আগামী ১২ থেকে ২২ মে পর্যন্ত ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসব কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের ৭৯তম আসর। এবারের উৎসবে কান কর্তৃপক্ষ নজর কাড়ছে তার বৈচিত্র্যময় ও শক্তিশালী জুরি বোর্ড দিয়ে। বুধবার (২৯ এপ্রিল) শর্ট ফিল্মস ও লা সিনেফ বিভাগের পাঁচ সদস্যের জুরি বোর্ড ঘোষণা করেছে উৎসব কর্তৃপক্ষ। জুরির সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন স্পেনের খ্যাতিমান চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক কার্লা সিমোন। জুরিতে তার সঙ্গে বিচারক হিসেবে থাকছেন ফ্রান্সের অভিনেত্রী শিল্পী পার্ক জি-মিন, ইরানের পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার আলি আসগারি, ফ্রান্সের অভিনেতা ও পরিচালক সালিম কেশিউশ এবং সুইডেনের পরিচালক-চিত্রনাট্যকার ম্যাগনুস ভন হর্ন।
কানস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই পাঁচ সদস্যের জুরি উৎসবের শর্ট ফিল্ম প্রতিযোগিতা বিভাগের ১০টি নির্বাচিত চলচ্চিত্র এবং লা সিনেফ নির্বাচনের ১৯টি চলচ্চিত্র পর্যালোচনা করবেন। তরুণ নির্মাতাদের সৃষ্টিশীলতা, নতুন ভাষা, নান্দনিকতা ও চলচ্চিত্র ভাবনার মূল্যায়নেই থাকবে তাদের মূল দায়িত্ব। তারা শর্ট ফিল্ম প্রতিযোগিতা বিভাগের সেরা চলচ্চিত্রকে মর্যাদাপূর্ণ শর্ট ফিল্ম পাম দ’অর প্রদান করবেন। একইসঙ্গে চলচ্চিত্র শিক্ষার্থীদের কাজের জন্য নিবেদিত বিভাগ লা সিনেফ-এর তিনটি পুরস্কার তারা ঘোষণা করবেন।
কান কর্র্তৃপক্ষ অভিজ্ঞতা ও বৈচিত্র্যকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। পার্ক জি-মিন অভিনয়ের পাশাপাশি ভিজ্যুয়াল আর্টের জগতেও পরিচিত মুখ। তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দ্রæত পরিচিতি পাওয়া অভিনয়শিল্পী। তাঁর অভিনয়ে রয়েছে সংবেদনশীলতা ও আধুনিকতার মিশেল। আলি আসগারি সমকালীন ইরানি সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা। সামাজিক বাস্তবতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মানবিক সংকট তার কাজের প্রধান বিষয়। এ কাজের জন্য প্রশংসিত। সালিম কেশিউশ দীর্ঘ অভিনয় জীবনের পর পরিচালনায়ও নাম লিখিয়েছেন। তিনি দীর্ঘ অভিনয়জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে এবার বিচারকের আসনে। অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনাতেও নিজেকে প্রমাণ করেছেন।
আর ম্যাগনুস ভন হর্ন ইউরোপীয় চলচ্চিত্রের নতুন প্রজন্মের শক্তিশালী নির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ইউরোপীয় চলচ্চিত্রে গভীর মনস্তাত্তি¡ক ও সামাজিক গল্প বলার জন্য পরিচিত। তার নির্মাণশৈলী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত। ফলে অভিনয়, চিত্রনাট্য, পরিচালনা, প্রযোজনা ও শিল্প-নান্দনিকতাÑসব মিলিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জুরি বোর্ড পেয়েছে এবারের কান উৎসব। পাঁচজন বিচারকের দৃষ্টিভঙ্গি একে অপরের থেকে আলাদা হলেও তাদের সম্মিলিত অভিজ্ঞতা তরুণ নির্মাতাদের কাজ মূল্যায়নে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে করছেন সমালোচকেরা।
চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, এবারের জুরি বোর্ডে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিনিধিত্ব যেমন আছে, তেমনি অভিনয়, পরিচালনা, চিত্রনাট্য ও শিল্পভাবনারও শক্তিশালী সমন্বয় ঘটেছে। ফলে তরুণ নির্মাতাদের কাজ মূল্যায়নে এটি হতে পারে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভারসাম্যপূর্ণ প্যানেল।
