১৯৬২ সালের আগ পর্যন্ত মাধ্যমিক পর্যায়ে একমুখী শিক্ষা এবং একাদশ শ্রেণি থেকে বিভাগনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা চালু ছিল। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২১ সালে তৎকালীন সরকার একমুখী শিক্ষা চালু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ২০২৩ এর জানুয়ারি থেকে চালু হওয়া অভিন্ন শিক্ষাক্রমে পাঠ গ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক পরীক্ষা হওয়ার কথা ২০২৬-এ। মূল্যায়নের কৌশল নির্ধারণের বিষয়টি তদারকি করেন তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সঙ্গে ছিলেন অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। যদিও ২০০৫ সালে তৎকালীন সরকার দেশে একমুখী শিক্ষা চালু করতে চাইলে অধ্যাপক ইকবালসহ অনেক শিক্ষাবিদ এর বিরোধিতা করায় সেবার সরকার একমুখী শিক্ষা পদ্ধতি তথা অভিন্ন শিক্ষাক্রম চালু করা থেকে বিরত ছিল। তার যুক্তি ছিল এতে বিজ্ঞান শিক্ষা সংকুচিত হবে। অনেক শিক্ষাবিদের প্রশ্ন, ২০২৩ সালে তাহলে তিনি কেন মত পাল্টালেন? যাই হোক, সেই সময় সরকারি কর্মকর্তারা একমুখী শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে মত প্রকাশ করেন। তাদের যুক্তি হলো বিশ্বের অন্তত ৭০ শতাংশ দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে কোনো গ্রুপ নেই (যেমন—বিজ্ঞান, বাণিজ্য, মানবিক ইত্যাদি)। তাদের মতে, এসএসসি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর একই ধরনের জ্ঞান ও যোগ্যতা নিয়ে বেড়ে ওঠাই শ্রেয়। এতে সব বিষয়ে শিক্ষার্থীরা মৌলিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায়। আগে যারা মানবিক বিভাগে ছিল তাদের বিজ্ঞান সম্পর্কে কোনো ধারণা গ্রহণের সুযোগ ছিল না। এই শিক্ষাক্রমের বৈশিষ্ট্য হলো দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান, সৃজনশীল ও বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা, পরীক্ষানির্ভরতা কমানো ও কার্যক্রমভিত্তিক মূল্যায়ন।
একমুখী শিক্ষার পক্ষে বলা হয়ে থাকে, এটি মাধ্যমিক পর্যায়ে বিভাগ বিভাজনে না যাওয়ার কারণে সামাজিক শ্রেণিবিভাগ তথা বৈষম্য কমায়। কিন্তু ২০২১ সালে গৃহীত মাধ্যমিক স্তরের এই একমুখী শিক্ষা প্রয়াস [যা পর্যায়ক্রমে ২০২২ (১০০ স্কুলে পাইলটিং চালু হয়), ২০২৩ ও ২০২৪ সালে মাধ্যমিক স্তরের বিভিন্ন পর্যায়ে চালু করা হয়] বেশ কিছু কারণে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। একমুখী শিক্ষা বলতে মূলত বোঝানোর কথা সব মিডিয়াম (যেমন বাংলা, ইংরেজি ও মাদ্রাসা শিক্ষা) নিয়ে সমন্বিত একটি শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা। এই সমন্বয় না করে ২০২৩ সালে যে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করা হয়েছে, সেখানে কেবল মাধ্যমিক স্তরে বিভাগ বিভাজন তুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু উল্লিখিত তিনটি ধারার মধ্যে সমন্বয় সাধন করা হয়নি। অনেক শিক্ষাবিদ মনে করেন, এই প্রয়াস একমুখী শিক্ষাব্যবস্থার নামে এক প্রকার গোঁজামিল। এতে না বিজ্ঞান শিক্ষা হবে, না হবে মানবিক কিংবা বাণিজ্য শিক্ষা। এতে করে