যেকোনো জাতির অগ্রগতি ও বিকাশের মূলমন্ত্র শিক্ষা। শিক্ষা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও সম্ভাবনা শানিত করে পরিপূর্ণ মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে। তাই শিক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থা একটা দেশের নীতিনির্ধারকদের সর্বোচ্চ মনোযোগ দাবি করে। বলা হয়, একটা জাতিকে ধ্বংস করার জন্য পারমাণবিক বোমা কিংবা ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজন হয় না। সে জাতির শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করলেই যথেষ্ট। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বিগত রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষা ও স্বেচ্ছাচারিতার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছে নিদারুণভাবে। ফলে সত্যিকার অর্থে শিক্ষাক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে এক অপ্রত্যাশিত সংকট। এ সংকট কয়েকটি স্তর অতিক্রম করে শিক্ষাব্যবস্থার টুঁটি চেপে ধরেছে দানবীয় কায়দায়। প্রথমত, বিগত সতেরো বছরে শিক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে নানাভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো সুদূরপ্রসারী চিন্তা কিংবা পরিকল্পনা ছাড়াই এটি করা হয়েছে। এর প্রমাণ হচ্ছে কিছুদিন যেতে না যেতেই সেই পদ্ধতি পরিবর্তনের তোড়জোড়। পৃথিবীর সব সভ্য ও উন্নত দেশে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠেছে সেই দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির আলোকে দীর্ঘদিনের গবেষণা ও চিন্তাচেতনার সমন্বয়ে। শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তন করা যাবে না, বিষয়টা এ রকমও নয়। পরিবর্তমান সময় ও চাহিদার প্রয়োজনে অবশ্যই শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে সেটি হতে হবে সুচিন্তিত, সুপরিকল্পিত ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনায়। কিন্তু বিগত সময়ে সেটি দৃশ্যমান হয়নি। বরং শিক্ষা নিয়ে একধরনের ছেলেখেলায় মেতে উঠেছে তৎকালীন প্রশাসন। শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না দিয়েই হঠাৎ করে চালু হয়েছিল সৃজনশীল পদ্ধতি। শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভরতা থেকে বের করে আনার জন্য এ পদ্ধতি চালু হয়েছিল। কিন্তু সেই উদ্দেশ্য খুব একটা সফল হয়েছে, তা বলার অবকাশ নেই। স্কুল পর্যায়ে হুট করে পরীক্ষা পদ্ধতি তুলে দেওয়ার পদক্ষেপ ছিল অদূরদর্শিতার চূড়ান্ত ধাপ। যা শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিল থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার এসে সৃজনশীল ও পূর্বের বর্ণনামূলক পদ্ধতির মিশ্রণে নতুন ধরনের পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করেছে। শিক্ষার্থীদের মনোজগতে যা প্রভাব ফেলেছে নেতিবাচকভাবে।
পাঠ্যবইয়ের বিষয়গত নিরন্তর পরিবর্তন আরেক উদ্বেগজনক বিষয়। প্রতি বছর পাঠ্যবিষয়ের সংযোজন- বিয়োজন ঘটতে থাকে। এক্ষেত্রেও দীর্ঘস্থায়ী কোনো পরিকল্পনার ছাপ থাকে না। যেন কোনো স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতাবানের আঙুলের ইশারায় বদলে যাচ্ছে সব। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। লেখকদের মৌলিক লেখার অপ্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও বানান বিভ্রাটও ছিল হতাশাজনকভাবে। শ্রেণি উপযোগী পাঠ্য বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও অদক্ষতা ও খামখেয়ালি স্পষ্ট। দেখা গেল ষষ্ঠ শ্রেণিতে যা পাঠ্য করা হয়েছে তা নবম-দশম শ্রেণির উপযোগী। আবার অষ্টম শ্রেণির বইতে যা আছে তা ষষ্ঠ শ্রেণিতে থাকলেই ভালো হতো। পাঠ্যবইয়ের বিষয় ও শিখনফলের ধারাবাহিকতার ক্ষেত্রেও বিপর্যয় লক্ষযোগ্য। এক ক্লাসের সঙ্গে অন্য ক্লাসের বিষয়ের প্রয়োজনীয় ধারাবাহিকতা ও সামঞ্জস্য নেই। রাজনৈতিক বিবেচনায় পাঠ্য বিষয় নির্ধারণ আরেকটি বড় সমস্যা। এ বিষয়টি নিয়েও ভাবার সময় এসেছে।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও হ-য-ব-র-ল অবস্থা বিরাজমান। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের আবহে। কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে, এ কথা অনস্বীকার্য। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রকৃত চিত্র হতাশাজনক। পাবলিক ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিগত সময়ে শিক্ষা ও গবেষণার চেয়ে পেশিশক্তি প্রদর্শনের আখড়া হয়ে উঠেছিল। সন্ত্রাসের বলি হয়েছে বহু নিরীহ শিক্ষার্থী। যাদের হাতে কলম থাকার কথা, তাদের হাতে শোভা পেয়েছে মারণাস্ত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধাবীদের বাদ দিয়ে অযোগ্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে নির্বিচারে। শিক্ষক ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের এ নৈতিক অধঃপতন জাতির জন্য এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরি করেছে। যা থেকে বের হওয়ার পথ খোঁজা জরুরি। যোগ্য, দক্ষ ও মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ শিক্ষাব্যবস্থার শৃঙ্খলা রক্ষা ও গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান শর্ত। শিক্ষা পদ্ধতির সুনিপুণ প্রয়োগ মেধাবী শিক্ষক ছাড়া সম্ভব নয়। অমেধাবী ও অদক্ষ শিক্ষক দিয়ে মেধাবী ও দক্ষ জাতি গঠনের স্বপ্ন হাওয়ায় অট্টালিকা নির্মাণেরই নামান্তর। বিগত বছরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেধাবীদের জায়গা হয়নি। রাজনৈতিক ও অন্যান্য বিবেচনা এত বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল, মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয় যে একটা শিক্ষা ও গবেষণার জায়গা তা সবাই বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। মেধাবীদের বাদ দিয়েই শুধু ক্ষান্ত হয়নি তৎকালীন প্রশাসন; তাদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের কাল্পনিক ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়েছে। অন্যায় নিয়োগের বৈধতা দেওয়ার জন্য এসব ন্যারেটিভ তৈরি করে তৎকালীন সংশ্লিষ্টরা আত্মতৃপ্তিতে ভুগলেও জাতির জন্য তা বয়ে এনেছে অভাবিত বিভীষিকা। এসব কারণে শিক্ষকদের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। যা সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয়। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় পিতা-মাতার পরেই শিক্ষকের স্থান। শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর। শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি ছাড়া শিক্ষার অগ্রগতি সম্ভব নয়। তাই শিক্ষকদের এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যা তাদের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর। অন্যদিকে আমাদের গণমাধ্যম ও দায়িত্বশীলদেরও শিক্ষকদের বিষয়ে ভেবেচিন্তে মতামত প্রকাশ করা জরুরি। সত্য ও ন্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকলে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের কাছে সত্যিকার অর্থে দীক্ষাগুরু হয়ে উঠতে পারেন। শিক্ষক নিয়োগে জালিয়াতি এক্ষেত্রে গুরুতর প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আমাদের শিক্ষার্থীদের একটা বড় ভূমিকা ছিল। বিগত সরকারের সীমাহীন নৈরাজ্য ও স্বেচ্ছাচারিতায় সমাজের সর্বস্তরে তৈরি হয়েছিল বৈষম্যের কালো ছায়া। জনমনে জন্ম নিয়েছিল হতাশা। ফলে আমাদের অনুভূতিপ্রবণ শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে এসেছিল জীবন বাজি রেখে। তাদের সঙ্গে নেমে এসেছিল সমগ্র দেশের মানুষ। ফ্যাসিবাদী শাসকের পতনের পর আমাদের শিক্ষার্থীদের আবার পড়ার টেবিলে ফিরে যাওয়ার কথা থাকলেও তা পুরোপুরি হয়নি। তাদের মনোজাগতিক পরিস্থিতিও স্বাভাবিক হয়নি। দেশ ও সময়ের প্রয়োজনে আমাদের শিক্ষার্থীরা জাতির সন্ধিক্ষণে রাজপথে নেমে এসেছে সবসময়। কিন্তু এরপরই তারা ফিরে গেছে পড়ার টেবিলে। কারণ নিজেকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় রাজনীতি। তারাই দেশের আগামীর কর্ণধার। তাই আমাদের শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফিরিয়ে নেওয়াই বর্তমান সময়ের একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চা বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে শিক্ষাব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতেও আধুনিক যুগোপযোগী ও কর্মমুখী শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিএনপির ৩১ দফায় শিক্ষা নিয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। দফা ২৫-এ বলা আছে—প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় চাহিদাভিত্তিক ও কারিগরি শিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষায় জ্ঞানভিত্তিক ও গবেষণাভিত্তিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে চলমান নৈরাজ্য দূর করতে একাধিক পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে : একই মানের শিক্ষা ও মাতৃভাষায় শিক্ষা নিশ্চিত করা, ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়তে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন চালু করা এবং যোগ্য ও মানবিক দক্ষতাসম্পন্ন জনগোষ্ঠী গড়তে শিক্ষা খাতে জিডিপির কমপক্ষে ৫% বাজেট বরাদ্দ রাখার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যায়ক্রমে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা হবে। সবস্তরে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পদ্ধতি ঢেলে সাজিয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। জাতীয় সংস্কৃতি বিকাশ ও ক্রীড়া উন্নয়নের প্রতিও যথাযথ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশি অপসংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণাও এই দফায় অন্তর্ভুক্ত।
কারিগরি শিক্ষার প্রতি মনোযোগের সময় এসেছে বলে মনে হয়। তত্ত্বীয় শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার প্রসার শিক্ষিত বেকার সমস্যা দূরীকরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। দেশের অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এটি সুফল বয়ে আনতে পারে। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার ওপর জোর দেওয়ার বিকল্প নেই। বর্তমান যুগ বিজ্ঞানের জয়যাত্রার যুগ। মানুষ এখন প্রযুক্তির অভাবনীয় সাফল্যে পৃথিবীর সীমা অতিক্রম করে চাঁদের উল্টোপিঠেও ভ্রমণ করে এসেছে। বাংলাদেশকেও এক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে হবে। নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে যে প্রতিবন্ধকতাগুলো বিদ্যমান সেগুলো দূর করার ব্যবস্থা করতে হবে। সার্বিকভাবে গুণগত শিক্ষার জন্য শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যে বিশৃঙ্খলা বিরাজমান তার স্বরূপ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফ্যাসিবাদের পনেরো বছরে যে অন্যায় ও অবৈধ নিয়োগ হয়েছে সেগুলোর পর্যালোচনা করে বঞ্চিত মেধাবীদের নিয়োগের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। মেধাবী ও যোগ্যদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলেই আসবে শিক্ষার কাক্সিক্ষত সাফল্য।
লেখক : কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক