এই লেখাটি যখন পাঠকের হাতে পৌঁছাচ্ছে, তখন পৃথিবীর কোথাও না কোথাও সত্যের জন্য লড়াই করছে কেউ না কেউ কোনো সাংবাদিক কিংবা কোনো সংবাদমাধ্যম। সংকটের সময়েই গণমাধ্যমের প্রকৃত শক্তি দৃশ্যমান হয়। কারণ গণমাধ্যম কেবল তথ্য পরিবেশন করে না, এটি সমাজের বিবেক, সময়ের আয়না এবং ভবিষ্যতের পথনির্দেশক। আমরা খালি চোখে প্রকাশ্য যুদ্ধ দেখি, সংঘাত দেখি কিন্তু এর বাইরেও অনেক যুদ্ধ আছে। কোনো শহরের গলিতে, কোনো গ্রামের নির্জন মাঠে, কোনো রাষ্ট্রের সীমান্তে, সমাজে, পরিবারে যখন অদৃশ্য যুদ্ধগুলো চলতে থাকে, যখন সব কিছু ভেঙে পড়ে, একে একে সত্যের মৃত্যু ঘটে সেখানে সেই শূন্যতার ভেতরেও দাঁড়িয়ে থাকতে হয় গণমাধ্যমকে, একটি অবিচল আলোর রেখা হয়ে।
গণমাধ্যম কখনো কেবল খবরের বাহক নয়; এটি সময়ের বিবেক, ইতিহাসের গোপন নথি, মানুষের অদেখা কান্নার অনুবাদক। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে, এশিয়ায়, কিংবা আমাদের এই ভূখণ্ডেও সত্যকে প্রতিদিন নতুন করে লড়াই করতে হয় গুজবের বিরুদ্ধে, উগ্রতার বিরুদ্ধে কখনো কখনো সংগঠিত অন্ধতার বিরুদ্ধে। আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন জনতার নামে মব তৈরি হয়, মতের নামে বিভাজন তৈরি হয়, আর বিশ্বাসের নামে উগ্রতা ছড়িয়ে পড়ে।
এই সময়েই প্রশ্নটি সবচেয়ে জরুরি হয়ে ওঠে গণমাধ্যম কার পক্ষে দাঁড়াবে?
আমাদের উত্তর স্পষ্ট। আমরা দাঁড়াব মানুষের পক্ষে। আমরা দাঁড়াব সেই বাংলাদেশ বিনির্মাণের পক্ষে, যা গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক এবং মানবিক। আমরা দাঁড়াব যুক্তির পক্ষে, সংলাপের পক্ষে, সহনশীলতার পক্ষে। কারণ আমরা জানি মবের উল্লাস কখনো সভ্যতার ভাষা নয়; উগ্রতার আগুন কখনোই জাতির ভবিষ্যৎ আলোকিত করতে পারে না।
আমাদের এই অবস্থান কোনো তাৎক্ষণিক উচ্চারণ নয়; এটি ইতিহাস থেকে শেখা এক দায়। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানেই কেবল প্রতিবাদ নয়, সেটি একটি নৈতিক কর্তব্য। যদি আরও পেছনে যাই, একই কথা বলে বাহান্নর ভাষা আন্দোলনও। ২০২৪-এ ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান আমাদের সেই সাহসকে, সেই শক্তিকে আরও দুর্বিনীত করেছে। এদেশের তরুণ সমাজ নতুন বাংলাদেশ গড়ার দায় চাপিয়ে দিয়েছে আমাদের ওপর। সেই চেতনা থেকেই আমরা দেখতে চাই এমন একটি বাংলাদেশ যেখানে ভয়ের বদলে থাকবে সাহস, বিভেদের বদলে থাকবে সংহতি, আর নীরবতার বদলে উচ্চারিত হবে সত্য। ২০২৬-এর ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে যে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা শুরু হয়েছে সেখানেও আমরা খুঁজতে চাই জাতির প্রত্যাশাকে। আমরা আশা রাখতে চাই, নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারও জাতির প্রত্যাশা পূরণে সর্বাত্মক শক্তি নিয়োগ করবে।