সব বিষয়ে, বিশেষ করে উচ্চতর গণিত শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে অনেকেই সমালোচনা করেছেন। আরও বলা হয়েছে যে, এই একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের মধ্যে গুণগত ব্যবধান আরও বাড়িয়ে তুলবে। নানা সমালোচনার মুখে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার পূর্ববর্তী সরকারের প্রবর্তিত নতুন শিক্ষাক্রম তথা একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা আংশিক বাতিল করে ২০১২ সালের পুরনো শিক্ষা ক্রমের আদলে মাধ্যমিক স্তরে (নবম-দশম শ্রেণিতে) বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগ পুনর্বহাল করে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর আলোকে ২০১২ সালে ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০১২’ প্রণয়ন করা হয়। এর বৈশিষ্ট্য হলো জ্ঞানভিত্তিক ও পরীক্ষানির্ভর শিক্ষা। তবে এখানে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি ও শিক্ষককেন্দ্রিক শিখন পদ্ধতি চালু হলেও মুখস্থ নির্ভরতা বেশি ছিল। ২০২১ সালের শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে সমস্যার কারণে অন্তর্বর্তী সরকার মাধ্যমিক স্তরে আংশিকভাবে ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমে ফিরে যেতে এক প্রকার বাধ্য হয়। তবে কিছু পরিবর্তন করে প্রাথমিক স্তরে ২০২১ সালে শিক্ষাক্রম চালু রেখেছে। ২০২৫ সাল থেকে এই পদ্ধতির শিক্ষাক্রম অনুযায়ী পাঠদান শুরু হয়েছে এবং ২০২৭ সালে পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে এসএসসি পরীক্ষা নেওয়ার কথা রয়েছে।
পুরনো পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার কারণ হলো শিক্ষাবিদ, শিক্ষক ও অভিভাবকদের পক্ষ থেকে নতুন কারিকুলাম নিয়ে বিরতিহীন তীব্র সমালোচনা। সমালোচনায় উঠে এসেছে বাস্তবায়নের সক্ষমতা সৃষ্টি না করেই নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন করা। এটি স্বীকার করা বাঞ্ছনীয় যে, প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করা উচিত। তবে তা উচ্চাভিলাষী হলে চলবে না, যা তৎকালীন সরকার করেছিল। ২০১২, ২০২১, ২০২৫-এর শিক্ষাক্রমের মধ্যে তুলনা করলে দেখা যায় যে, ২০১২ এর ধরন হলো জ্ঞানভিত্তিক; ২০২১ সালের শিক্ষাক্রম হলো দক্ষতাভিত্তিক এবং ২০২৫ সালের শিক্ষাক্রম হলো মিশ্র প্রকৃতির। মূল্যায়ন পদ্ধতির বিবেচনায় ২০১২ শিক্ষাক্রম হলো পরীক্ষানির্ভর; ২০২১ সালে শিক্ষাক্রম হলো কার্যক্রমনির্ভর এবং ২০২৫ সালের শিক্ষাক্রম হলো আংশিক পরীক্ষানির্ভর। শিখন পদ্ধতির বিবেচনায় ২০১২ সালের শিক্ষাক্রম হলো শিক্ষাকেন্দ্রিক; ২০২১ সালের শিক্ষাক্রম হলো শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক এবং ২০২৫ সালের শিক্ষাক্রম হলো উভয় পদ্ধতির সংমিশ্রণ। লক্ষ্যের দিক থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায়, ২০১২ সালের শিক্ষাক্রম হলো ‘পাস’-নির্ভর; ২০২১ শিক্ষাক্রম হলো : ‘দক্ষতা অর্জন’-নির্ভর; এবং ২০২৫ সালের শিক্ষাক্রম হলো এই দুই এর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়াস। প্রশ্ন হলো, এর মধ্যে সঠিক সিদ্ধান্ত কোনটি?
