়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট বা আইনি সুরক্ষা অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। ওপরের মহলের নির্দেশ পালন করতে গিয়ে,  মাঠপর্যায়ের সদস্যরা যখন জনসাধারণের মুখোমুখি হচ্ছেন, তখন তারা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পাচ্ছেন না। অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং ২৪ ঘণ্টা ডিউটির ক্লান্তি তাদের খিটখিটে ও আক্রমণাত্মক করে তুলছে, যা অনেক সময় সাধারণ মানুষের সঙ্গে অপ্রীতিকর সংঘর্ষের জন্ম দিচ্ছে। শীর্ষ কর্তাদের এই চাপ এবং মাঠপর্যায়ের সদস্যদের অক্ষমতা বাহিনীর ভেতরে অভ্যন্তরীণ বিভাজন তৈরি করছে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দায়িত্ব পালনে নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং জনরোষের ভীতি। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে পুলিশ বাহিনীর কিছু সদস্যের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে সাধারণ মানুষের মনে পুলিশের প্রতি যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তা ২০২৬ সালেও পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের মধ্যে এখনো আতঙ্ক কাজ করে যে, কোনো উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে তারা একা হয়ে পড়লে জনতার ক্ষোভের শিকার হতে পারেন। ইউনিফর্ম পরে রাস্তায় বের হতে অনেক সদস্য এখনো অস্বস্তি বোধ করেন। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে, স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে অভিযান চালাতে পুলিশ সদস্যরা আগের মতো সাহস পাচ্ছেন না। জনরোষের ভয়ে তারা অনেক সময় অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া থেকে বিরত থাকছেন, যা প্রকারান্তরে সমাজে অপরাধ প্রবণতাকে উৎসাহিত করছে। এই পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করা প্রয়োজন। একটি রাষ্ট্রের পুলিশ বাহিনীকে যদি সারাক্ষণ পোশাক পরিবর্তন আর রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যে রাখা হয়, তবে তারা অপরাধ দমন করবে কখন? বারবার পোশাক পরিবর্তনের নামে জনগণের করের টাকার অপচয় কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এটি পরিষ্কার যে, পুলিশ প্রশাসনে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে চরম অদূরদর্শিতা কাজ করছে। রাজনৈতিক দলগুলোর লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করার যে সংস্কৃতি গত কয়েক দশকে গড়ে উঠেছিল, তার মাশুল আজ পুরো বাহিনীকে দিতে হচ্ছে। সংস্কারের নামে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে, তাতে পুলিশ সদস্যদের মানুষ হিসেবে গণ্য না করে কেবল আজ্ঞাবহ যন্ত্র হিসেবে দেখার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এটি কেবল পুলিশের সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় সংকট। পুলিশ যদি মানসিকভাবে বিধ্বস্ত থাকে, তবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বালির বাঁধের মতো ধসে পড়বে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজন। প্রথমত, পুলিশ বাহিনীকে রাজনীতিমুক্ত করার আইনি নিশ্চয়তা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, পোশাকের মতো গৌণ বিষয় নিয়ে সময় নষ্ট না করে সদস্যদের পেশাদার প্রশিক্ষণ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে হবে। প্রতিটি জেলায় এবং পুলিশ ব্যারাকে বিশেষজ্ঞ সাইকোলজিস্ট বা মনোবিদ নিয়োগ করা এখন সময়ের দাবি। পুলিশ সদস্যদের নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ট্রেনিং দেওয়া বাধ্যতামূলক করা দরকার। আত্মহত্যার মতো ঘটনা রুখতে, হেল্পলাইন চালু করতে হবে। যেখানে সদস্যরা পরিচয় গোপন রেখে, তাদের সমস্যার কথা বলতে পারবেন।

আবাসন সমস্যার সমাধানে ‘আধুনিক পুলিশ টাউনশিপ’ গড়ে তুলতে হবে এবং বেতন কাঠামোকে বাজারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করে পুনর্র্নির্ধারণ করা উচিত। ২০২৬ সালে পুলিশে অস্থিরতা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যার বহিঃপ্রকাশ। পুলিশ সদস্যদের আত্মহত্যার হার কমিয়ে আনা এবং মানসিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বাহিনীর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। সরকারের উচিত হবে, বিশেষভাবে বাহিনীর প্রতিটি স্তরের সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি সংলাপে বসা এবং তাদের অভাব-অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে শোনা। পোশাকের রঙ পরিবর্তনের চেয়েও জরুরি হলো, পুলিশের অন্তরের পরিবর্তন এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন। আমরা এমন একটি পুলিশ বাহিনী চাই, যারা ভয়ের নয় বরং আস্থার প্রতীক হবে। সংকটের এই মেঘ কেটে গিয়ে পুলিশ বাহিনী আবার নতুন উদ্যমে দেশের সেবায় আত্মনিয়োগ করবে এটিই জাতির প্রত্যাশা। একটি সুশৃঙ্খল ও আত্মবিশ্বাসী পুলিশ বাহিনীই পারে, শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ উপহার দিতে। অপরাধীদের বিষদাঁত ভেঙে দিতে, পুলিশের মনোবল ফিরিয়ে আনা সময়ের সবচেয়ে দাবি। আইনের জয় হোক, পুলিশ হোক জনতার প্রকৃত বন্ধু।

লেখক: সিইও, ইটিসি ইভেন্টস লিমিটেড

antora00111@gmail.com