মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়

মহান মে দিবস প্রতি বছর ১ মে বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে। যা শ্রমিকের অধিকার, আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের প্রতীক। ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। এই আত্মত্যাগের স্মরণে বিশ্বজুড়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দিবসটি পালন করা হয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশে মে দিবস উপলক্ষে সরকারি ছুটি এবং শ্রমিক সংগঠনগুলো মিছিল-সমাবেশের মাধ্যমে দিনটি পালন করে। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা মে দিবসের মর্মবাণী। এবারের ২০২৬ সালের মে দিবস ও জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি দিবস উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে, যা শ্রমিকদের অধিকারের প্রতি নতুন অঙ্গীকার। এই দিবসটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শ্রমিকদের কঠোর পরিশ্রম ও আত্মত্যাগের ওপরই সভ্যতার ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে। জন হেনরি ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর এক কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান রেলওয়ে শ্রমিক। যিনি অসম্ভব শক্তিতে বিশাল হাতুড়ি চালিয়ে, পাথর ভাঙার কিংবদন্তি হয়ে আছেন। শিল্প বিপ্লবের যুগে যন্ত্রের (স্টিম ড্রিল) বিরুদ্ধে মানুষের পেশিশক্তির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য, তিনি নিজের জীবনের বিনিময়ে প্রতিযোগিতায় জিতেছিলেন। তার এই ত্যাগ, শ্রমিক শ্রেণির শৌর্য ও যান্ত্রিকীকরণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক।

আমেরিকার রেলপথ তৈরির সময়, হেনরি স্টিল ড্রাইভার হিসেবে কাজ করতেন। যেখানে হাতুড়ি দিয়ে ড্রিল গর্তে পাথর ভাঙা ছিল তার কাজ। যখন বাষ্পচালিত ড্রিল মানুষের চেয়ে দ্রুত কাজের দাবি করে, তখন জন হেনরি তার ১৪ পাউন্ডের হাতুড়ি নিয়ে যন্ত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেন। তিনি যন্ত্রের চেয়ে বেশি পাথর ভেঙে জয়ী হন বটে, কিন্তু প্রচ- পরিশ্রমে হার্ট ফেইল করে ঘটনাস্থলে মারা যান। এ প্রেক্ষাপটে বাংলায় হেমাঙ্গ বিশ্বাস রচিত ও ফকির আলমগীরের কণ্ঠে গাওয়া ‘নাম তার ছিল জন হেনরি’ গানটি মে দিবসের জনপ্রিয় শ্রমিক গান। হেনরির গল্পটি মানুষ বনাম যন্ত্রের লড়াই হিসেবে আজও বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়। আজ চারপাশের আরাম-আয়েশে গড়া জীবনরূপ ইঞ্জিনটা কি সুন্দর সিটি দিয়ে চলে যাচ্ছে, জন হেনরিদের অবস্থান সেখানে কোথায়? শুধু লড়াই-সংগ্রাম-প্রতিবাদের প্রেরণাদায়ী হিসাবে নয় জন হেনরি আমেরিকার কালো মানুষের কাছে অব্যক্ত বেদনার নাম, কালোদের ওপর শ্রমিকদের ওপর সাদা মালিকদের নির্যাতন-নিপীড়নের ইতিহাস ওই জন হেনরি। নেটে জন হেনরিকে নিয়ে বেশ প্রাচীন একটা লোকগান শুনলাম, ভাষা কিছু বুঝতে পারিনি শুধু প্রতি লাইনের শুরুতে ‘জন হেনরি’ ছাড়া। কিন্তু পুরো গানটা শুনলে মনে হয় একদল লোক যেন বিলাপ করছে, কী করুণ সেই বিলাপ যেন পিতা হারিয়েছে তার সন্তানকে, সন্তান মাকে বা বোন হারিয়েছে ভাইকে কিংবা কোন নারী হারিয়েছে তার প্রাণপ্রিয় স্বামীকে।