আগেই উল্লেখ করেছি যে, সময়ে সময়ে শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করা বাঞ্ছনীয়। তবে তা হতে হবে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গৃহীত যথাযথ শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়ন। ২০২১ সালের গৃহীত পদক্ষেপটি ছিল সেই বিবেচনায় ভুল সিদ্ধান্ত। অবকাঠামো তৈরি, শিক্ষক প্রশিক্ষণসহ শিক্ষা উপকরণের বিষয়গুলোর জোগান না দেওয়ার কারণে তা ছিল কাল্পনিক, উচ্চাভিলাষী ও অর্থ অপচয়। পক্ষান্তরে, ২০২৫-এর পরিমার্জিত তথা সংশোধিত শিক্ষাক্রম ও বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। কারণ, অনেক গবেষকের মতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধরন (যেমন সরকারি/বেসরকারি/বোর্ড) ভেদে মেধা বা দক্ষতার বৈষম্য দূর করতে অভিন্ন পাঠ্যক্রম ও অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা গ্রহণ করা উচিত, যা ২০২৫-এর পরিমার্জনায় স্থান পায়নি। এটি না থাকার কারণে প্রাথমিক পর্যায়ে সবার জন্য একই ধরনের জ্ঞান ও দক্ষতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে তারা মনে করেন। সমতা নিশ্চিতের জন্য এটি বিবেচনায় নেওয়া দরকার বলে দাবি করা হচ্ছে। এ ছাড়া রয়েছে বহুমুখী শিক্ষাকে বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়টি। এই ব্যবস্থায় কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কারিগরি, জীবনমুখী, শিল্প, কৃষি ও আইটিসহ বিভিন্ন ধরনের দক্ষতা অর্জনের শিক্ষা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীকে কেবল পরীক্ষার্থী হিসেবে নয়, বরং জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা। অর্থাৎ দক্ষতা বৃদ্ধি করাও শিক্ষার একটি উদ্দেশ্য, যার গুরুত্ব বাংলাদেশের প্রচলিত পদ্ধতিতে শিক্ষা গ্রহণ করা বেকারের সংখ্যা বিবেচনায় নিলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মূল্যবোধের অবক্ষয় একজন শিক্ষার্থীর টেকসই জীবনব্যবস্থার জন্য অন্যতম প্রধান একটি অন্তরায়। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে আমরা দেখেছি, কত মেধাবী পেশাজীবী, রাজনীতিবিদ, আমলা প্রমুখ কেবল পদচ্যুতই হয়নি; বরং দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তাই শিক্ষার মাধ্যমে নৈতিক ও সামাজিক বিকাশ সাধন জরুরি। এমন শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে, যাতে জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পাশাপাশি এমন পাঠ্যক্রম থাকবে, যার ভিত্তিতে শিক্ষার্থী সহানুভূতি, সহমর্মিতা এবং অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ প্রদর্শনের মতো মানবিক গুণাবলি অর্জন করতে পারে। সামাজিক দায়বদ্ধতা, সম্প্রীতি বাড়ানোর ন্যায় সৎ গুণ অর্জনে সক্ষম হবে এমন শিক্ষাক্রম আমাদের ঘুণে ধরা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার জন্য অতি জরুরি। শিক্ষাকে অর্থ ও ক্ষমতা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা বিপথগামী ও ঝুঁকি পূর্ণ সমাজব্যবস্থা থেকে বের হতে হলে প্রয়োজন জীবনমুখী, মানবিক ও বহুমুখী শিক্ষা—যা হবে নানা ধারায় বিভক্ত শিক্ষাক্রমের মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি করা এক নতুন সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষা খাতে প্রয়োজন অনুযায়ী বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে একটি মানবিক, নৈতিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রজন্ম গড়ে তোলার লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ বিদ্যমান সার্বিক বেহাল দশা থেকে উত্তরণে দেশকে পথ দেখাবে। নতুন সরকার প্রধান ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষাবিদদের সম্মিলিত প্রয়াসে এই স্বপ্ন আলোর মুখ দেখবে—এ প্রত্যাশা রইল।
লেখক : উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়