গণমাধ্যমের দীর্ঘ এবং কঠিন পথে এক দৃঢ় যাত্রা দেশ রূপান্তর। ২০১৮ সালের ২০ ডিসেম্বর, প্রয়াত সাংবাদিক অমিত হাবিবের সম্পাদনায় যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা কেবল একটি পত্রিকার জন্ম ছিল না; এটি ছিল একটি প্রতিশ্রুতির সূচনা। সেই প্রতিশ্রুতি দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার। আমাদের মাস্টহেডের ওপরে লেখা ‘দায়িত্বশীলদের দৈনিক’ কোনো স্লোগান নয়, এটি আমাদের প্রতিদিনের অঙ্গীকার। যা আমরা বয়ে চলেছি আগামীর পথে।
সাত বছর পেরিয়ে দেশ রূপান্তর অষ্টম বর্ষে পদার্পণ করেছে। একটু দেরিতে হলেও আজ ২৯ এপ্রিল বুধবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে আমাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনন্দ আয়োজন। এই সাত বছরে সময় আমাদের সহজ পথ দেয়নি। শুরুতেই এগুতে হয়েছে করোনা নামের অতিমারিকে মোকাবিলা করে। আর বর্তমান বাস্তবতায় সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ বেড়েছে, তথ্যের ওপর আস্থা কমেছে, বিভ্রান্তির কোলাহলও বেড়েছে বহুগুণ। কিন্তু এই প্রতিকূলতার মধ্যেই দেশ রূপান্তর তার পথ খুঁজেছে বস্তুনিষ্ঠতার ভেতর দিয়ে, দায়বদ্ধতার ভেতর দিয়ে, এবং পাঠকের প্রতি এক গভীর আস্থার ভেতর দিয়ে।
এই পথচলা একার নয়। এটি সম্ভব হয়েছে পাঠকের ভালোবাসা, সহযাত্রীদের সমর্থন এবং শুভানুধ্যায়ীদের আস্থার কারণে। আমরা জানি একটি পত্রিকার প্রকৃত শক্তি তার মুদ্রণযন্ত্রে নয়, তার পাঠকের বিশ্বাসে। এই বিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করার পেছনে রয়েছে রূপায়ণ গ্রুপের সাহসী সিদ্ধান্ত। একটি সংবাদপত্রকে তারা দেখেছেন ব্যবসার চোখে নয়, দায়ের চোখে। গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খাঁন মুকুল এবং কো-চেয়ারম্যান ও দেশ রূপান্তরের প্রকাশক মাহির আলী খাঁন রাতুল বিশ্বাস করেন একটি জাতিকে এগিয়ে নিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিহার্য। গণতন্ত্রের ভিত মজবুত করতে হলে সংবাদপত্রকে শক্তিশালী হতে হবে, স্বাধীন হতে হবে, দায়িত্বশীল হতে হবে। সেই বিশ্বাস থেকেই অলাভজনক জেনেও এই উদ্যোগে তারা বিনিয়োগ করেছেন।
এই বিনিয়োগ কেবল অর্থের নয়; এটি একটি দর্শনের বিনিয়োগ। যেখানে সংবাদমাধ্যমকে দেখা হয় সমাজের পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে, মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে। দেশ রূপান্তরের পাশাপাশি টেলিভিশন, রেডিও এবং আসন্ন ইংরেজি দৈনিক সব মিলিয়ে একটি বহুমাত্রিক গণমাধ্যম গড়ে তোলার যে উদ্যোগ রূপায়ণ গ্রুপের, তা ভবিষ্যতের বাংলাদেশের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
আমরা জানি, ভবিষ্যৎ কেবল প্রযুক্তির নয়, এটি দৃষ্টিভঙ্গিরও। নতুন সময় আমাদের সামনে নতুন প্রশ্ন রাখে আমরা কি কেবল ঘটনার বিবরণ দেব, নাকি ঘটনার ভেতরের সত্য খুঁজে বের করব? আমরা কি কেবল শিরোনাম তৈরি করব, নাকি মানুষের জীবনের গভীরে পৌঁছাব?
