শটিবনের অপরূপ ছায়া

‘ফণীমনসার ঝোপে শটিবনে তাহাদের ছায়া পড়িয়াছে;

মধুকর ডিঙা থেকে না জানি সে কবে চাঁদ চম্পার কাছে

এমনই হিজল-বট-তমালের নীল ছায়া বাংলার অপরূপ রূপ’

বাংলার মুখ-জীবনানন্দ দাশ

গাজীপুরের পিরুজালি গ্রামের গজারি বন। বনটার সঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কাকাবাবু বনাম মূর্তিচোর’ গল্পটার বর্ণনা যেন হুবহু মিলে যায় ‘জঙ্গলের মধ্য দিয়ে সরু একটা রাস্তা। দুপাশের গাছের ডালপালা ঝুঁকে ঝুঁকে আছে, হাত দিয়ে সরিয়ে সরিয়ে এগোতে হয়। ... জঙ্গলের মধ্যে যেন আলো-ছায়ার জাফরি কাটা।’ বসন্ত ফুরালেও তার রেশ রয়ে গেছে সেখানে। গজারি বনের গাছগুলো শীতে যত পাতা ঝরিয়েছিল, বসন্তে তার চেয়ে বেশি পাতা ছাড়ায় মত্ত ছিল; বিভোর ছিল থোক থোক ফুল ফোটাতে। আহা কী সুন্দর মাটি থেকে গজিয়ে ওঠা গজারির নবীন চারা! মাটি ফুঁড়ে গজারির শেকড় থেকে চারা গজায় বলেই তো এর নাম ‘গজারি’, পোশাকি নাম ‘শাল’। চারার ডগায় মেলে ধরা দু-তিনটি কোমল পল্লবের রঙ-রূপ যে না দেখেছে সে আসলে বুঝবে না বৈশাখের সঙ্গে প্রকৃতির এই মাহাত্ম্য। রোমশ পত্রমুকুটে পোঁচ লেগেছে তামাটে লাল রঙের। কচি কোমল সবুজ পাতাগুলো কাঁপছে মাঝে মাঝে বৈশাখী দমকা হাওয়ায়। তির তির কাঁপা সেসব পাতার ফাঁক দিয়ে আকাশ থেকে মাটিতে নেমে আসছে আলোকের ঝরনাধারা। যেন সেই বনতলে বিছিয়েছে কেউ আলো-ছায়ায় বোনা জাফরি কাটা তাঁতশাড়ি। গজারিগাছগুলোর তলায় তখনো জমে রয়েছে রাশি রাশি বাদামি শুকনো ঝরা পাতা। সেসব পাতার ফাঁক দিয়ে মাটি ফুঁেড় বেরিয়ে এসেছে তুমুল তেজে কিছু তৃণ-লতা, গুল্ম-বিরুৎ।

এ বছর পাঁচই বৈশাখ সকালবেলায় প্রকৃতির এসব সুধারস আকণ্ঠ পানে মগ্ন ছিলাম। হঠাৎ সে মগ্নতায় ছেদ পড়ল। এ কোন আলোর ঝলক? মাটি ফুঁড়ে দীপ্ত আলোকশিখার মতো খাড়া হয়ে উঠে এসেছে ফুটখানেক লম্বা ফুলের মঞ্জরিযেন জঙ্গলের ভেতরে জ্বলছে শত শত আলোকবর্তিকা! মঞ্জরি মুকুটে শোভিত গোলাপি লাল বৃতির গাঁথুনি, গোড়ার দিকে সেসব বৃতির ফাঁক দিয়ে যেন ঘোমটা খুলে নববধূর মতো উঁকি দিচ্ছে হলদে-সাদা পুষ্পমুখ। চিনতে কষ্ট হলো না, ও সুন্দরী তো আমাদেরই চিরপরিচিত শটিফুল। শিবকালী ভট্টাচার্য জ্বর, অর্শ, ক্রিমি, ফোঁড়া, সর্দি ইত্যাদি সারাতে শটির কন্দ ব্যবহৃত হয় বলে লিখেছেন। বলেছেন,  গায়ক-গায়িকাদের অনেক সময় গলা খুশখুশ করে। সেক্ষেত্রে এক টুকরো শটিমূল মুখে রেখে আস্তে আস্তে চিবুলে ও সেই রসটা গিললে কাশি, গলা খুশখুশ করা বন্ধ হয় এবং কফ থাকলে তাও বেরিয়ে যায়। এত যার গুণ সেই শটি হলো জংলাগাছ, বনের ফুল, বাংলার অবহেলিত উদ্ভিদ!

