যে নিকুঞ্জ ও টানপাড়ার মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথের ‘মহাদানব’ খ্যাত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিষিদ্ধ করতে পারে, সেই এলাকায় মাদকের বিষবাষ্প কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। নিকুঞ্জ-টানপাড়া এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে এলাকাকে সুশৃঙ্খল করার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, অন্যদিকে রয়েছে মাদকের এক অন্ধকার হাতছানি। এলাকার সচেতন নাগরিকরা বলছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে যে জয় গত বছর অর্জিত হয়েছে, মাদকের বিরুদ্ধেও সেই একই রকম ‘গেরিলা প্রতিরোধ’ গড়ে তোলার সময় এসেছে।
এলাকার আলোচিত সমাজকর্মী সিনিয়র সাংবাদিক জাহিদ ইকবাল ক্ষোভের সাথে বলছিলেন, যে নিকুঞ্জের জনগণ ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় মহাদানব ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা বন্ধ করতে পারে, সে নিকুঞ্জে মাদকের এই ভয়াবহতা কোনোভাবেই মেনে নেয়ার মত না। আমরা যদি রাস্তা থেকে অবৈধ যানবাহন সরাতে পারি, তবে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নষ্টকারী এই বিষ কেন সরাতে পারব না? এটা এখন আমাদের অস্তিত্বের লড়াই। প্রশাসনকে মনে রাখতে হবে, জনগণ যখন জাগে, তখন কোনো অন্যায় টিকে থাকে না।
সাফল্যের স্মৃতি: যেখানে অসাধ্য সাধন করেছে নিকুঞ্জবাসী
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল নিকুঞ্জ ও খিলক্ষেত টানপাড়া এলাকার বাসিন্দারা এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। বছরের পর বছর ধরে চলা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দৌরাত্ম্য, যা সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তা জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এলাকা থেকে বিতাড়িত হয়। সেই আন্দোলনে প্রমাণ হয়েছিল, স্থানীয়রা চাইলে এবং সম্মিলিত চাপ সৃষ্টি করলে প্রশাসনও ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু বর্তমানে মাদক পরিস্থিতির যে ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে, তা সেই অর্জিত শান্তি ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে।
মাদকের বিস্তৃত মানচিত্র: ১৩টি মৃত্যুকূপ
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নিকুঞ্জ ও টানপাড়ার অলিগলিতে গড়ে উঠেছে মাদকের ডজনখানেক হটস্পট। যেখানে প্রশাসনের চোখের সামনেই চলে রমরমা কারবার:
১. টানপাড়া পশ্চিমপাড়া: নজরুলের মেস ও রোডের শেষ মাথা মাদকের পাইকারি ও খুচরা বিক্রির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
২. জামতলা এলাকা: লইরা বাবুলের বাড়ির পাশের খালি জায়গা, আলীজানের টেক এবং আমিন মঞ্জিলের আশপাশ এখন অপরাধীদের অভয়ারণ্য। এছাড়া পিলার খায়েরের বাড়ির পূর্ব পাশও এখন মাদকের ওপেন স্পট।
৩. বস্তিকেন্দ্রিক সিন্ডিকেট: আইজ্জার বস্তি এবং এটিএনের চারপাশের খালি জায়গাগুলো মাদকসেবীদের নিরাপদ আস্তানা।
৪. শিক্ষা ও বাণিজ্যিক এলাকা: জানে আলম স্কুলের পশ্চিম পাশের রাস্তা এবং বিআরটিসি কাউন্টারের সামনের ভাসমান দোকানগুলোতে ছদ্মবেশে মাদক বিক্রি হচ্ছে। এমনকি পেট্রোবাংলা সংলগ্ন পরিত্যক্ত এলাকা ও ১৮ নম্বর রোডের পশ্চিম পাশে গভীর রাত পর্যন্ত চলে মাদক কারবারিদের আনাগোনা।
রাজনৈতিক আশ্রয়ে বেপরোয়া মাদক সম্রাটরা
৫ আগস্টের পরবর্তী অস্থিরতাকে সুযোগ হিসেবে নিয়েছে একদল সুবিধাবাদী। রাজনৈতিক পরিচয়কে ‘লাইসেন্স’ হিসেবে ব্যবহার করছে তারা। স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে একদল সুবিধাবাদী এই মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে। যুবদলের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে নূর হোসেন লাল ও তার ভাই বাবুল পুরো এলাকায় একচ্ছত্র মাদকের সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একইভাবে স্বেচ্ছাসেবক দলের নাম ভাঙিয়ে বহু মামলার চিহ্নিত আসামি মোফাবাবু ও তার ভাই জিসান নিয়ন্ত্রণ করছে হরেক রকম মাদকের সাপ্লাই চেইন।
তালিকায় আরও এসেছে অটোরিকশা সিন্ডিকেটের সেই বহুল আলোচিত গডফাদার তোফাজ্জল হোসেন বাবুর্চির ছেলে দেলোয়ারের নাম। এছাড়া সরকার বাড়ির টিটু সরকারের ভাগিনা রবিন, কাজী ইব্রাহিমের বাড়ির ভাড়াটিয়া মতির ছেলে মিঠু, এবং টানপাড়া মুসলিম কাঁচাবাজারের নবী হোসেন ও সবুজ এই ভয়ংকর কারবারের অন্যতম হোতা। এছাড়া মধ্যপাড়ার কাঠমিস্ত্রি রিপন, আইজ্জার বস্তির খোরশেদ ও আসিফ এবং দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মাদক ব্যবসা চালিয়ে আসা জামতলার মানিকের খুঁটির জোর কোথায়, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এলাকাবাসী। এদের বিরুদ্ধে অতীতে বহুবার সামাজিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও কোনো ফল আসেনি।
প্রশাসনের ভূমিকা ও পুলিশের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ
খিলক্ষেত থানা পুলিশের নিস্পৃহতা নিয়ে ক্ষোভ এখন তুঙ্গে। অভিযোগ উঠেছে, পুলিশেরই কিছু সদস্য মাদক কারবারিদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রাখছেন। অভিযানের আগাম খবর পৌঁছে যাচ্ছে অপরাধীদের কানে। ফলে পুলিশ আসার আগেই স্পটগুলো ফাঁকা হয়ে যায়—যাকে স্থানীয়রা ‘আইওয়াশ’ বলে অভিহিত করেছেন।
ভুক্তভোগীরা জানান, ৫ আগস্টের পর পুলিশের টহল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। রাতে রাস্তাগুলো এখন মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের অবাধ বিচরণস্থলে পরিণত হয়েছে। বড় কোনো রক্তক্ষয়ী ঘটনা না ঘটলে পুলিশের দেখা পাওয়া যায় না বলে দাবি করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা। এলাকাবাসীর মতে, পুলিশ যদি সদিচ্ছা পোষণ করত, তবে এই চিহ্নিত ১৩টি স্পট ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নির্মূল করা সম্ভব ছিল।
ওসির বক্তব্য ও জাতীয় প্রেক্ষাপট
খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আব্দুল আলিম অবশ্য দৃঢ়তার সাথে দাবি করেছেন, “মাদকের ব্যাপারে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। খিলক্ষেত থানা কোনো অপরাধীকে ছাড় দেবে না। আমাদের লক্ষ্য একটি নিরাপদ ও সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তোলা। আপনারা সরাসরি তথ্য দিন, আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেব। মাদকের আগ্রাসন থেকে যুব সমাজকে রক্ষা করার ব্যাপারে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।”
অন্যদিকে, জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ঘোষণা করেছেন, আগামী ৩০ এপ্রিলের পর সারা দেশে মাদকের বিরুদ্ধে সমন্বিত মহড়া ও অভিযান শুরু হবে। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, কোনো পুলিশ সদস্যের মাদক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাকে সরাসরি শাস্তির আওতায় আনা হবে।
এখন প্রয়োজন নাগরিক প্রতিরোধ
নিকুঞ্জ ও টানপাড়া এলাকায় শীতবস্ত্র বিতরণ, অটোরিকশা উচ্ছেদ, বিনামূল্যে টিকাদান কর্মসূচি এবং অবৈধ দখলমুক্ত করার যে সামাজিক ঐতিহ্য রয়েছে, তাকে এখন মাদকের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা সময়ের দাবি। এলাকাবাসী মনে করছেন, যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা হঠানো হয়েছিল, একইভাবে পাড়ায় পাড়ায় ‘মাদক প্রতিরোধ কমিটি’ গঠন করতে হবে।
একটি জাতির মেরুদণ্ড হচ্ছে তার যুব সমাজ। সেই সমাজকে যদি কাঁচা টাকার লোভে মাদক ব্যবসায়ী বানানো হয়, তবে এলাকার কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না। নিকুঞ্জবাসীর এই ঐতিহাসিক সংকল্প এখন আরও দৃঢ় করতে হবে। নিজেদের সন্তানদের নিরাপদ রাখতে হলে, ঘুষখোর ও অন্যায়ের মদদদাতাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। নিজেরা ভালো না হলে এবং পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় না করলে সমাজ থেকে এই বিষ নির্মূল করা সম্ভব নয়।
মাদকের সাথে অপরাধের গভীর যোগসূত্র রয়েছে। আজ যে তরুণটি মাদক কিনছে, কাল সে-ই ছিনতাই বা খুনের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। তাই রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কেবল ‘বাহক’ ধরলেই হবে না, ধরতে হবে রাঘববোয়ালদের। মুখোশ উন্মোচন করতে হবে সেই সব রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের, যারা নিজেদের স্বার্থে এলাকাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। খিলক্ষেত থানার পুলিশ যদি সত্যিকার অর্থেই জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করতে চায়, তবে এই চিহ্নিত মাদক সম্রাটদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনতে হবে। নিকুঞ্জের সাহসী জনতা অটোরিকশা হঠিয়ে যে বিজয় অর্জন করেছিল, মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার মাধ্যমে তারা সেই বিজয়ের পূর্ণতা দেবে—এটাই এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।