আমেরিকার সিভিল ওয়ারের পর, দেশজুড়ে পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হয়। একটি ধনী কোম্পানি চেজাপিক উপসাগর থেকে ওহিও উপত্যকা পর্যন্ত রেললাইন বসানোর কাজের তত্ত্বাবধানে ছিল। জন হেনরির কর্মস্থল- পশ্চিম ভার্জিনিয়ার টালকট শহর। রেললাইন বসানোর কাজ চলতে থাকে। একসময় সামনে পড়ে ‘বিগ-বেন্ড’ নামে এক পর্বত, যার পুরুত্ব প্রায় সোয়া এক মাইল। পর্বত কেটে সুড়ঙ্গ তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। প্রায় ১০০০ কালো শ্রমিকের সঙ্গে জন হেনরিও, সুড়ঙ্গ তৈরির কষ্টকর কাজে নামে। দিনে ১২-১৪ ঘণ্টা অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়। জন হেনরি ছিল স্টিল ড্রাইভিং ম্যান বা হ্যামার ম্যান। ইস্পাতের লম্বা শলাকার এক প্রান্ত, পাথরের ওপর ধরে থাকে একজন আরেকজন হাতুড়ি দিয়ে শলাকার অপরপ্রান্তে জোরে আঘাত করে। এই করে পাহাড় কাটতে থাকে। কিন্তু এতেও মন ভরে না ওই কোম্পানির, মন ভরে না সাদা সর্দারের। তার চাই আরও কাজ, আরও কাজ। আরও জলদি এবং কম লোকবলে যাতে মুনাফা হয় সর্বাধিক। এই সময় সাদা সর্দার নিয়ে আসে স্টিম ড্রিল, যেটা দিয়ে খুব সহজে পাহাড় কাটা সম্ভব হবে। অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠে শ্রমিকরা। এই বুঝি গেল তাদের চাকরি। কাজ হারালে, কাজ পাবে কোথায়? খাবে কি? প্রতিবাদ করে উঠে তারা। যন্ত্রকে মনে হয় সাক্ষাৎ শত্রু। তারা স্টিম ড্রিল ভেঙে ফেলতে উদ্যত হয়, যুদ্ধ ঘোষণা করে যার নিশ্চিত পরিণতি ছিল কালোদের ওপর আরও বেশি নির্যাতন। শ্রমিকদের সবচেয়ে শক্তিশালী, সবচেয়ে কর্মঠ জন হেনরি শ্রমিকদের যন্ত্র ভাঙার সেই যুদ্ধে বাধা দেয়। সে নিশ্চিত জানত, একটা যন্ত্র ভাঙলে সাদা প্রভু দশটা যন্ত্র আনবে, আর উল্টোদিকে তাদের কাজ তো যাবেই সঙ্গে জুটবে নির্যাতন। কিন্তু তাই বলে, জন হেনরি যুদ্ধ বন্ধ করে দেয়? না, তা-ও না। হেনরি সাদা প্রভুকে চ্যালেঞ্জ জানায়। যন্ত্রের চেয়েও মানুষের পেশি, অতিরিক্ত কাজ করতে সক্ষম। স্টিম ড্রিলের চেয়ে, অধিক গতিতে জন হেনরি পাহাড় কাটবে। সাদা সর্দার তো হেসে খুন। কিন্তু জন হেনরি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। স্টিম ড্রিলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে জন হেনরির হাতুড়ি। শর্ত থাকে সে যদি জিতে, তবে পুরো কাজে আর যন্ত্র ব্যবহার করতে পারবে না। শুরু হয় প্রতিযোগিতা! পাহাড়ে পাশাপাশি দুটো সুড়ঙ্গ কাটা শুরু হয়, একটি কাটে জন হেনরি আরেকটি স্টিম ড্রিল। জন হেনরি দুহাতে নেয় ইয়া বড় হাতুড়ি। হাতুড়িই হেনরির সম্বল। দিন-রাত পাহাড় কেটে যায়। হাতুড়ি চলতে থাকে অবিরাম। পাহাড়ের অপর দিকে জমা হয়, সহযোদ্ধা শ্রমিকরা। ঘরে শিশুসন্তানকে রেখে এসে শ্রমিকদের সঙ্গে দাঁড়ায় প্রাণ প্রিয় সঙ্গিনী মেরি ম্যাক ডিলেন। পাহাড়ের গায়ে তারা কান পাতে। কান পেতে হাতুড়ির শব্দ শোনার চেষ্টা করে। তাদের নেতা, প্রাণপ্রিয় মানুষ, ভবিষ্যৎ আশা-ভরসার স্থল জন হেনরি যে যুদ্ধ করছে, যন্ত্রের সঙ্গে মানুষের যুদ্ধ। তারা অপেক্ষা করতে থাকে সে কী উত্তেজনা, কে জিতবে! মানুষ কি পারবে, ওই ভয়ংকর যন্ত্রের সঙ্গে? অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকে তারা। অবশেষে অপর দিক থেকে একটা ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসে পাহাড়ের গায়ে ভালো করে কান পেতে শোনার চেষ্টা করে এটা জন হেনরির হাতুড়ির শব্দ, নাকি ওই দৈত্যরূপী স্টিম ড্রিলের? আশায় বুক বাঁধে, এটা হাতুড়ির শব্দ না হয়ে পারে না পরক্ষণেই আশঙ্কা এসে ভর করে যদি এটা স্টিম ড্রিল হয়? উৎকণ্ঠায় মেরি ম্যাক ডিলেনের শ্বাস-প্রশ্বাসটাও বন্ধ হওয়ার উপক্রম, কান পেতে নিবিষ্টভাবে শব্দ শোনার চেষ্টা করে।

