একরাতেই সবুজ শ্যামল জনপদ পরিণত হয়েছিল বিধ্বস্ত বিরানভূমিতে। চোখের সামনে ভাসছিল শুধু লাশ আর লাশ। সামনে এগুতে চাইলে পা মাড়াতে হয়েছে লাশের উপর দিয়েই। আগের দিন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িঘরগুলো বিলীন হয়ে যায় জলোচ্ছাসের স্রোতে। শেকড়সহ উপড়ে গিয়ে মুখ থুবড়ে মিশে যায় মাটির সাথে।
এভাবেই চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ বিস্তীর্ণ উপকূলীয় জনপদকে লন্ডভন্ড করে দেয় ১৯৯১ সালে ২৯ এপ্রিল রাতের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাস। ৩৬ বছর আগের এই দিনটি এলেই কান্নার রোল পড়ে উপকূলবাসীর ঘরে। স্বজন হারানোর স্মৃতি এখনো তাড়িয়ে বেড়ায় তাদের।
ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত ‘ম্যারি এ্যান’ নামের সেই ঘূর্ণিঝড়ে ২২০ কিলোমিটার বেগে বয়ে যাওয়া আর ২৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছাস কেড়ে নিয়েছিল প্রায় দুই লাখ আদম সন্তান।
যদিও সরকারি হিসাবে ওই ঘূর্ণিঝড়ে মৃতের সংখ্যা দেখানো হয় ১ লাখ ৩৮ হাজার। তাদের মধ্যে বেশির ভাগেরই লাশের সন্ধান পাননি স্বজনরা। স্রোতের টাানে হয়ত এসব লাশের সমাধি হয়েছে সাগরের লোনা পানিতে। প্রলয়ংকরী সেই জলোচ্ছাসে বিধ্বস্থ হয়েছিল বঙ্গোপসাগর তীরের প্রায় দেড়শ’ কিলোমিটার উপকূলীয় ভেড়িবাঁধ। ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডবে অচল হয়ে পড়েছিল চট্টগ্রাম বিমান বন্দর।
বড় ধরণের ক্ষতির মুখে পড়েছিল চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরসহ বিভিন্ন ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠান। বন্দরের অত্যাধুনিক ক্রেন ‘শক্তিমান’ এর আঘাতে দ্বিখন্ডিত হয়ে গিয়েছিল কর্ণফুলি নদীর উপর নির্মিত শাহ আমানত সেতু।
সেই মহাপ্রলয়ের রাতে বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর ইউনিয়ন থেকেই মারা যায় অন্তত ১০ হাজার মানুষ। এমন অনেক পরিবার রয়েছে যে পরিবারের কোন সদস্যেরই খোঁজ মিলেনি।
২৭ বছর আগের সেই ভয়াল মূহূর্তের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রায়পুর ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান আবু সৈয়দ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের সেই রাতটি আমাদের উপকূলবাসীর কাছে আজো একটি ভয়াল ‘দুঃস্বপ্ন’ হয়ে আছে। মনে হয়েছিল যেন সাগর থেকে সব পানি উঠে এসে আমাদের ইউনিয়নটিকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। রাত শেষে সকাল হতেই চারদিকে যে দৃশ্য দেখা গেছে তা কোনভাবেই আগের দিনের সঙ্গে মেলানো যাচ্ছিল না। মনে হলো যেন অজানা, অচেনা যুদ্ধ বিধ্বস্থ কোন এলাকা। চারিদিকে গৃহহীন, সহায় সম্বল আর স্বজনহারা মানুষের আহাজারি। রাস্তার পাশে, বিলে-খালে শুধু আদম সন্তানের লাশ। গাছপালাগুলোতে কোন পাতার লেশমাত্র নেই। এক কথায় সেই রাতের ছোবলে আমাদের পুরো এলাকা পরিণত হয়েছিল এক মৃতপুরীতে।
