টার্গেট কিলিংয়ের ছক

আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইশারা পেয়ে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রায়ই ঘটছে অস্ত্রবাজি, রক্তের হোলিখেলা। পুরস্কার ঘোষণা করেও আন্ডারওয়ার্ল্ডের চাঁইদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। দেশের বাইরে থেকেও অস্ত্রবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে দাগি সন্ত্রাসীরা। টাকা-পয়সার ভাগাভাগি, এলাকার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও গডফাদারদের ইশারায় ঘটছে খুনখারাবি।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শীর্ষ সন্ত্রাসীরা কারামুক্ত হওয়ার পর উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। একাধিক হত্যাকা-সহ নানা অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। পুলিশের তৎপরতা বাড়লে কিছুদিন অপরাধ স্তিমিত থাকে, তারপর আবার অস্থিরতা দেখা দেয়।

টার্গেট কিলিংয়ের অংশ হিসেবে গত মঙ্গলবার রাতে ঢাকায় অপরাধজগতের ত্রাস খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন খুন হন। আন্ডারওয়ার্ল্ডের আরেক ত্রাস সানজিদুল ইসলাম ইমন মালয়েশিয়া থেকে এ খুনের নির্দেশ দিয়েছেন বলে অভিযোগ; যদিও টিটন ও ইমন আপন শ্যালক-দুলাভাই। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়েই এ ঘটনা ঘটেছে। কিলার বাদল ও পিচ্ছি হেলালের সঙ্গেও টিটনের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। পুলিশের ধারণা, তারাও এ হত্যাকান্ডে সম্পৃক্ত থাকতে পারে।       

পুলিশ-সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে, হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠেছে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড। খুন, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দখলের মতো অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রকরা। মরিয়া হয়ে উঠেছে নিজেদের অপরাধের সা¤্রাজ্য ধরে রাখতে। অস্তিত্ব জাহির করতেই তারা ঘটাচ্ছে হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা। আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক গ্রুপ এগিয়ে গেলে প্রতিপক্ষ গ্রুপ প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ এখনো দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি, এ সুযোগই কাজে লাগাচ্ছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রকরা। ফলে বেড়ে যাচ্ছে সামাজিক অস্থিরতা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছে বেশ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, হত্যাকাণ্ডগুলো তাদের পুনরুত্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সন্ত্রাসীদের সহযোগীরাও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে আগ্নেয়াস্ত্রের চোরাচালান আসছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আব্বাস আলী ওরফে কিলার আব্বাস, সুইডেন আসলাম, ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ইমন, খন্দকার নাঈম ওরফে টিটন ও খোরশেদ আলম ওরফে ফ্রিডম রাসুসহ বেশ কয়েকজন কুখ্যাত সন্ত্রাসী কারাগার থেকে মুক্তি পান। বেশিরভাগ শীর্ষ সন্ত্রাসীই বিদেশ থেকে ফিরেছে এবং নিজ নিজ এলাকা পুনর্দখল, পুরনো অনুসারীদের ডেকে পাঠানো ও চাঁদাবাজি শুরু করেছে। স্থানীয় ক্যাডাররা বাধা দিলেই সংঘাত হচ্ছে। মোল্লা মাসুদ ও সুব্রত বাইন সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে। তারা কারাগারে আটক থাকলেও এলাকার নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে তাদের ইশারায়। গত মঙ্গলবার রাতে নিউমার্কেট এলাকায় খুন হন টিটন। ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এ হত্যাকান্ড ঘটেছে। টিটনের ভগ্নিপতি ইমন কারাগার থেকে বের হয়ে মালয়েশিয়ায় চলে যান। এ সুযোগে হাজারীবাগ, ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, আদাবর ও মোহাম্মদপুর টিটনের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। একসময় ওইসব এলাকা ইমন, পিচ্চি হেলাল ও কিলার বাদলের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এ নিয়ে বিরোধ হয় টিটনের সঙ্গে। মিরপুর-১০, ১৩, ১৪, ইব্রাহিমপুর, কচুক্ষেত ও ভাসানটেকসহ আশপাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে শীর্ষ সন্ত্রাসী কিলার আব্বাস ও ইব্রাহিম। তারা ঠিকাদারদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করছে। তাদের সহযোগীরা বাড়তি দামে নির্মাণসামগ্রী কিনতেও ঠিকাদারদের বাধ্য করছে। চট্টগ্রামে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ বিদেশে থেকে অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে। সাজ্জাদ একসময় সারওয়ার হোসেন বাবলা ও আকবর আলী ওরফে ঢাকাইয়া আকবরের মাধ্যমে তার আধিপত্য বহাল রাখত। এক দশক আগে দুজনই আলাদা গ্রুপ তৈরি করে। গত বছরের ২৩ মে আকবরকে পতেঙ্গায় হত্যা করা হয় এবং ৫ নভেম্বর বন্দর নগরীর পাঁচলাইশে নির্বাচনী প্রচারণার সময় সারওয়ারকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীরা দেশে বিশৃঙ্খর চেষ্টা করলে কঠোরভাবে দমন করা হবে। সন্ত্রাসী টিটনের নিহত হওয়ার ঘটনায় অনেক তথ্যই পাওয়া যাচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বেশকিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’  

