স্বপ্ন দিয়ে তৈরি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা

বাংলা অঞ্চলে ‘দেশ’ বা রাষ্ট্রের ধারণা খুব বেশি পুরনো দিনের নয়। আর পূর্ববঙ্গ তথা বর্তমান বাংলাদেশের অস্তিত্বই একসময় ছিল না। এ অঞ্চলের অধিকাংশ এলাকা ছিল পানির নিচে। কালক্রমে পলি পড়ে ভূখ- গঠিত হয়েছে। এ কারণে প্রাচীন কোনো পুরাণ বা গ্রন্থে আমরা এ অঞ্চলের নাম খুব একটা পাই না। যদিও বা পাই খুব সম্মানজনকভাবে পাই না। যুগ যুগ ধরে এ অঞ্চলের মানুষ বহিরাগত শাসকদের দ্বারা শাসিত হয়েছে। তারা তাদের ব্যতিক্রম ছাড়া মেনে নিয়েছে। এমনকি নানাবিধ পরিচয়ের অজুহাতে কখনো কখনো নিজের নিজ এলাকার মানুষের চেয়ে অধিক আপন মানুষ হিসেবে গ্রহণ করেছে। অনার্য মানুষ আর্যের অপমানকে পর্যন্ত বিনা প্রশ্নে প্রণীত জানিয়েছে।

স্বাদেশিকতা বা দেশপ্রেমের বিকাশ ঘটে মূলত উনিশ শতকের নবজাগরণের ফলে। এর নবজাগরণের ফলে এদেশে প্রথম আমরা একদল তরুণকে দেখতে পাই যাদের নাম ছিল ইয়াং বেঙ্গল। এ দলেই ছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩)। তিনি মেঘনাদবধ কাব্য লিখতে গিয়ে প্রশ্ন তোলেন রাম নাকি রাবণ আমাদের নায়ক। রামকে চিহ্নিত করেন বহিঃশক্র হিসেবে। আর্য হিসেবে এ অঞ্চলে আগত হিসেবে। স্বাদেশিকতা, জাতীয়তাবাদের বীজ প্রথম বপিত হয় সিপাহি বিদ্রোহের মাধ্যমে। এ বিদ্রোহের ফলেই ভারতীয়দের মধ্যে ‘দেশ’-এর ধারণা আসে। তারপর বঙ্কিমচন্দ্র প্রথম দেশকে মা হিসেবে আখ্যায়িত করে তাতে ভাবাবেগ যুক্ত করেন। আনন্দমঠ-এর ‘বন্দে মাতরম’্ গানটি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রতীক হয়ে ওঠে। এ জাতীয়তাবদী চেতনার বিকাশ ঘটে উনিশ শতকের আশি ও নব্বইয়ের দশকে। ১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস জাতীয়তাবাদী চেতনাকে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করে। তারপর ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ ঘোষিত হলে দেশ ধারণার স্ফুরণ ঘটে। এই দেশ ধারণা থেকেই শুরু হয় স্বদেশি আন্দোলন। এই স্বদেশি আন্দোলনের সময়ই বাংলাভাষী মানুষের মধ্যে একটি দেশের স্বপ্নের বীজ বপিত হয়। রচিত হতে থাকে অসংখ্য দেশপ্রেমের কবিতা, গান। এই কবিতা, গান আর কথার ভেতরই বাংলাদেশের কল্পনার বর্ণিল রূপ দেখতে পাওয়া যায়। ১৯০৫ সালেই দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচনা করেন কালজয়ী দেশাত্মবোধক গান ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’। এ গানটির ভেতর দিয়েই স্নেহ মায়াভরা শস্য শ্যামল এমন বাংলা কল্পনা রূপ আমরা পাই। একই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেন ‘আমার সোনার বাংলা’। এ গান দুটো বাংলাভাষীদের মধ্যে তাদের হৃদয়ের বাংলা রূপটি এঁকে দিয়েছিল। ফলে এ দুটো গান আমার সোনার বাংলা তার পরবর্তী প্রতিটির আন্দোলন সংগ্রামে বাঙালির হৃদয়ের গান হয়ে উঠেছিল। আর সোনার বাংলা হয়েছে আমাদের জাতীয় সংগীত।

