অজ্ঞানের পুনরাবর্তন

আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যখন রক্ত দিয়েই চিন্তা করতে বাধ্য হচ্ছি। চারদিকে এত অন্যায়-অবিচার, এত মূঢ়তা এবং কাপুরুষতা ওঁৎ পেতে আছে যে, এ ধরনের পরিবেশে নিতান্ত সহজে বোঝা যায় এমন সহজ কথাও চেঁচিয়ে না বললে কেউ কানে তোলে না। —আহমদ ছফা (১৯৭২)

পরলোকগত পুরুষ-পুরুষানুক্রমের নামযশ জীবিতজনের মগজে দুঃস্বপ্নের নাহান চাপিয়া থাকে। —কার্ল মার্কস (১৮৫২)

২০২৪ সালের মধ্যভাগ নাগাদ পরাধীনতা-পার বাংলাদেশে যাহা যাহা ঘটিয়াছে তাহা অনেকের চোখেই ‘ঐতিহাসিক’ ঘটনা। এই বছরের ঘটনাধারা নতুন নিয়মের প্রতিষ্ঠা দিতে না পারিলেও পুরাতনের ফাটলটা ভালোমতোই দেখাইয়া দিয়াছে। ব্যাপ্তি, তীব্রতা এবং তাৎপর্যের বিচারে পঞ্চান্ন বছর আগেকার অসমাপ্ত স্বাধীনতার যুদ্ধ ছাড়া ইহার সহিত তুলনা দিবার মতন বিশেষ ঘটনা আর নাই।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপিত হইয়াছিল ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার’—এই তিন প্রতিজ্ঞা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারে। অথচ আমাদের প্রজাতন্ত্র পঞ্চান্ন বছর পর্যন্ত তিনের কোনোটাই পূরণ করিতে পারে নাই। এমন দিনও ছিল যখন সেই অঙ্গীকার-কাহিনি স্মরণ করিলে রাজরোষে পড়িতে হইত।

* * *

দেশ স্বাধীন হইবার পর বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীগণ প্রায় প্রতিদিন বলিতেন, পাকিস্তান এক টুকরা অসম্ভব রাষ্ট্র আর ইহার ভাঙন ছিল অনিবার্য। দুর্ভাগ্যের মধ্যে, তাহারা শুদ্ধ দুই কি তিনটি প্রশ্নের জবাব দিতে অপারগ ছিলেন। মাত্র দুই পুরুষ আগে এই জনগোষ্ঠীর প্রায় সকলেই কেন ‘অসম্ভব’ পাকিস্তান সম্ভব করার জন্য প্রাণপাত করিতে কসুর করেন নাই? এই প্রশ্নের উত্তর দূরে থাক, দক্ষিণও তাঁহারা ঠাহর করিতে পারেন নাই। অধিক কি, এই অসম্ভব ঘটনার অনিবার্য অবসান ঘটাইতে কেন পুরুষান্তরে—দুই দশকের অধিক সময়—অপেক্ষার দরকার পড়িল? দ্বিতীয় প্রশ্নের কোনো জবাবও তাঁহাদের কুক্ষিতে ছিল না।

আরো জানিতে আবশ্যক হয়, রক্ত দিয়া স্বাধীনতা লাভ করিবার সেই প্রাণপণ যুদ্ধের দিনে কেন বিদেশি একটি রাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়া বাংলাদেশের একদিনও চলিল না? পরিশেষে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের ক্ষণ যে ছবিতে দুনিয়া হইল তাহাতে বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়াইল? এহেন পরনির্ভরশীলতার পরিণতি আর যাহাই হৌক গণতন্ত্র হইতে পারে কি?

