অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংস্কারের বাহানায় নির্বাচন না হওয়ার আশঙ্কায় সবকিছুতে আপস করেছেন বলে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচনের স্বার্থে আমরা অনেক কথা বলিনি। আমাদের একটা তাগাদা ছিল যে—এরা সংস্কারের বাহানায় যদি নির্বাচনটা না হতে দেয়, সে জন্য আমরা সবকিছুতে আপস করে জুলাই জাতীয় সনদেও স্বাক্ষর করেছি। আমরা একত্র হয়েছি, সমঝোতা হয়েছে।’ গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী বলেন, ‘যখন অবৈধ, অসাংবিধানিক, সংবিধানবহির্ভূত আদেশ রাষ্ট্রপতি জারি করলেন, আমরা স্ট্যান্ডিং কমিটি গুলশানে সংবাদ সম্মেলন করেছি। বলেছি যে—বিএনপি এবং যুগপৎ আন্দোলনে আমাদের সঙ্গে অন্য যাঁরা আছেন, তাঁরা আমরা কেউ জুলাই জাতীয় সনদের বাইরে অন্য কিছু মানতে রাজি নই। আমাদের একটা তাগাদা ছিল যে—এরা সংস্কারের বাহানায় যদি নির্বাচনটা না হতে দেয়, সে জন্য আমরা সবকিছুতে আপস করে জুলাই জাতীয় সনদেও স্বাক্ষর করেছি।’
বিরোধী দলকে উদ্দেশ্য করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, সংবিধান সংশোধন কমিটির জন্য নাম চেয়েও পাওয়া যায়নি, অথচ বাইরে সংস্কার পরিষদ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬-এ যখন কোনো গণভোট হয়নি, তখন কোন এখতিয়ারে ব্লু পেপারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ ফরম তৈরি করা হলো। এটি সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদের স্পষ্ট লঙ্ঘন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পদে পদে সংবিধান ভায়োলেশন করা হয়েছে।’
বিএনপি কখনও জুলাই সনদ থেকে বিচ্যুত হয়নি জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই জাতীয় সনদকে পাশ কাটিয়ে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের প্রক্রিয়া প্রতারণামূলক। জুলাই সনদের মূল দলিলের সঙ্গে বর্তমান কর্মকাণ্ডের কোনো মিল নেই। রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া এমন আদেশ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কীভাবে দেয়, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আসা এই সংসদকে অবজ্ঞা করে বাইরে ভিন্ন পন্থায় সংবিধান সংস্কারের চেষ্টা চলছে, যা দেশের আইনি কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, সাড়ে ৯ বছরের নির্বাসন ও বিদেশের জেলখানায় কাটানো সময়গুলো তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। ইলিয়াস আলীর মতো গুম হওয়া নেতাদের পরিবারের কষ্টের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, তাদের সন্তানরা আজও বাতায়ন খুলে পিতার জন্য অপেক্ষা করে। তাদের সেই অশ্রুর মর্যাদা দিতে হলে আমাদের এমন এক রাষ্ট্র গড়তে হবে যেখানে আর কোনো মানুষ গুম হবে না, কারও অধিকার হরণ করা হবে না।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আল শামস ও জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে যারা লড়াই করেছেন, তারাই বীর মুক্তিযোদ্ধা। এটি এখন সংসদীয় আইনে সাব্যস্ত। এই জাতীয় ইস্যু নিয়ে বারবার বিতর্ক সৃষ্টি করা জাতির জন্য সম্মানজনক নয়। যারা নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা দাবি করেন অথচ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে দ্বিধায় থাকেন, তাদের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ইতিহাসের আকাশে যারা তারা হয়ে আছেন, তাদের সম্মান রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ ও ২০২৬ এর ছাত্র গণঅভ্যুত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের ফসল। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্ববাসী বাংলাদেশের নির্বাচনকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং কোনো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রমাণ পায়নি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যারা এই বিজয়কে খাটো করতে চান, তারা আসলে শহীদদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। কোনো একক শক্তি নয়, বরং ছাত্র-জনতা ও রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত অংশগ্রহণে ফ্যাসিবাদ মুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ।
সংবিধান সংস্কার ও জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে ওঠা বিতর্কের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিএনপি কখনও জুলাই সনদ থেকে বিচ্যুত হয়নি; বরং কিছু দল নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করলেও বিএনপি বরাবরই জনগণের সার্বভৌমত্বের পক্ষে ছিল। জাতীয় সনদ নিয়ে কোনো প্রকার বিভ্রান্তি ছড়ানো থেকে বিরত থাকার জন্য তিনি বিরোধী দলীয় সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও আইনি অচলাবস্থা নিরসনে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর অধিকাংশ ধারা এখনও বিদ্যমান, যার কারণে সংবিধানে মহান আল্লাহর ওপর আস্থার বিষয়টি প্রতিফলিত হচ্ছে না। তিনি প্রশ্ন করেন, বিরোধী দল কি এখনও সেই বিতর্কিত সংশোধনীগুলোই বহাল রাখতে চায়? প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ এবং তাদের স্বার্থে একটি ভবিষ্যৎমুখী সংবিধান প্রণয়ন করতে হলে অবশ্যই সংসদীয় কমিটিতে আসতে হবে। বিএনপির ইতিহাসকে বহুদলীয় গণতন্ত্র ও সংসদীয় রাজনীতি প্রবর্তনের ইতিহাস হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বর্তমান গ্লোবাল অর্ডারের সাথে তাল মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা বাস্তবায়নের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাকস্বাধীনতার নামে চলা অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।