জুরি বোর্ড প্রধান কার্লা সিমোন বলেছেন, শর্ট ফিল্মস ও লা সিনেফ জুরির সভাপতি হতে পেরে আমি গভীরভাবে সম্মানিত এবং নতুন কণ্ঠগুলো আবিষ্কারের সুযোগ পেয়ে কৃতজ্ঞ। একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নিজেই একটি পূর্ণাঙ্গ মহাবিশ্ব। মাত্র কয়েক মিনিটেই এটি চিরস্থায়ী ছাপ রেখে যেতে পারে। স্বাধীন সৃষ্টিশীলতা, শিল্পীসুলভ ঝুঁকি গ্রহণ এবং আত্মার স্পর্শে তৈরি এই মাধ্যম আমাকে সিনেমার মূল সত্ত¡া ও প্রথম আবিষ্কারের উত্তেজনার সঙ্গে আবার যুক্ত করে। কানে ফিরে আসা আবারও এক অভিযাত্রা, এক স্বপ্ন এবং এক বিশেষ সৌভাগ্য।
কান চলচ্চিত্র উৎসবের শর্ট ফিল্ম বিভাগ দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্ব চলচ্চিত্রের নতুন প্রতিভা আবিষ্কারের জায়গা হিসেবে পরিচিত। অনেক খ্যাতিমান নির্মাতাই তাদের ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ফলে এই বিভাগে পুরস্কার পাওয়া মানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্ত অবস্থান তৈরি হওয়া।
অন্যদিকে, লা সিনেফ বিভাগটি বিশ্বের বিভিন্ন চলচ্চিত্র বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাজ নিয়ে গঠিত। এখান থেকে উঠে আসা অনেক তরুণ নির্মাতা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক উৎসবে সাফল্য পেয়েছেন। তাই এই বিভাগের বিচারক হওয়া মানেই ভবিষ্যৎ সিনেমার দিকনির্দেশনায় ভ‚মিকা রাখা। শুধু পুরস্কার নয়, এই দুই বিভাগকে ভবিষ্যৎ চলচ্চিত্রকারদের জন্মমঞ্চ হিসেবেও দেখা হয়।
বিশ্বজুড়ে নতুন নির্মাতারা প্রতি বছর কানের শর্ট ফিল্ম ও লা সিনেফ বিভাগকে সবচেয়ে বড় মঞ্চ হিসেবে বিবেচনা করেন। কারণ এখানকার সাফল্য শুধু পুরস্কার নয়, আন্তর্জাতিক প্রযোজক, পরিবেশক ও উৎসব আয়োজকদের নজরে আসার সুযোগও তৈরি করে।
চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কান চলচ্চিত্র উৎসব বরাবরই মূল প্রতিযোগিতা বিভাগের জন্য আলোচনায় থাকে। তবে অনেক সময় শর্ট ফিল্ম ও লা সিনেফ থেকেই ভবিষ্যতের বড় নির্মাতাদের জন্ম হয়। কার্লা সিমোনের মতো সংবেদনশীল ও মানবিক গল্পকারের নেতৃত্বে এবারের জুরি নতুন ধরনের ভাষা, সাহসী নির্মাণশৈলী এবং বৈশ্বিক বাস্তবতার গল্পকে অগ্রাধিকার দিতে পারে। এবারের এই জুরি ঘোষণা শুধু একটি আনুষ্ঠানিক খবর নয়; বরং বিশ্ব চলচ্চিত্রের আগামী দিনের সম্ভাবনাময় নির্মাতাদের দিকে নজর রাখার আহŸানও বটে। ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে এখন সেই নতুন প্রতিভা আবিষ্কারের অপেক্ষা।
কার্লা সিমোন ১৯৮৬ সালে বার্সেলোনায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কাতালোনিয়ার একটি ছোট গ্রামে বড় হন। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া এবং অটোনোমাস ইউনিভার্সিটি অব বার্সেলোনায় অডিওভিজ্যুয়াল কমিউনিকেশন অধ্যয়ন করেন। পরে লন্ডন ফিল্ম স্কুলে পড়াশোনার জন্য বৃত্তি পান। তিনি বেশ কয়েকটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যার মধ্যে রয়েছে- উইমেন-২০০৯, লাভার্স-২০১০, বর্ন পজিটিভ-২০১২, লিপস্টিক-২০১৩, লাস পেকেনিয়াস কোসাস-২০১৫, ইয়াকুনেস-২০১৬, ইফ দেন এলস-২০১৯, করেসপনদেনসিয়া-২০২০ এবং কার্তা আ মি মাদ্রে পাড়া মি হিহো-২০২২। তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র সামার একাধিক পুরস্কার জেতে। দ্বিতীয় চলচ্চিত্র আলকাররাস বার্লিন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে গোল্ডেন বেয়ার অর্জন করেন। তার তৃতীয় চলচ্চিত্র রোমেরিয়া ২০২৫ সালে কানের অফিশিয়াল কম্পিটিশনে প্রদর্শিত হয়।