পুলিশসূত্র জানিয়েছে, একসময় ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করতেন শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান। ২০০৩ সালে মালিবাগে সানরাইজ হোটেলে ডিবি পুলিশের দুই সদস্যকে হত্যা করে জিসান বাহিনী। তারপর দেশের বাইরে চলে যান জিসান। ২০১২ সাল থেকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীদের দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছায়। ২০১৩ সালে ২৯ জুলাই রাতে যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খান মিল্কিকে হত্যা করা হয়। সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি যুবলীগের একটি পক্ষ এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল। টিটন নিহত হওয়ার পর গতকাল পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পুলিশের সব ইউনিটকে বলা হয়েছে সন্ত্রাসীদের খোঁজ করতে। তারপরও ঘাপটি মেরে থাকা সন্ত্রাসীরা বের হয়ে আসার চেষ্টা চালাচ্ছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা করছে পুলিশ। দেশের বাইরে থাকা সন্ত্রাসীরা নিজেদের সহযোগীদের মাধ্যমে নতুন করে আধিপত্য বিস্তারে নেমেছে। কারাগারে থাকা সন্ত্রাসীরা তাদের সহযোগীদের বার্তা দিচ্ছে। যারা বের হয়েছে তারাও নতুন মেরুকরণে নেমেছে। পুলিশ সদর দপ্তর সব ইউনিট, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার এসপিদের বিশেষ বার্তা দিয়েছে। ইন্টারপোলের সদর দপ্তরে আত্মগোপনে থাকা সন্ত্রাসীদের বিষয়ে নতুন করে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কারাগার কর্তৃপক্ষকেও হাজতি ও বন্দি সন্ত্রাসীদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (অপারেশন) রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমরা নানা কৌশল নিয়েছি। আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী ও অন্য অপরাধীদের ধরার চেষ্টা চলছে। সন্ত্রাসীদের বিষয়ে পুলিশের ইউনিটগুলোতে বিশেষ চিঠি পাঠানো হয়েছে। জামিনে মুক্ত অপরাধীদের ওপরও আমরা নজরদারি রাখছি।’

সরকারের গোয়েন্দাদের গোপন বার্তায় বলা হয়েছে, খুন, দখল, চাঁদাবাজি ও হামলার ঘটনায় সুব্রত বাইন, মোল্লা মাসুদ ও বিকাশের নাম আসছে। সুব্রত বাইনের ক্যাশিয়ার মন্টু পলাতক থাকলেও তার রাজত্বের হাল ধরেছেন সেকেন্ড ইন কমান্ড নাজমুল হক মাসুম ওরফে চান্দি মাসুম। তার অধীন মগবাজার বাটাগলির ঘরজামাই সুমন, শ্যামলী, হাতকাটা সুমন, বাপ্পি, সাজ, শরিফ চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও ফ্ল্যাটে অবৈধ দেহব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান সাম্রাজ্য কায়েম করেছেন গুলশানে ও বাড্ডায়। মাস ছয়েক আগে বিদেশে পালিয়ে যান কিলার আব্বাস ও তাজ। তারপরও তাদের সক্রিয়তা রয়েছে। দেশে বসেই ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করছেন জামিনে বের হওয়া আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী।

পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নব্বইয়ের দশকে ঢাকার অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ যে কজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর হাতে ছিল, তাদের অন্যতম ছিলেন সুব্রত বাইন। তার সেভেন স্টার গ্রুপের প্রতিপক্ষ ছিল যুবলীগ নেতা লিয়াকত ও মুরগি মিলনের নেতৃত্বাধীন ফাইভ স্টার গ্রুপ। সেভেন স্টার গ্রুপের হাতেই খুন হন মুরগি মিলন। ১৯৯১ সালে আগারগাঁওয়ে জাসদ ছাত্রলীগ নেতা মুরাদকে হত্যার মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসী হিসেবে সুব্রত বাইনের যাত্রা শুরু।’ ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘২০১২ সালের ৮ নভেম্বর সুড়ঙ্গ খুঁড়ে নেপালের কারাগার থেকে পালিয়ে ভারতে চলে যান। ওই বছরের ২৭ নভেম্বর কলকাতার বউবাজারের একটি বাসা থেকে সুব্রতকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২০১৫ সালের ১৯ জানুয়ারি কলকাতা পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম স্কোয়াড (এটিএস) মুর্শিদাবাদ থেকে মোল্লা মাসুদকে গ্রেপ্তার করে। হত্যা, নির্যাতন ও চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মের এক ডজন মামলার অভিযুক্ত আসামি ছিলেন মোল্লা মাসুদ।’

পুরস্কার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর মধ্যে ১১ জন বিদেশে আত্মগোপন করে আছে। তাদের বিষয়ে ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারি করা আছে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, ‘৫ আগস্ট পট পরিবর্তনের পর কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থেকে অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এদের আবার গ্রেপ্তার করতে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। না হলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখা সম্ভব হবে না।’