দেশ রূপান্তর দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিয়েছে। আমরা কথা বলতে চাই সেই মানুষদের হয়ে, যাদের কণ্ঠস্বর অনেক সময় শোনা যায় না। আমরা লিখতে চাই সেই গল্পগুলো, যা শিরোনামে আসে না কিন্তু সমাজের গভীরে রক্তক্ষরণ ঘটায়। আমরা তুলে ধরতে চাই সংগ্রামী মানুষের জীবন, নিপীড়িত মানুষের আর্তি, এবং নীরব মানুষের অদেখা সাহস। কারণ আমরা বিশ্বাস করি সংবাদ কেবল তথ্য নয়, এটি একটি নৈতিক অবস্থানও।
আজকের বিশ্বে তথ্যের অভাব নেই; অভাব রয়েছে বিশ্বাসযোগ্যতার। প্রতিদিন অসংখ্য তথ্য আমাদের সামনে ভেসে আসে, কিন্তু তার ভেতর সত্যকে খুঁজে পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে একটি গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব বিশ্বাসযোগ্য থাকা। এবং সবচেয়ে বড় শক্তিও এটাই।
দেশ রূপান্তর সেই বিশ্বাসযোগ্যতার পথেই হাঁটতে চায়। আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি সব সময় আমাদের সংবাদ হবে বস্তুনিষ্ঠ, আমাদের বিশ্লেষণ হবে দায়িত্বশীল এবং আমাদের অবস্থান হবে মানুষের পক্ষে। আমরা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলব, কিন্তু সময়ের কাছে আত্মসমর্পণ করব না। এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজনের মূল প্রতিপাদ্য ‘হৃদয়ে বাংলার মুখ’। আমরা আমাদের বিশেষ আয়োজনে প্রিয় বাংলাদেশের মুখচ্ছবিটাই তুলে ধরতে চেয়েছি। বিশিষ্টজনের লেখায় উপস্থাপন করতে চেয়েছি মাতৃভূমির বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ পথরেখা। এ নিয়ে পরবর্তী আয়োজনগুলোতেও থাকবে আরও লেখা।
প্রিন্টের কাগজে ছাপা শব্দের পাশাপাশি আমরা পৌঁছে যেতে চাই ডিজিটাল পরিসরে দ্রুত, নির্ভুল এবং আরও প্রভাবশালী উপস্থিতি নিয়ে। কারণ আমরা জানি, আজকের পাঠক কেবল পাঠক নয়; তারা অংশগ্রহণকারী, তারা প্রশ্নকারী, তারা সমালোচকও। এই সমালোচনাই আমাদের শক্তি।
প্রিয় পাঠক-শুভানুধ্যায়ী, আমরা চাই আপনারা আমাদের ভুল ধরিয়ে দিন, আমাদের সীমাবদ্ধতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখান। কারণ একটি দায়িত্বশীল গণমাধ্যম কখনোই নিজেকে সম্পূর্ণ মনে করে না; সে প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলে। এটা আমাদের প্রতিদিনের পরীক্ষা।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজনের এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমরা পেছনে তাকাই কিন্তু থেমে থাকার জন্য নয়, সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি সঞ্চয়ের জন্য। সামনে যে পথ, তা সহজ নয় সেখানে আরও চ্যালেঞ্জ আছে, আরও চাপ আছে, আরও বিভ্রান্তি আছে। কিন্তু সেই পথেই আছে সম্ভাবনা, আছে আলোর দিগন্ত। অন্ধকার কখনো স্থায়ী হয় না কেউ না কেউ আলো জ্বালাতে আসেই। দেশ রূপান্তর সেই আলো জ্বালিয়ে রাখার একটি আন্তরিক চেষ্টা। এই চেষ্টা টিকে থাকবে যতদিন সত্য উচ্চারিত হবে, যতদিন মানুষ প্রশ্ন করবে, যতদিন এই দেশের মাটি গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক চেতনায় জেগে থাকবে। দায়িত্বশীলতার অঙ্গীকারে, সত্যের প্রতি নিষ্ঠায় আমরা এগিয়ে যাব, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সব মানুষকে সঙ্গে নিয়েই।
মুস্তাফিজ শফি : সম্পাদক, দেশ রূপান্তর; বহুমাত্রিক লেখক।