এখানেই সত্যের কিছু ইশারা দেখা যাইতেছিল : ১৯৭১ সালের রক্তস্রোত ‘এককেন্দ্রিক, সার্বভৌম ও স্বাধীন’ একটি দেশের জন্ম দিল ঠিকই, কিন্তু সমাজ-বিপ্লবের ঢাকটা এক শব্দও পিটাইতে পারিল না। সম্ভবত এই কারণেই অধ্যাপক তালুকদার মনিরুজ্জামান কিংবা সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলৎস প্রভৃতি বুদ্ধিমান ছাড়া আর কেহ ১৯৭১ সালের মহাযুদ্ধকে ‘বিপ্লব’ বলিয়া বিড়ম্বনার শিকার হন নাই। কেহ কেহ বা ইহাকে বড়জোর ‘বেহাত বিপ্লব’ বলিয়া সান্ত¡না লাভের কোশেশ করিয়াছিলেন।

প্রশ্ন হইতেছে, বাংলা মুলুকের ইতিবৃত্তে ১৯৭১ সালও কেন বিপ্লবের বছর বলিয়া গণ্য হইল না? সকলেই জানেন, ১৯৭১ সালে যে ভূখন্ড ‘এককেন্দ্রিক, সার্বভৌম ও স্বাধীন’ প্রজাতন্ত্র ‘বাংলা দেশ’ নামে উঠিয়া দাঁড়াইয়াছে সে ভূখন্ডের সীমা-সরহদ সাব্যস্ত হইয়াছিল ১৯৪৭ সালের মাঝামাঝি, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাজের পলাতকা ছায়ায়।

সকলে মানিবেন কিনা কে জানে, অনেকে নিশ্চয় জানিবেন, যে ধরনের সমাজ কাঠামোর দৌলতে ১৯৪৭ সালের বাংলাদেশ অতি উৎসাহের সহিত ‘পাকিস্তান’ নামটা অঙ্গীকার করিয়াছিল সেই কাঠামোর অপূর্ব পরিবর্তন ১৯৭১ সালেও ঘটিল না। ভারত ও পাকিস্তানের মতন স্বাধীন বাংলাদেশও ব্রিটিশ শাসনের উত্তরাধিকারস্বরূপ পাওয়া কমনওয়েলথ সাম্রাজ্যের প্রজা পরিচয়টা পরিবর্তনের প্রয়োজন অনুভব করিল না। পরিবর্তনের মধ্যে সে শুদ্ধ মার্কিন সাম্রাজ্যের অধীনতা নতুন করিয়া বরণ করিয়াছে। কলোনি হইয়াছে নিয়োকলোনি হালফিল জবানে পোস্টকলোনি।

* * *

এদিকে ২০২৪ সাল এখনো আমাদের স্মৃতিতে অম্লান। দেদীপ্যমান তাহার দিন প্রভাতের আলো। আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীরাও সত্য সত্যই বুদ্ধিমান। এই বছরের ঘটনাবলিকে তাঁহারা কদাচ বিপ্লবের অভিধানে বসিবার জায়গা দিয়াছেন। ঘটনাস্থলে কেহ বা বিপ্লব, কেহ বা ‘ইনকিলাব’ ধ্বনির প্রশ্রয় দিয়াছিলেন এ কথা অসত্য নহে। তবে সাধারণ্যে প্রবর্তিত বা রাষ্ট্রায়ত্ত ইতিহাস এই ব্যবহার অনুমোদন করে নাই। অগত্যা প্রমাণিত হইয়াছে, বিপ্লবের ফুল বাতাসেই ভালো ফোটে।

তথাপি স্বীকার করিতে হইবে, ২০২৪ সাল শতভাগ বিফলে যায় নাই। গণজাগরণের গুণে শেষমেশ কিছু একটা ধরা পড়িয়াছে। ১৯৭১ সম্পর্কে এতদিন যাবৎ যে বয়ান প্রচার করা হইতেছিল তাহা ছিল একান্ত একরৈখিক অর্থাৎ অর্ধসত্য। এক্ষণে আমরা বুঝিতে পারিতেছি, যে আকাক্সক্ষার কোপে ১৯৪৭ সালের আগে আগে পূর্ববঙ্গের জনসাধারণ অসম্ভব পাকিস্তান সম্ভব করিয়াছিল সেই এক ও অভিন্ন আকাক্সক্ষাই তাহাদের ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন করিবার যুদ্ধে প্রাণদানে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল। শুদ্ধ পাকিস্তানি আলেমরা নহেন, বাংলাদেশি বুদ্ধিজীবীরাও এই সত্য বহুদিন আমল করিতে পারেন নাই।

বাংলাদেশের ঐক্যবদ্ধ ভোটদাতাগণ ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে সর্বময় ক্ষমতা সঁপিয়া দিয়াছিল। ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে অভিন্ন ঘটনাই ঘটিয়াছিল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর হাতে সর্বময় ক্ষমতা ন্যস্ত হইয়াছিল মুসলমান জনসাধারণের সম্মতিতে।

যাঁহারা একদিন ব্রিটিশ শাসনের উত্তরাধিকার স্বরূপে পাকিস্তানের রাজক্ষমতা হাতে পাইয়াছিলেন তাঁহারা কিছুতেই সে ক্ষমতা হাতছাড়া করিতে রাজি ছিলেন না। তাঁহারা বারবার বহাইয়া দিতেছিলেন রক্তস্রোত। একবার রক্তধারা বহিয়া গেলে রাজকাহিনি আর রাজকাহিনি মাত্র থাকে না, সে কাহিনি নীতিশাস্ত্রের আওতায় চলিয়া আসে। এই নীতির বিধান লঙ্ঘন করাকেই হয়তো বলা হয় ইতিহাসের ট্র্যাজেডি। বাংলাদেশের পাকিস্তান যুগ তেমনই এক ট্র্যাজেডি বৈ নয়।

সর্বময় ক্ষমতা সর্বদা বিপজ্জনক। পাকিস্তানের পরিণতি তাহাই আরেকবার প্রমাণ করিল। পুরানা পাকিস্তানের ভাঙন প্রমাণ করিল, বন্দুক-কামানের জোরে দেশ দখল করা যায়, মানুষ শাসন করা যায় না।

বাংলাদেশের ঘটনাবলি মন চায় বা না চায় আরও ত্বরায় ঘটিয়াছে। স্বাধীনতার যুদ্ধে অন্য দেশের সাহায্য লইলে যে ধরনের পরিণতি ঘটিবার কথা স্বাধীনতা লাভের প্রথম বছরেই তাহার সূচনা হইয়াছে। চারিটি বছর পার না হইতে আরও বড় বড় যেসব ঘটনা ঘটিয়াছিল তাহা কাহাকেও বিস্মিত করে নাই। জনযুদ্ধের মধ্যস্থতায় যে দেশ স্বাধীনতা অর্জন করিয়াছে সে দেশ কোনো এক নেতার অঙ্গুলিহেলনে চলিবে না এই প্রতিজ্ঞাই ঘটনার এহেন দ্রুততা নিশ্চিত করিয়াছিল।

পরের পঞ্চাশ বছরেও বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে দেওয়া ওয়াদা পূরণ করিতে পারে নাই। যে উন্নতির দোহাই সে দিয়াছিল তাহা বৈষম্যের উত্তাপে কর্পূরের মতন উবিয়া গিয়াছে। গণতন্ত্রের নামাবলি গায়ে ঝুলাইয়া সে ফ্যাসিতন্ত্র কায়েম করিয়াছিল। বড় বড় স্বাধীনতার বুলি আওড়াইয়া সে জাতির হাতে ও পায়ে নতুন নতুন পরাধীনতার শিকল পরাইতেছিল।

যে মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা বলিয়া স্বীকার করার দাবিতে সে তাহার একদা সাধের পাকিস্তান ভাঙিয়া দিয়াছিল সেই ভাষাকে আজ সে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে’র আবডালে বিসর্জন দিতেছে। সংবিধানে লেখা হইয়াছে ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’, কিন্তু উচ্চ ও মধ্যশ্রেণির প্রবিধানে বাংলা হইয়াছে ‘রিকশাওয়ালার ভাষা’। ১৯৪৭ সালে যে ট্র্যাজেডির জন্ম ১৯৭১ সালের পর ক্রমেই তাহা প্রহসনে পরিণতি মানিয়াছে। বাংলা বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করে নাই।

এই পটভূমিতেই ২০২৪ সালের রক্তস্রোত ও গণ অভ্যুত্থান উত্তেষ্ঠিত ও জাগ্রত হইয়াছিল। এক্ষণে ১৮৪৭ কি ১৯৫২ সালের মতো করুণ পরিণতি এড়াইতে হইলে এই গণ অভ্যুত্থানের কর্তব্য কি দাঁড়াইবে? নতুন নতুন গণ অভ্যুত্থান?