সেই ঘূর্ণিঝড়ের রাতে জলোচ্ছাসের স্রোতে ভাসতে ভাসতে বেঁচে যাওয়া একজন ফাতেমা বেগম। বঙ্গোপসাগর থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে পশ্চিম রায়পুর গ্রামে তার বাড়ি। এ প্রতিবেদকের কাছে সেদিনকার স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, সেই রাতে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টির সাথে হঠাৎ সাগর থেকে উঠে এসেছিল জলোচ্ছাসের স্রোত। রাত তখন ১২টা। আমাদের কোথাও যাবার উপায় ছিলনা। আমাদের বাড়ির নারী-পুরুষ আর শিশু মিলে ১০ জন গিয়ে উঠেছিলাম একটি বড় খড়ের গাদায়। কিন্তু পানির স্রোত সেখান থেকে আমাদের একেকজনকে একেক দিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। স্রোতের টানে একটি ঘরের চালায় ভাসতে ভাসতে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে ঝোপঝাড়ের সাথে চালাটি আটকা পড়ে। সেখানেই রাতভর ভাসতে ভাসতে সকাল হয়ে যায়। এরপর পানি কমে গেলে রাস্তা খুঁজে খুঁজে বাড়িতে পৌঁছি। কিন্তু তখন বাড়িতে আগের রাতের রেখে যাওয়া ঘরের কোন চিহ্নই আর ছিলনা। তিনি বলেন, ওই রাতেই আমাদের বাড়ি থেকে মারা যায় ১৬ জন মানুষ। যাদের কারো লাশও পাওয়া যায়নি।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তখন বড় বড় শিরোনামে স্থান পেয়েছিল বাংলাদেশের ভয়াবহ এই দুর্যোগের খবর। মার্কিন সেনাবাহিনীর তৎকালীন মেজর জেনারেল হেনরি স্ট্যাকপোলের নেতৃত্বে ২৮টি হেলিকপ্টার ও উভচর যান নিয়ে বাংলাদেশে ছুটে এসেছিল ‘অপারেশন সী এঞ্জেল’।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা, বাঁশখালী, সন্দ্বীপ, কক্সবাজারের কুতুবদিয়া, মহেশখালি, চকরিয়াসহ উপকূলের প্রত্যন্ত দুর্গত জনপদে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল বেশ কিছু দেশি-বিদেশি সেচ্ছাসেবী সংস্থা। বাসস্থান নির্মাণ, ত্রানসামগ্রীসহ বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা দিয়ে মৃতপ্রায় এলাকাগুলোতে নতুন করে প্রাণ সঞ্চারের চেষ্টা করেছিল তারা। সেই প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর সর্বত্র দাবি উঠে উপকূলবাসীর জানমাল রক্ষায় স্থায়ী টেকসই বেড়িবাঁধের। সেই দাবির প্রেক্ষিতে স্থায়ী বেড়িবাঁধ র্নিমাণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নামে প্রকল্প নেয় সরকার।
কাগজে কলমে সেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও বিপদমুক্ত হয়নি উপকূলীয় এলাকার লোকজন। চট্টগ্রামের আনোয়ারা, বাঁশখালীসহ উপকূলীয় এলাকার লোকজনের মতে, বেড়িবাঁধ রক্ষা প্রকল্পের নামে বিভিন্ন সময় সরকারি অর্থের হরিলুট হয়েছে এখনো হচ্ছে। যে কারণে ঘূর্ণিঝড়ের ৩৬ বছর পরও এখনো অররিক্ষত উপকূলবাসী।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, বর্তমানে আনোয়ারা ও বাঁশখালী উপকূলে ৮৭৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকার স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। ‘বঙ্গোপসাগর ও সাঙ্গুর তীর প্রতিরক্ষা-বেড়িবাঁধ’ নামে এই প্রকল্পের কাজ আগামী বছর জুনের মধ্যে শেষ হবার কথা রয়েছে।
তবে, স্থানীয় লোকজনের মতে, ২০২৪ সালে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও এখনো বাঁশখালী উপজেলার খানখানাবাদ, আনোয়ারা উপজেলার গহিরাসহ কয়েকটি স্থানে উপকূলীয় বেড়িবাঁধের বিভিন্ন অংশ অরক্ষিত রয়েছে। এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে সামনের বর্ষা মৌসুমে এসব এলাকা আবারো সাগরের লোনা জলে প্লাবিত হয়ে পড়ার শংকা রয়েছে।
প্রতি বছর ২৯ এপ্রিল এলেই বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে উপকূলবাসীর হৃদয়। স্বজনহারাদের ঘরে ঘরে কান্নার রোল পড়ে। আলোচনা সভা, স্মৃতিচারণ, মিলাদ মাহফিল, ঘূর্ণিঝড়ের ছবি প্রদর্শনীসহ নানা কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে দিনটিকে স্মরণ করে বিভিন্ন সংগঠন।