বঙ্গভঙ্গ একসময় রদ হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ধর্মের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ একসময় ভাগ হয়েছিল। কিন্তু সে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের চেতনা এ অঞ্চলের মানুষের মনে এক দশকও স্থায়ী হয়নি। পাকিস্তানি শাসকরা নবগঠিত ধর্মরাষ্ট্রের অখ-তার নামে ভাষার ওপর আঘাত করে। ফলে মানুষ জেগে ওঠে। প্রথমটিতে বৃহৎ বাংলার বাঙালি জাতীয়তাবাদের আর দ্বিতীয়টি ভাষাভিত্তিক বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের স্ফুরণ ঘটে। পাক সার জমিন সাদ বাদের বদলে ‘আমার সোনার বাংলা’র স্বপ্ন আবার ফিরে আসে। বাঙালির হৃদয়ে বাংলাদেশের যে রূপটি স্থান করে আছে তার বর্ণনা আমরা পাই এই দুইটি গানে। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে যে স্মৃতি দিয়ে ঘেরা’ এই দেশ।

স্বপ্ন দিয়ে তৈরি এ দেশ স্বাধীনতা লাভের অর্ধশত বছরেরও অধিক সময় অতিক্রম করেছে। কিন্তু স্বপ্নে যে দেশের স্বপ্ন মানুষ দেখেছিল বর্তমান দেশটির রূপটি এমন বা তার কাছাকাছিও আছে? ‘ভায়ের মায়ের এত স্নেহ কোথায় গেলে পাবে কেহ/ ওমা তোমার চরণ দুটি বক্ষে আমার ধরি/ আমার এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি’। বাস্তবতা তো একদমই ভিন্ন। এ দেশের প্রায় সব প্রশ্নেই দ্বিধাবিভক্ত। জাতীয়তা, জাতিসত্তার পরিচয়, সংস্কৃতি, স্বাধীনতার ইতিহাস, ঐতিহ্যের ব্যাখ্যা এমনকি জাতীয় সংগীতের প্রশ্নেও! মতভেদ সংঘাত, সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। আর অর্থনৈতিক, সামাজিক অবস্থা এতটাই সঙ্গিন হয়েছে যে, এই দেশেতে কেউ থাকতে চাচ্ছে না। সমুদ্র সাঁতরে হলেও পালাতে চাচ্ছে।

কেন এমনটি ঘটল? নানাবিধ কারণ থাকতে পারে। এর প্রধান একটি কারণ বিভক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা।

বাংলাদেশের বর্তমান বিভক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠেছেল ঔপনিবেশিক শাসনামলে কুখ্যাত মেকলে নীতির ওপর ভিত্তি করে। খুব স্পষ্ট করেই সে নীতির কথা বলা হয়েছিল যে, এ শিক্ষার মাধ্যমে এমন এক শ্রেণি গড়ে তোলা হবে যারা হবে শেকড়চ্যুত। এ নীতির ফল ফলেছিল এবং এখনো ফলছে। সবচেয়ে মজার তথ্য হচ্ছে, ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক শক্তি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রথম স্থাপন করে মাদ্রাসা। কলকাতা ও ঢাকায়। পরে বিশ^বিদ্যালয়। বলাবাহুল্য, বাংলা অঞ্চলে ধর্মকেন্দ্রিক মাদ্রাসা, টোল-চতুষ্পাঠী, আর পাঠশালার ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষাধারা মধ্যযুগ থেকেই চালু হয়েছিল। ফলে একই দেশে ভিন্ন ধর্মবোধ, রুচি আর দক্ষতার মানুষ তৈরি হচ্ছিল। এ ধারাগুলোর মধ্যে পবরর্তী সময়ে কোনো কালেই সংযোগ বা সমন্বয় সাধন করা হয়নি। ফলে এখন একই দেশে নানা ধারার শিক্ষা প্রচলিত। প্রাথমিক ভিত্তিমূলক শিক্ষায়ই একই দেশের শিশুরা ভিন্ন ভিন্ন মনোভাব, রুচি ও দক্ষতা নিয়ে গড়ে উঠছে। ফলে সমাজে বেড়েছে বিভক্তি। এ বিভক্তির বিষফল ফলছে সর্বক্ষেত্রে।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম শিক্ষাব্যবস্থা। বিপুল এর কর্মকা-। কিন্তু এ শিক্ষাব্যবস্থা যেমন বিভক্ত, তেমনি কোনোটিরই মান ও গ্রহণযোগ্যতা সন্তুষ্ট হওয়ার মতো নয়। কল্পনার, স্বপ্নের যে বাংলাদেশের রূপ গান, কবিতায়, লেখায় এবং মানুষের মনে গেঁথে আছে সে দেশের উপযুক্ত নাগরিক এ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। কেমন শিক্ষা আমরা চেয়েছিলাম? প্রথমত আমরা চেয়েছিলাম মানবিক একটি শিক্ষিত সমাজ। কিন্তু কার্যত আমাদের শিক্ষা মানবিক মানুষ তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষের কাছে যেসব মানবিক গুণাবলি প্রত্যাশা করা হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ শিক্ষিত শ্রেণির কাছে তা পাওয়া যাচ্ছে না। বিভিন্ন পেশার মানুষ মানবিক তো দূরের কথা, পেশাদার আচরণও করছেন না। ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়াদের চিন্তায় নিজের দেশ কতটুকু আছে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। সবচেয়ে বিপদের কথা এ শিক্ষাব্যবস্থারই ভেতর থেকে তৈরি হচ্ছে একদল উগ্রপন্থি, যারা ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের নামে, এমনকি সামান্য মতভেদের কারণে নৃশংসভাবে মানুষ খুন পর্যন্ত করতে দ্বিধাবোধ করছে না। আর বাংলাদেশের জন্য অসহিষ্ণুতা ও উগ্রবাদ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় তাহলে কী কী?