১৯৪৭ সালে যে আকাক্সক্ষা লইয়া পূর্ব বাংলার জনসাধারণ পাকিস্তান কায়েম করিয়াছিল তাহার সহিত পাঞ্জাব ও সেই পূর্ব বাংলারই একটি সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণি পুরাতন মধ্যশ্রেণি বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছিল। হয়তো সে কারণেই সেদিনের পূর্ব বাংলা আজিকার বাংলাদেশ বনিয়াছে।

১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীনতার বেশিদিন না যাইতেই স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহায্যকারী একটি বিদেশের যোগসাজশে এই দেশের আরেক শ্রেণি জাতির সহিত বেইমানি করিল। ফলে যাহা হইবার তাহাই হইয়াছে। ২০২৪ ঘটিয়াছে। এক্ষণে প্রশ্ন দাঁড়াইতেছে, ২০২৪ সালে পতিত রক্তস্রোতের ফলাফল কি দাঁড়াইবে? ১৯৫২ যদি ট্রাজেডির বছর হইয়া থাকে, ২০২৪ সালও কি তবে প্রহসনে গিয়া শেষ হইবে? হইতে পারে ইহাই নাটকের শেষ অঙ্ক নহে।

* * *

২০২৪ সালের রক্তধারা প্রমাণ করিয়াছে মানুষ নিছক স্বভাবের জীব নহে। মানুষের মন ইতিহাসের সৃষ্টি, তাহার অগণন অভিজ্ঞতার পরিণতি বা সৃষ্টিকর্তা। এই অভিজ্ঞতা শুদ্ধ ২০২৪ সালে সীমিত ছিল ভাবিলে অনেক বড় ভুল হইবে। বড় বড় ভুলের পুনরাবর্তন ঘটিবে। মনে রাখিতে হইবে, শুদ্ধ ১৯৭১ সালের নয়, ১৯৪৭ সালের, এমনকি ১৯০৫ সালের, মায় ১৮৫৭ সালের বাসনা হইতেও ২০২৪ সালের গণতন্ত্র প্রাণ সংগ্রহ করিয়াছে।

মজার ব্যাপার, আমরা এই সত্য সবসময় স্মরণ করি না। কথাটা এইভাবে বলা ঠিক হইল কিনা জানি না। আসলে জানি না। আমরা জানিয়াও জানি না। শুদ্ধ সংকটের মুহূর্তেই মাত্র এই সত্য ঝিলিক দিয়া ওঠে। মহাত্মা ফ্রয়েডের আবিষ্কার অনুসারে এই ঝিলিককে বলা হইয়া থাকে ‘অজ্ঞান’।

অজ্ঞান বলিতে ফ্রয়েড কিন্তু জ্ঞানের অভাব বোঝান নাই, বুঝাইয়াছেন ‘অ’য়ের অর্থাৎ অভাবের জ্ঞান। অভাবের জ্ঞান মানে যে জ্ঞান আমার আছে অথচ তাহা যে আছে সে কথা আমি জানি না। এই জ্ঞানের আর দশটা বৈশিষ্ট্য সাধারণ জ্ঞান বা কান্ডজ্ঞানের মতো নয়।

সমাজের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী আর রাজনীতি ব্যবসায়ীরা যাহা জানেন বা এস্তেমাল করেন তাহাকেই লোকে বলে ‘রাজনীতি’ কিংবা রাজকাহিনি। পন্ডিত ব্যবসায়ীগণ ইহার জ্ঞানগর্ভ সংজ্ঞা জানেন : ‘যাহা কিছু সম্ভব তাহার ব্যবসায়।’ সম্ভবের ব্যবসায় নহে, অসম্ভবকে সম্ভব করিবার যে ব্যবসায় আমরা এখানে তাহাকেই ‘অজ্ঞান’ আখ্যা দিয়াছি।

একনায়কতন্ত্রের নিকৃষ্টতম রূপ ফ্যাসিতন্ত্র। বাংলাদেশে প্রায় সকলেই যখন এই ফ্যাসিতন্ত্রকে এক প্রকার নিয়তি বলিয়া মানিয়া লইতেছিল ঠিক সেই সন্ধিক্ষণেই একদিন কোথা হইতে যেন হাজারে হাজারে, লাখে কোটিতে মানুষ পথে নামিয়া আসিল। আমরা জানিয়াও জানিতাম না এই আগমনটা ঘটিবে। এহেন আগমনেরই অপর নাম অজ্ঞান।

মরার বাংলাদেশে অপরবেলার ফ্যাসিতন্ত্র ইংরেজি জবানে যাহাকে বলে ‘লেট ফ্যাসিজম’ যখন প্রায় সর্বগ্রাসী হইয়া উঠিল তখনই অজ্ঞানের পুনরাবর্তন ঘটিল। কিভাবে ঘটিল? ইহার অন্তত দুইপ্রস্ত প্রকাশ আছে। একটাকে বলা যায় বাহির হইতে ভিতরে বা বাহ্যিক, অন্যটার নাম ভিতর হইতে বাহিরে অর্থাৎ আন্তরিক।

বাহির হইতে দেখিলাম, যে বাসনার কারণে এদেশ ইংরেজ দখলদারের দুঃশাসন শেষ পর্যন্ত মানিয়া লয় নাই, যে বাসনার চাপে সে একদা ভারতের নিগড় হইতে মুক্ত হইবার সাধনা করিয়াছে, সেই বাসনার দায়েই সে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের প্রতারণা ও গণহত্যার বিরুদ্ধে লড়াই করিতে বাধ্য হইয়াছে। ২০২৪ সালের বেশ আগে এ দেশের শাসক শ্রেণি পুনরায় দেশকে অন্য দেশের হাতে তুলিয়া দিয়াছিল। স্বাধীনতা লাভের নামে আমাদের জাতিরাষ্ট্র হইয়া দাঁড়াইতেছিল অপরাধীন বিজাতীয় রাষ্ট্র।

সংকটকালে যে জ্ঞান বারবার ফিরিয়া ফিরিয়া আসে তাহারই অপর নাম অজ্ঞান। তাই আমরা বলিতে বাধ্য, ২০২৪ সালে যে অজ্ঞানের পুনরাবর্তন ঘটিয়াছে তাহার আলামত ১৮৫৭, ১৯০৫, ১৯৪৭ কি ১৯৭১ সালেই দেখা গিয়াছিল।

অজ্ঞানের প্রথম রক্তপাত হয় ভাষা ও সংস্কৃতির ধমনী হইতেই। আর ইতিহাসে এমন সময়ও আসে যখন সংস্কৃতির সংগঠন রাজনীতির আকার ধারণ করে। সকল সার্থক বিপ্লবের আগে সংস্কৃতির সংগঠন সরব হয়, বৈপ্লবিক চিন্তার প্রবাহ কলকল করিতে থাকে। উদাহরণস্থলে, ১৭৮৯ সালের ফরাশি বিপ্লব প্রাণ পাইয়াছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর এনলাইনেটমেন্ট বা ‘জ্ঞানের আলো’ আন্দোলন হইতে। এই আন্দোলন সারা এয়ুরোপ মহাদেশে একটা সর্বজনীন বিশ্ববিবেক জাগাইয়াছিল, সংগঠিত করিয়াছিল একটা ‘বুর্জোয়া আন্তর্জাতিক’।

মহাদেশ ব্যাপিয়া বিস্তীর্ণ দুর্গতি ও বঞ্চনার অবসান আর নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার বুর্জোয়া-সামাজিক দাবি সর্বসাধারণের মধ্যে ছড়াইয়া দেওয়ার কাজ ছিল ‘জ্ঞানের আলো’ নামধারী বুদ্ধিজীবীদের প্রধান কীর্তি। একই উদাহরণের পুনরাবর্তন দুনিয়ার দেশে দেশে রুশ, তুরস্ক, চীন, কুবা, ভিয়েতনাম কি ইরান সব দেশে ঘটিয়াছে।

এক্ষণে আমাদের সাক্ষাৎ প্রশ্ন হাজির হইয়াছে: আমাদের ভাগে দুই হাজার চব্বিশের পর কি আছে? ২০২৪ সালের গণজাগরণ বাংলাদেশে জবরদস্তি চাপিয়া থাকা ফ্যাসিতন্ত্রী সরকার হটাইয়াছিল, কিন্তু তাহার স্থলে ন্যূনতম বিপ্লবী একটা সরকারও প্রতিষ্ঠা করিতে পারে নাই। অগণন দেয়াললিখন হইতেও অনুমান করা গিয়াছিল, এই গণজাগরণ সমাজ-বিপ্লবের মতন কোনো অকারণ উচ্চাভিলাষ পোষণ করে নাই। অজ্ঞান দেয়ালবাণীর সজ্ঞান ধ্বনি ছিল, ‘স্বাধীনতা আনিয়াছি, সংস্কারও আনিব।’

