বিদায় হে মায়েস্তা

কার কাজের ছায়ার সঙ্গে আপনার সব থেকে বেশি দেখা হবে আপনি যখন ক্লাসরুমে প্রবেশ করবেন? বিশেষ করে আপনি যদি ভারতীয় উপমহাদেশের কোনো বিদ্যায়তনে ‘আলোকচিত্র’ পড়ানোর চেষ্টা করবেন? এই প্রশ্ন শিক্ষক হিসেবে বারবার আপনাকে মোকাবিলা করতে হবে। কেন সালগাদো এবং রঘু রাই শেষ পর্যন্ত এত প্রভাব বিস্তার করলেন? কেন এত দীর্ঘ সময় আপনি শিক্ষক হিসেবে শুধু ছাত্রদের অনুরোধে এবং প্রয়োজনে রঘু রাইকে ব্যাখ্যা করতে বাধ্য হন, সেটা আপনি নিজে চান বা না চান।

কেনই বা তিনি আমাদের অতীতের, বর্তমানের এবং ধারণা করি ভবিষ্যতের একটা বড় অংশ জুড়ে প্রভাবশালী হয়ে থাকবেন? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের খুঁজতেই হবে।

রঘু রাই অনেকটাই রবীন্দ্রনাথের মতো। অনেকটাই। সর্বব্যাপী, নীরব, আগ্রাসী, মৌন, অপ্রতিরোধ্য, সবচাইতে অবিশ্বাস্য এবং মানুষের প্রতিভা যেখানে শেষ হয় আর শুরু হয় অতিমানবীয় প্রতিভার—রঘু রাইয়ের বাসা আসমানের সেই দরজায়। যে বাসা দেখতে হয় দূর থেকে ঘাড় উঁচিয়ে মুগ্ধ হয়ে।

ভারতীয় জাতীয়তাবাদের—যা বহুলাংশে হিন্দু জাতীয়তাবাদের শ্রেষ্ঠ প্রকাশ—রঘু সেই ধারার শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ। রঘু রাই শেষ পর্যন্ত একজন আনঅ্যাপোলজেটিক ইন্ডিয়ান।

প্রায় সবক্ষেত্রেই ভারতীয় উপমহাদেশে আপনি যদি আলোকচিত্রী হয়ে উঠতে চান তখন ধারণা করা যায় আপনি উঠে আসবেন নিম্ন মধ্যবিত্ত অথবা মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে। হীনম্মন্যতায় পূর্ণ, আত্মপরিচয়ের সংকটে মাথা নিচু করা, দুইশ বছরের উপনিবেশ আর দশকের পর দশক ধরে চলা গণতন্ত্র নামক এক মশকরার সমাজ থেকে। বাংলাদেশি, পাকিস্তানি কিংবা ভারতীয়—আপনি যাই হোন না কেন, আপনার নিজের দেশের জাতীয় দারিদ্র্য আপনাকে একটা হীনম্মন্যতার মধ্যে ফেলে দিতে বাধ্য। ফ্রানৎস ফাঁনো যাকে বলছেন উপনিবেশবাদের একটা শক্তি কাঠামো। যা আপনার অজান্তে উপনিবেশোত্তর সমাজেও পশ্চিম, পুঁজিবাদ আর সাদা চামড়াদের নিজেদের থেকে উন্নত ভাবতে বাধ্য করবে।

রঘু আর তার দেখা ভারত; শেষ পর্যন্ত ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে জিতিয়ে দেয়—আপনাকে বহুলাংশে মুক্তি দেয় হীনম্মন্যতা থেকে। কিন্তু বিপদটা অন্যদিকে। রঘুর দেখা গরিবরা কেন গরিব এই প্রশ্ন আপনার মনে তেমন জাগেই না। রঘু আপনাকে সবসময় মুগ্ধ করবেন, আপনি বিপুল বিস্ময়ে রঘুর দেখার চোখকে ঈর্ষা করবেন, আপনারও কেন তেমন চোখ নেই তা ভেবে আফসোস করবেন আর জানতে চাইলে রঘু হেসে আপনাকে ঈশ্বরের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। তিনি বলবেন, এই ছবি তিনি শুধু একা তোলেন নাই, এই ছবি তার ওপর আদিষ্ট হয়েছে।

