ভারতের আসাম রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা একটি বিতর্কিত মন্তব্য করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেছেন, তিনি প্রতিদিন ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন যেন ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের উন্নতি না হয়। তার মতে, দুই দেশের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক বজায় থাকলেই আসামের সীমান্ত সুরক্ষিত থাকে এবং অনুপ্রবেশকারীদের সহজেই বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।
ভারতীয় গণমাধ্যম এবিপি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে মৈত্রী স্থাপিত হলে সীমান্ত শিথিল হয়ে যায়, যা আসামের জন্য বিপজ্জনক। তিনি বলেন, যখন দুই দেশের সম্পর্ক ভালো থাকে না, তখন বিএসএফ কড়া প্রহরায় থাকে, বন্দুক উঁচিয়ে থাকে। কিন্তু সম্পর্ক ভালো হলে ভারত সরকারও পুশ-ব্যাক করতে চায় না। তাই আসামের মানুষের ভালো লাগে যখন দুই দেশের মধ্যে একটি বৈরী সম্পর্ক থাকে।
বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন বা প্রথাগত পদ্ধতির তোয়াক্কা না করে কীভাবে ‘ধাক্কা মেরে’ পাঠিয়ে দেওয়া হয়, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, বিএসএফ অনেক সময় ধৃতদের ১০ থেকে ৪০ দিন পর্যন্ত নিজেদের কাছে আটকে রাখে। এরপর রাতের অন্ধকারে যখন ওপারে বিজিবি (যাকে তিনি বিডিআর বলে উল্লেখ করেছেন) থাকে না, তখন সেই সুযোগে সীমান্ত দিয়ে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়।
মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, আইনি পথে কাউকে ফেরত পাঠাতে চাইলে বাংলাদেশ তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করতে চায় না এবং প্রচুর প্রমাণ দাবি করে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কোনো বন্দি বিনিময় চুক্তি না থাকায় এই জটিলতা এড়াতে তারা সুপ্রিম কোর্টের একটি পুরনো রায়ের দোহাই দিয়ে ‘বিতাড়ন’ বা ‘পুশ-ব্যাক’ পদ্ধতি অনুসরণ করছেন। তবে আইনজ্ঞরা বলছেন, ১৯৫০ সালের যে আইনের কথা মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, তা দিয়ে এভাবে ঢালাওভাবে পুশ-ব্যাক করার আইনি বৈধতা নেই।
হিমন্ত বিশ্বশর্মার এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ঢাকার সাথে সম্পর্কের বরফ গলাতে তৎপর। সম্প্রতি বিজেপি নেতা ও প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় ভারতের পরবর্তী রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের পর বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সম্পর্ক উন্নয়নের যে বার্তা দিল্লি দিতে চাইছে, আসামের মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্য তার সম্পূর্ণ বিপরীত এবং অপেশাদার।
মুখ্যমন্ত্রীর এই স্বীকারোক্তি গত এক বছরে বাংলাদেশে পুশ-ব্যাক হওয়া অনেক মানুষের অভিজ্ঞতার সাথে মিলে যায়। আসামের অনেক বাসিন্দা, যাদের পরবর্তীতে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাদেরও একইভাবে রাতের অন্ধকারে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বিশ্লেষক শ্রীরাধা দত্ত মনে করেন, ভারতের মতো একটি দেশের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে এ ধরণের মন্তব্য সমস্যা সমাধানের পথ প্রশস্ত না করে বরং জটিলতা বাড়াবে। অন্যদিকে সাবেক রাষ্ট্রদূত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী মনে করেন, মুখ্যমন্ত্রী কেবল একটি রূঢ় সত্য প্রকাশ করেছেন, যা দীর্ঘকাল ধরে সীমান্তে ঘটে আসছে। তবে রাজনৈতিক স্বার্থ ও কূটনীতি যে অনেক সময় ভিন্ন পথে চলে, তার এটি একটি বড় উদাহরণ।
সূত্র: বিবিসি বাংলা