দুঃখের মধ্যে, দেড় দেড়টি বছর স্থিত অন্তর্বর্তী সরকারও স্মরণ করিবার মতন কোনো সংস্কার প্রবর্তনের চেষ্টা করেন নাই। একটা যেনতেন, দায়সারা সাধারণ নির্বাচন সম্পন্ন করাই সম্ভবত এই সরকারের একমাত্র কৃতিত্ব বলিয়া ভবিষ্যতে কীর্তিত হইবে। মাঝপথে বাধা দেখা দিলে একটি বিন্দু হইতে আরেকটি বিন্দুতে যাইবার পথ যেমন অগত্যা বক্ররেখা হইয়া দাঁড়ায়, বাংলাদেশের ইতিহাসে সদ্য-বিগত অন্তর্বর্তী সরকারও তেমনি একপ্রস্ত বক্ররেখার অধিক হইতে পারে নাই।

শেষ পর্যন্ত কি হইবে বলি কি করিয়া! তবে এই পর্যন্ত যাহা হইল তাহার তুলনা নাই। রাজকাহিনিতে যাহার নাম ‘জনসাধারণের সার্বভৌমত্ব’, ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে বাংলাদেশের জনসাধারণ তাহার পুনরাবর্তন ঘটাইয়াছে। বাংলাদেশ এখন কি আমূল বা অপূর্ব পরিবর্তনের পথে হাঁটার চেষ্টা করিবে? নিষ্ক্রিয় থাকিলে বা জনসংগ্রামের উল্টোদিকে হাঁটিলে ট্র্যাজেডির পুনরাবর্তন কি প্রহসনের পথ এড়ান কঠিন হইবে। স্পেন দেশের কবি আন্তনিয়ো মাচাদো একদা লিখিয়াছিলেন :

হাঁটিতে হাঁটিতে পথ কাটিতেছ তুমি

যে পথে হাঁটিয়া আসিলে

সে পথে ফিরিবে না আর

পথ বলিয়া কিছু নাই, পথিক

সমুদ্রে ভাসে শুদ্ধ জাহাজের ঢেউ।

পরিবর্তনের পথ পূর্ব হইতে কাটা থাকে না, পথ খোদ পথিককেই কাটিতে হয়। ২০২৪ সালের জুলাই কি কাটা পথ না পথের কাঁটা এই প্রশ্নও হয়তো একদিন উঠিবে। তবে আজ শুধু দেখি পথের উপর দীর্ঘকায় পড়িয়া আছে ‘নিশাচর পাখির ডানার লাল লাল ছায়া’।

যাহা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না তাহার নাম অজ্ঞান হয় তো যাহা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না তাহাকে ভাষায় ধরার অপর নাম কবিতা। নিজাম বিশ্বাসের ‘প্রলম্বিত জুলাই’ ইহার একপ্রস্ত উদাহরণ।

হেঁটে গেছি প্রলম্বিত জুলাইয়ের রাস্তায়

পথে খসে পড়ল পা, হাত হলো ডানা

শহরের আকাশে কারফিউ ভেঙে

উড়ে এল সব পাখি, বন্দুকের দোকান

মুহূর্তে গুঁড়িয়ে দিল ক্ষিপ্র আবাবিল

পাখিদের স্লোগান বোঝেনি শিকারি

ভেবেছিল পাখি প্রণয়ের গান গায়,

সূর্যকে ডোবানো হলো তড়িঘড়ি করে,

নিশাচর পাখির ডানার লাল লাল ছায়া

দীর্ঘকায় হয়ে পড়ে থাকল পথের ওপর

পথের গ্রাফিতি একদিন মুছে যাবে,

দেয়াললিপিকে তবু আদর্শলিপি ভেবে

যে শিশু শিখল আজ স্বরবর্ণ, সে

জেনে গেল লাল ছিল রক্তের প্রতীক