প্রথমত নয় ধারার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার বদলে একই ধারার ভিত্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ শিক্ষার মেয়াদ হতে পারে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। অর্থাৎ অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ভিত্তিমূলক প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় দেশের সব শিক্ষার্থী একই শিক্ষাক্রমে শিক্ষাগ্রহণ করবে। যেখানে আবশ্যিক থাকবে বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও ইতিহাস শিক্ষা। বাকি বিষয়গুলো থাকবে ঐচ্ছিক। যেগুলো থেকে শিশু বা অভিভাবকরা তাদের রুচি, লক্ষ্য উদ্দেশ্য অনুসারে নির্বাচন করতে পারবেন। যেমন যেসব অভিভাবক মনে করবেন পরবর্তী সময়ে তাদের শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত করবেন, তারা ধর্মীয় বিষয়গুলো নির্বাচন করতে পারবেন এবং সেগুলো সে ধর্মীয় ভাষায় শিক্ষাব্যবস্থা করা যেতে পারে। যেমন: যদি কোনো শিশু মনে করে সে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় যাবে তাহলে সে অনুসারে সে নৈর্বাচনিক বিষয়গুলো মাদ্রাসা ধারার শিক্ষাধারা থেকে গ্রহণ করবে। আবার কেউ যদি মনে করে সে নবম শ্রেণিতে ওঠার পর সে ক্যামব্রিজ শিক্ষাক্রমে পরীক্ষা দেবে, তাহলে সে আগে থেকেই ইংরেজি ভাষামাধ্যমে নৈর্বাচনিক বিষয়গুলো পড়বে। কিন্তু সবার আবশ্যিক বিষয়গুলো হবে একই। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোনো ভিত্তিমূলক তথা প্রাথমিক শিক্ষা মাধ্যম বা ব্যবস্থা থাকবে না। দেশের সাধারণ, মাদ্রাসা ও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোকে এভাবে সরকার একই ধারার ভিত্তিমূলক প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার অংশীদার করে তুলবে।

আবশ্যিক ও নৈর্বাচনিক বিষয়গুলোতে শুধু শিক্ষিত চাকর বা পেশাদার নয়, মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে। যাদের ভেতর থাকবে নিজ দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞান। থাকবে ধর্মীয় বা বাস্তব কারণে অপর দেশ বা জাতির সংস্কৃতিকে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সমন্বয়ের মানসিকতা। সর্বোপরি জীবন যাপনে পরম সহিষ্ণুতা, ধর্মীয় সহনশীলতা, বহুত্ববাদে বিশ্বাসের মনোভাব। ভিত্তিমূলক শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হবে নিজ দেশ, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল নাগরিক তৈরি করা। সর্বোপরি সহানুভূতিশীল, দায়িত্বশীল সৎ নাগরিক তৈরি করা। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ভিত্তিমূলক প্রাথমিক শিক্ষার পরের স্তর থেকে শিক্ষাকে বহুমুখী করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব প্রদান করতে হবে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায়। বাংলাদেশে তাত্ত্বিক বিদ্যায় শিক্ষিত বেকার মানুষের সংখ্যা বিপুল। আমাদের এখন দরকার কর্মমুখী দক্ষ জনবল তৈরি। শিক্ষায় জ্ঞান ও দক্ষতার সমন্বয় প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মানবিক মানুষ তৈরি করা। শিশু একই ধারার ভিত্তিমূলক শিক্ষার পর যে ধারায় শিক্ষায়ই শিক্ষিত হোক না কেন শেষ পর্যন্ত সে যেন নৈতিক, মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে।

ড. শোয়াইব জিবরান : কবি, লেখক, শিক্ষাবিদ