আমাদের বর্ণমালায় কিছু চিহ্ন আছে। সে রকম শক্তিশালী কিছু মানুষ ঘাপটি মেরে থাকে সমাজে। এদের সম্পূর্ণ চিহ্ন-আকৃতি নেই। দেখতে সাদাসিধে। অথচ কোনো অরাজকতা সৃষ্টি করতে এরা ভীষণ পারঙ্গম। তাদের দেখলে মনে হয় হাবাগোবা, সরল। মনে হয়, মাটির মানুষ। যেমনটি দেখতে মাত্রাযুক্ত ‘য’। মাত্রা ফেলে দিয়ে, কোনো বর্ণের সঙ্গে মিলে এটি সৃষ্টি করতে পারে নতুন দুটি বর্ণ। বামে মোচড় দিলে সে হবে ‘থ’। আবার ডানে মোচড় দিলে হবে ‘ফ’। অন্যদিকে, ‘।’ চিহ্নকে মাত্রা দিয়ে বামে বক্র মোচড় দিলে হবে ‘ন’। আবার ‘ব’ বর্ণের ডানে একটি পেঁচানো বক্র চিহ্ন দিলেই দবে ‘ক’ এরাই ‘পুটলি’ চিহ্ন। যে চরিত্র আছে কিছু শক্তিশালী মানুষের মধ্যে। যারা গোপনে প্রাচীন মগ, বর্গি বা ঠগী দস্যুদের মতো আচরণ করে। এরা সমাজ ও দেশবাসীকে তোয়াক্কা করে না। অবাক ব্যাপার হচ্ছে, তারা আমাদের মধ্যেই বসে আছে। এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই, তারা প্রকাশ্যে বেনিয়াবৃত্তি করছে। সেটি হচ্ছে, তবে গোপনে এবং দলবদ্ধভাবে।
বাংলাদেশে এলপিজি সিলিন্ডার নিয়ে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের দুর্নীতি ও কারসাজি দীর্ঘদিনের হলেও, ২০২৪-২০২৫ সালের পর থেকে এটি চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। ২০২৬ সালের শুরুতে তা তীব্রতর হয়। সরবরাহ সংকট তৈরি করে, সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দামে গ্যাস বিক্রির মাধ্যমে এই কারসাজি নিয়মিত ঘটনা সৃষ্টি করছে সেই পুটলি দুর্নীতিবাজ গোষ্ঠী। মূলত এলপিজি বাজার বেসরকারি খাতের হাতে থাকায় এবং বিইআরসির মূল্য সমন্বয় নীতি ব্যবসায়ীরা পুরোপুরি না মানায়, মূল্য কারসাজি দিনের পর দিন বেড়ে চলেছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান থাকলেও, বিক্রেতারা সরবরাহ সংকটের দোহাই দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে নির্ধারিত দাম উপেক্ষা করে আসছে। এপ্রিল ২০২৬-এ বাংলাদেশে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। এই নতুন মূল্য ১৯ এপ্রিল ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে। ১৮ দিনের ব্যবধানে দুই দফায় দাম বাড়ায় খুচরা বাজারে তা ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিইআরসি চেয়ারম্যানের ভাষ্যমতে, ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। যদিও এ মাসে দুই দফায় ৫৯৯ টাকা মূল্যবৃদ্ধি করে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৯৪০ টাকা। আর বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায়। একই ভাবে অন্যান্য ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য বাড়িয়েছে বিইআরসি। কিন্তু নির্ধারিত দামে তা পাওয়া যাচ্ছে না বাজারে। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আসফাক ই ইলাহী জানান, চলতি মাসে তিনি ৩৫ কেজি ওজনের এলপিজি সিলিন্ডার কিনেছেন ৬ হাজার ৩০০ টাকা দিয়ে। অথচ বিইআরসির নির্ধারিত দাম ৫ হাজার ৬৫৮ টাকা। আবার ৪৫ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের প্রকৃত দাম ৭ হাজার ২৭৫ টাকা। কিন্তু বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে, সাড়ে ৯ হাজার টাকায়।
যে সিন্ডিকেটের কারসাজিতে বিভিন্ন পণ্যমূল্য সময়মতো অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করা হয়, সেই বাড়তি টাকার ভাগ কারা পাচ্ছেন? গুরুতর প্রশ্ন হচ্ছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান যদি নৈরাজ্য থামাতে না পারে, তাহলে মাসে মাসে দাম নির্ধারণ কেন হচ্ছে? একদিকে আবাসিকে গ্যাস সংযোগ বন্ধ ,অন্যদিকে ভোক্তাদের বড় অংশ এখন এলপিজির ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে। ঠিক সময়মতো সক্রিয় হয়েছে সমাজের পুটলি চক্র। সেই দস্যু মগ রাজত্বের মতো। ভোক্তাদের অসুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে, দ্রুত গ্যাস সংকট নিরসন করে ব্যবস্থা নিন। না হলে, দেশ চলবে পুটলি চক্রের মর্জিমতো। সিদ্ধান্ত সরকারের, পথ পরিষ্কার। একদিকে জনগণ, অন্যদিকে এই চক্র। সরকার কোন পথে হাঁটবে?