অভিনেত্রী ও ভিজ্যুয়াল শিল্পী পার্ক জি-মিন সিউল-এ শিল্পী পরিবারে জন্ম নেওয়া পার্ক জি-মিন নয় বছর বয়সে ফ্রান্সে চলে আসেন। তিনি প্যারিস আর্টস ডেকোরেটিফস-এ পড়াশোনা করেন। চলচ্চিত্রে তাঁর অভিষেক রিটার্ন টু সিউল-এ। এ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি সিজার অ্যাওয়ার্ডস-এ বেস্ট নিউকামার অ্যাকট্রেস মনোনয়ন পান। তিনি ২০২৫ সালে কানে প্রদর্শিত তিনটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেনÑ দ্য লিটল সিস্টার, লাভ মি টেন্ডার ও আ প্রাইভেট লাইফ।
পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজক আলি আসগারি ইরানে জম্ম গ্রহণ করেন। তিনি সমকালীন ইরানি সিনেমার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা। তাঁর নির্মিত শর্ট ফিল্মগুলোর মধ্যে রয়েছেÑমোর দ্যান টু আওয়ার্স-২০১৩, দ্য বেবি-২০১৪ এবং দ্য সাইলেন্স-২০১৬। তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স-২০১৭, যা কানের লা রেসিডেন্সে বিকশিত হয়। পরে তিনি আনটিল টুমরো-২০২২ এবং টেরেস্ট্রিয়াল ভার্সেস-২০২৩ নির্মাণ করেন। তার সর্বশেষ চলচ্চিত্র ডিভাইন কমেডি-২০২৫ সালে ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রিমিয়ার হয়।
অভিনেতা ও পরিচালক সালিম কেশিউশ ১৯৭৯ সালে ফ্রান্সের লিয়ঁ-এ জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি অভিনয় শুরু করেন। তিনি ফ্রাঁসোয়া ওজঁ, আব্দেললাতিফ কেশিশসহ বহু নামীদামী পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন। তিনি বøু ইজ দ্য ওয়ার্মেস্ট কালারে অভিনয় করেন, যা ২০১৩ সালে কানস উৎসবে পাম দ’অর পুরস্কার অর্জন করে। তিনি ২০২৩ সালে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ।
পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার ম্যাগনুস ভন হর্ন শৈশব সুইডেনে কাটালেও পোল্যান্ডের লিয়ন শিলার ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব ফিল্ম আর্টসে চলচ্চিত্র বিষয়ে পড়াশোনা করেন, যেখানে তিনি বর্তমানে শিক্ষকতাও করছেন। ২০০৭ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে তার বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত একাধিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রর্দশিত হয়। ২০১৫ সালে তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দ্য হিয়ার আফটার মুক্তি পায়। এরপর তিনি সোয়েট নির্মাণ করেন, যেখানে সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত প্রভাব ও নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরা হয়েছে। এ চলচ্চিত্রটি কান ২০২০ লেবেল অর্জন করে। ২০২৫ সালে তার চলচ্চিত্র দ্য গার্ল উইথ দ্য নিডল কানের প্রতিযোগিতা বিভাগে প্রিমিয়ার হয় এবং বেস্ট ইন্টারন্যাশনাল ফিচার ফিল্ম বিভাগে গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ডস ও অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসে মনোনয়ন পায়।