শটির ইংরেজি নাম White turmeric। শটি (Curcuma zedoaria) আদাগোত্রীয় তথা জিঞ্জিবারেসী পরিবারের গাছ, বহুবর্ষজীবী কন্দজ বিরুৎ। মাটির নিচে আদার মতো কন্দ বা মূল হয়। মনে পড়ে, শিশুকালে সেই শটিমূল থেকে ঠাকুমা অ্যারারুটের মতো ‘পালো’ বানিয়ে দিতেন। তখন গ্রামে বেবি ফুড বা টিনের গরুর গুঁড়োদুধ ছিল না। শটিমূল থেকে তৈরি সেই পালোই ছিল পল্লীশিশুদের প্রধান খাদ্য। ছোটবেলার শটিকে নিয়ে অনেক কথাই মনে পড়ে। নড়াইলের গোবরা বাজারে গেলে সুধীর ময়রার দোকান থেকে কাঁচাগোল্লা কিনতাম। তিনি তা শটিপাতায় মুড়ে কলাডোগার ছুটা দিয়ে বেঁধে দিতেন। ভাবছি, সে যুগ কত পরিবেশবান্ধব ছিল!

শটিফুলের এরূপ উদগমনের কারণ কয়েক দিন আগে হয়ে যাওয়া বৃষ্টি। শীতে যেসব শটিগাছ শুকিয়ে গিয়েছিল সেসব গাছ মাটির নিচে গুপ্তধনের মতো রেখে গিয়েছিল তাদের বংশমূল, গুঁড়িকন্দ। মাটির ওপর থেকে কেউ বুঝতেই পারবে না যে মাটির নিচে প্রকৃতির কি গুপ্তধন লুকানো রয়েছে। বৈশাখ মাস এলেই সেসব গুপ্তধন থেকে জন্ম নেয় আগে ফুলের ডাটি, খাঁড়া দ-টি আবৃত থাকে ফুলের কুঁড়ি আর খোসার মতো বৃতিগুলো দিয়ে। শটিগাছের এটাই রীতি প্রথমে ফুল ফোটে, তারপর গজায় পাতা। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে ফুল ফোটে, এরপর ফল হয়। কখনো কখনো ফুলের প্রস্ফুরণের সঙ্গে দেখা মেলে বিজয়পতাকার মতো দুচারটি সবুজ পাতা। পাতাগুলো দেখতে কিছুটা হলুদগাছের পাতার মতো। আবার মাটি ফুঁড়ে পুষ্পমঞ্জরি উঁকি দিতেই কখনো কখনো পাতারাও আবদার করে বলে, ‘ওগো ফুল, আমাকেও সঙ্গে নাও। ভূমিগর্ভে ঘুম তো অনেক হলো, এবার আমরাও আকাশ দেখব। আলোর সঙ্গে মিতালি করব। ওগো ফুল, আমি তোমাদের আহার দেব।’ ফুল হয়তো তখন মুচকি হেসে বলে উঠবে, ‘মা আমার জন্য খাবার সঞ্চয় করে রেখে গেছেন মাটির তলে, শুকিয়ে যাওয়া  শেকড়ে। আমাকে অভুক্ত থাকতে হবে না। সেখান থেকে তুমিও না হয় কিছুটা খেয়ে ডাঙর হয়ে ওঠো। তারপর না হয় মাতৃকন্দের সে ঋণ শোধ কোরো।’

লেখক : কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