অবশেষে সবার অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটে, পাহাড়ের দেয়ালটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে, সামনে দাঁড়িয়ে আছে তাদের জন হেনরি। উল্লাসে ফেটে পড়ে সবাই। যন্ত্রের সঙ্গে লড়াইয়ে মানুষ জিতেছে। কালো মানুষ জিতেছে, যন্ত্রের হারা মানে তো সাদা মানুষেরই হার! জন হেনরি কয়েক পা এগিয়ে এসে পেছনে পাহাড়টার দিকে তাকায়। একটা সুড়ঙ্গ চোখে পড়ে যে সুড়ঙ্গ দিয়ে সে বেরিয়ে এসেছে। বুঝতে পারে জয় হয়েছে কালো মানুষের, শ্রমিকের। হাত দুটো ওপরে তুলে উঁচিয়ে ধরে হাতুড়িটা। তারপরই মাটিতে পড়ে যায়। ছুটে আসে সঙ্গিনী মেরি ম্যাক ডেলিন। ছুটে আসে কালো শ্রমিক সহযোদ্ধারা। আর উঠে না জন হেনরি। এই হলো জন হেনরির গল্প। কতখানি সত্য? কতখানি মিথ্যা? এটা একাডেমিশিয়ানদের ইতিহাস নয়, এটা উপকথা আর উপকথা মানেই তো কল্পনার সংমিশ্রণ! এমনটাই আমাদের একাডেমিশিয়ানরা শিখিয়েছেন। মুখে মুখে লোকজন যেসব কিচ্ছা-কাহিনি, গল্পকথা-উপকথা বা রূপকথা তৈরি করে, সেগুলো আধেক সত্য আধেক কল্পনা, মানে মিথ্যা। ফলে জন হেনরির উপকথাও পুরো সত্য নয়, এখানেও কল্পনার মিশ্রণ আছে। কেননা এটা তো আর ইতিহাস নয়। এটা হচ্ছে আমেরিকান টল ফোকটেল। একাডেমিশিয়ানরা গবেষণা করছেন এই উপকথার কতখানি সত্য আর কতখানি কল্পনা। এটা একটা শোষণ-নির্যাতনের কাহিনি, একটা যুদ্ধের কাহিনি যে যুদ্ধে যন্ত্র ও মানুষ মুখোমুখি মুখোমুখি সাদা প্রভু ও কালো শ্রমিক এবং এটা একই সঙ্গে মানুষের জয়গাঁথাও বটে।

যারা ইতিহাস/উপকথার সত্য-মিথ্যা নিয়ে খুব ভাবিত তাদের বলতেই হয়, অভিজাতদের রচিত ইতিহাসটাই বরং মিথ্যায় ভরা নিজ গোত্রীয়দের চাটুকারিতায় ঠাসা; যারা এই উপকথার সত্যতা নিয়ে সন্দেহ তুলতে চান তাদেরও বলা যায়, কালোর ওপর শ্রমিকদের ওপর সাদাদের, মালিকদের অত্যাচারের ঘটনা সত্য। অতি মুনাফার লোভে মানুষের পেটে লাথি মারার ঘটনা সত্য, তেমনি এর বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রামটাও জ¦লজ¦লে সত্য। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগ সন্ধিক্ষণে ‘ম্যান অ্যান্ড মেশিনের’ মধ্যে অস্তিত্বেও লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছে। রবোটিক্স, মানুষের কাজ করে দেওয়ার সহায়ক শক্তি নয় এখন সে রীতিমতো প্রতিদ্বন্দ্বী। একদিন দেখা যাবে, মানুষকে রান আউট করে তাকে সাজ ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স ইতিমধ্যে মানুষের সুকুমার বৃত্তি বিকাশের বিপরীতে, কখনো অন্তরায় কখনো পরিপূরক হিসেবে সদর্পে এগিয়ে চলছে। ফ্লোরিডায় দুই বাংলাদেশি গবেষকের মর্মান্তিক হত্যার মোটিফ উদ্ধারে গিয়ে চ্যাটজিপিটিকে অন্যতম কনসালট্যান্ট বা হুকুমের আসামি সাব্যস্তকরণের সম্ভাবনা উঠে আসছে। ভাইরালের ভাইরাস ইতিমধ্যে জেন জির ইমিউন ক্ষমতা হ্রাস করতে শুরু করেছে। ঠিক এ ধরনের পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে মে দিবসের মানবিক মূল্যবোধ, শক্তি, সামর্থ্য, প্রেরণা ও প্রত্যয় নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। হেনরির হাতুড়ি চিপস পিন পাসওয়ার্ডের কাছে, খাস খতিয়ানে নামজারির মামলায় আটকে যাচ্ছে।

লেখক: অনুচিন্তক ও সমাজ গবেষক

mazid.muhammad@gmail.com