দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলোয় হাজার মানুষের আত্মত্যাগ ও নাগরিকদের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে পাওয়া বর্তমান জাতীয় সংসদ দেশে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রচর্চার প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। শুধু আইন প্রণয়ন নয়, কেবল নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুমোদন নয়, সংসদ সদস্যরা (এমপি) নাগরিক স্বার্থের নানা বিষয়ে প্রশ্ন করছেন, দাবি তুলছেন। সরকারের মন্ত্রীরা জবাবদিহি করছেন সেখানে। এতে সংসদ ফিরে পেয়েছে তার প্রত্যাশিত ছন্দ।
প্রধান রাজনৈতিক দল, সংসদ পরিচালনায় জড়িত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও বিশ্লেষকদের আশা সংসদীয় গণতন্ত্র পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা করতে সরকারি ও বিরোধী দল সবাই মিলে চেষ্টা করবে। সে ক্ষেত্রে তারা সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের ভূমিকার প্রশংসাও করেছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের সরব উপস্থিতিতে সংসদ প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে। এখন পর্যন্ত সংসদ নিয়ে গণমানুষের যে প্রত্যাশা, তা পূরণ হতে চলেছে এটা বলা যায়। সংসদ এখন কেবল সরকারি সিদ্ধান্ত অনুমোদনের জায়গা নয়, বরং প্রকৃত অর্থেই জবাবদিহিতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
বিরোধীদলীয় এমপিদের জোরালো কণ্ঠস্বর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংসদ আবার কার্যকর হতে শুরু করার প্রমাণ, এমন পর্যবেক্ষণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘সংসদীয় কার্যক্রমের এই পরিবর্তনশীল ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তবে তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক মাইলফলক হয়ে থাকবে।’
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় ১২ মার্চ। আগামীকাল বৃহস্পতিবার এ অধিবেশন শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন ছাড়াও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, জ্বালানি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দল নির্বিশেষে এমপিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। এতে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের সুবাতাস নতুন করে বইছে এমনটি মনে করছেন প্রায় সবাই।
সরকারি দল বিএনপির মহাসচিব, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বিএনপি সংসদ কার্যকর করতে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে। সংসদীয় কার্যক্রমে বিরোধী দলের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার ইতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলোচনা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতামূলক মনোভাব দেখা যাচ্ছে।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ মনে করেন, অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বর্তমান সংসদ কার্যকর ও প্রাণবন্ত। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো মতভিন্নতা। এটি ধরে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি।’ স্পিকার আশা প্রকাশ করেন, সরকার ও বিরোধী দল এ বিষয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।
চলমান জ্বালানি সংকট নিরসনে আলোচনার জন্য বিরোধী দলের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশেষ কমিটি গঠনের কথা বলেন। শেষ পর্যন্ত উভয় দিক থেকে পাঁচজন করে নিয়ে মোট ১০ সদস্যের কমিটি গঠিত হয়েছে।
২০২৫ সালে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর সক্রিয় প্রধান রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়েও সংসদে বেশ আলোচনা হয়েছে। সরকার সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এগোতে চাইলেও বিরোধী দল একে রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানিয়ে আসছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, বর্তমান সংসদে ৩০০ সদস্যের মধ্যে প্রায় ২২০ জন প্রথমবার নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। তাদের অনেকেই নানা ইস্যুতে কথা বলছেন। দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও সংস্কারের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে মন্ত্রীরা এমপিদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। আইন প্রণয়নে গতিশীলতা এসেছে। গুরুত্বপূর্ণ বিল পাসের ক্ষেত্রে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলের সদস্যদের জোরালো মতামত ও সংশোধন প্রস্তাব গ্রহণ করা হচ্ছে। এতে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।
সংসদের চিফ হুইপ নূর ইসলাম মনি বলেন, বর্তমান সংসদের একটি বড় অংশই নতুন সদস্য। তারা সংসদীয় নিয়ম, রীতি, আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া এবং কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হচ্ছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে কিছুটা অস্থিরতা থাকলেও তা স্বাভাবিক। তিনি আশা প্রকাশ করেন, অভিজ্ঞতা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন এমপিরা আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।
সরকারি প্লট গ্রহণ না করা এবং করমুক্ত গাড়ি সুবিধা না নেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব সিদ্ধান্ত সংসদের অভ্যন্তরে স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।
জামায়তে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার মনে করেন, সংসদীয় গণতন্ত্রের মান বজায় রাখতে তার দলের এমপিরা চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্র পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা করতে হলে সরকারি দল ও বিরোধী দলসবাই মিলে চেষ্টা করতে হবে।
জামায়াতের পাবনা-১ আসন থেকে নির্বাচিত এমপি ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন অবশ্য মনে করেন, বর্তমান সংসদ নিয়ে এখনো মন্তব্য করার মতো পরিস্থিতি হয়নি। সংসদে গঠনমূলক সমালোচনা চালিয়ে যাবেন এবং মানুষের কথা বলবেন এমনটি জানিয়ে তিনি বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্র পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা করতে হলে সরকারকে আরও আন্তরিক হতে হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, আগের সংসদ ছিল একপাক্ষিক; এর কোনো জনসমর্থন ছিল না। সেদিক থেকে এই সংসদ অবশ্যই নির্বাচনী গণতন্ত্রের পথে একধাপ অগ্রগতি। এটি অংশগ্রহণমূলক। সংসদে অনেক গঠনমূলক আলোচনা হচ্ছে।
তিনি বলেন, জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে দেশের কল্যাণ হবে; আর সরকার একচেটিয়া ক্ষমতা চর্চা অব্যাহত রাখলে সংসদীয় স্বৈরতন্ত্রের পথ প্রশস্ত হতে পারে। বল এখন সরকারের কোর্টে।