পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি-ভরন (লোডিং) শুরু হয়েছে, এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল বাংলাদেশ। এখন এ কেন্দ্রে ধাপে ধাপে বহু কাক্সিক্ষত বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
মন্ত্রী বলেন, ‘আজ পারমাণবিক জ্বালানি লোডিংয়ের শুরু। রাষ্ট্র যখন দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করে কেবল তখনই এমন অর্জন সম্ভব হয়। এ বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে বড় ভূমিকা পালনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নেও বড় ভূমিকা রাখবে।’ তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী সব নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কার্যক্রম সম্পন্ন করা হচ্ছে। নিরাপত্তাই বাংলাদেশের প্রথম অগ্রাধিকার। এ পারমাণবিক কেন্দ্র ঢাকা ও মস্কোর মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেবে।’
প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, ‘আজকের দিনটি বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে বাংলাদেশ আরও একধাপ এগিয়ে গেল।’
রুশ পরমাণু শক্তি করপোরেশনের (রোসাটম) মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ বলেন, ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বাংলাদেশকে যেভাবে সহযোগিতা করা হয়েছে, ভবিষ্যতেও সেভাবে পাশে থাকবে রাশিয়া। বাংলাদেশের মানুষকে আমরা নিরাপত্তা নিয়ে আশ্বস্ত করতে চাই। এখানে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে এবং সর্বোচ্চ মানদ- বজায় রাখা হয়েছে। নিরাপদ পারমাণবিক কেন্দ্র থেকেই সরবরাহ করা হবে বিদ্যুৎ। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ ভবিষ্যতের প্রয়োজনেও সহযোগিতা থাকবে রোসাটমের।’
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সুযোগ এনে দিয়েছে রূপপুর। এ কেন্দ্র বাংলাদেশের বিজ্ঞান-প্রযুক্তিকে আরও এগিয়ে নেবে।’
অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি।
দুটি ইউনিট মিলে কেন্দ্রটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট, যার প্রথম ইউনিটে জ্বালানি-লোডিং হবে। দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও চলছে পুরোদমে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরোদমে চালু হলে দেশের শিল্প, কৃষি ও নগরজীবনে নতুন গতির সঞ্চার হবে।
আগামী আগস্ট মাসের মাঝামাঝি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিট থেকে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে; কিছু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাঠামোগত প্রয়োজনে ব্যয়িত হবে। একই বছরের জুনে দ্বিতীয় ইউনিটে ফুয়েল লোডিং বা জ্বালানিভরনের কাজ শুরু হবে। অনুরূপ হিসাবেই ওই বছরের সেপ্টেম্বরে রূপপুরের দুটি ইউনিট থেকে মোট ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে কর্মকর্তাদের আশা।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর রি-অ্যাক্টর। এখানেই ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোড করা হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’ বা নিউক্লিয়াস বিভাজন প্রক্রিয়ায় কাজ করবে। পারমাণবিক চুল্লিতে ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস বিভাজনের মাধ্যমে প্রচুর তাপশক্তি উৎপন্ন হয়।
এই তাপশক্তি দিয়ে পানিকে উচ্চচাপে বাষ্পে পরিণত করে টারবাইন ঘোরানো হয়, ফলে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। এটি একটি স্বয়ংক্রিয় ও নিয়ন্ত্রিত চেইন রি-অ্যাকশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চলে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটির স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল ৬০ বছর। এ সময়ে এখান থেকে পাওয়া যাবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। প্রয়োজনীয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ সাপেক্ষে আরও ৩০ বছর পর্যন্ত কেন্দ্রটির আয়ু বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
কেন্দ্রটিতে একবার জ্বালানি লোড করার পর তা দিয়ে চলবে টানা দেড় বছর। অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো তেল, গ্যাস কিংবা কয়লা কেনার ঝক্কি এখানে নেই। দেড় বছর পর পর এক-তৃতীয়াংশ করে জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে।
নির্মাণ চুক্তি অনুযায়ী, তিন বছরের জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়া। অর্থাৎ তিন বছর জ্বালানি আমদানি নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। এরপর বাংলাদেশকে জ্বালানি তথা ইউরেনিয়াম আমদানি করতে হবে। তবে সেই জ্বালানি দুই বছর পর পর পরিবর্তন করলেই চলবে।