এইখানেই রঘুকে আলাদা মনে হয়, ভারতীয় ইতিহাসের সন্তান হওয়ার থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন একক প্রতিভা মনে হয়, মনে হয় তিনি একাই এমন করে দেখেন।

কিন্তু তিনি যে ধারার আলোকচিত্রী, মূলত যা ম্যাগনাম এজেন্সি কেন্দ্রিক—রঘু শেষ পর্যন্ত সেই ধারারই সন্তান। রঘু ভারতের বাইরে প্রায় কাজই করেননি। যে সমাজ তার না, তিনি সেই সমাজকে দেখতে বা জানতে প্রায় চানই নাই। লালনের সুযোগ থাকলেও কি তিনি দেশত্যাগ করতেন? উত্তর—না। রঘুও তাই—যেমন করে আমাদের এস এম সুলতানের জন্যও উত্তরটা—না।

যা ভারতীয় হওয়ার জন্য ভারতীয়দের গর্বিত করে তোলে, রঘু শুধু তারই ছবি তোলেন। কিন্তু কার্পেটের নিচে লুকিয়ে থাকা প্রবল সাম্প্রদায়িক লক্ষ নিহত, কাশ্মীরের স্বাধীন হতে চাওয়া সব রক্তের লড়াই, মেরে খুন করে দেওয়া সব মাওবাদীদের বয়ে নেওয়া রক্তস্রোতকে— রঘুকে প্রায় আমরা দেখতেই দেখি না। তিনি কি লুকাতে চেয়েছিলেন এসব লজ্জা? আর তার বিনিময়ে ভারতীয় শাসক শ্রেণির এত স্বজন তিনি হয়ে উঠেছিলেন? প্রশ্ন করতে পারি, কিন্তু উত্তর জানার আগেই তিনি চলে গেলেন। আমাদের সময়ের শ্রেষ্ঠতম আলোকচিত্রীর বিদায় যতটা বেদনার জন্ম দিয়ে আমাদের ভারাক্রান্ত করল, ইতিহাসের এক পর্বে তার ‘অন্য ভারতের’ না বলা কাজের শূন্যতা নিয়েও একদিন প্রবল প্রশ্ন উঠবে।

রঘুর কলকাতার সিরিজ দেখে বোঝা যায় তিনি ঠিক কত বড় ক্যানভাসে জীবনকে দেখতে পেয়েছিলেন। রঘুর কাজ গঙ্গার মতো বহমান, ক্ষুদ্র মানুষের তার থেকেও ক্ষুদ্র যে জীবন—রঘুর ক্যামেরায় তাই লাইফ সাইজ হয়ে ওঠে। রঘুর কাজ তাই আমাদের জাদুর কথা মনে করিয়ে দেয়। রঘু যা দেখেন, কেউ তা দেখেন না। রঘু যত বড় ক্যানভাসে জীবনকে উদযাপন করেন তার ধারে কাছেও আর কেউ নেই।

রঘুর সবচাইতে রাজনৈতিক কাজ ইন্দিরা গান্ধী। আপনাকে এই কাজ মনে করিয়ে দেবে এক অসামান্য প্রধানমন্ত্রীর একক লড়াইয়ের গল্প। পুরুষের দুনিয়ায় দাপট আর দাপিয়ে বেড়ানো শিরদাঁড়া শক্ত করে দাঁড়ানো এক লৌহমানবীর কথা। এই ন্যারেটিভ আপনাকে মাথা নিচু করতে বাধ্য করবে।

কিন্তু ইন্দিরার আস্তিনের নিচে লুকিয়ে থাকা খঞ্জরকে আপনি দেখতে পাবেন? কলকাতার রাস্তার ‘অমলেশ’দের সবার সামনে মধ্যরাতে নকশাল হওয়ার অপরাধে গুলি করে মেরে ফেলার রক্তস্রোত কি আপনি দেখতে পাবেন? জরুরি অবস্থা ঘোষণার মধ্য দিয়ে লৌহশাসন কায়েম করার নির্মমতা—না আপনি কিছুই দেখতে পাবেন না।

যারা ভাবেন আলোকচিত্রীরা শুধু দেখায় তারা অর্ধেকটা ভাবেন। আলোকচিত্রের কাজ আড়াল করাও বটে। একজন বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে আমাদের আজানু কৃতজ্ঞতা তার ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কাজের জন্য। আমাদের মহত্তম আত্মত্যাগের অবিশ্বাস্য দলিল সময়ের সেরা মানুষটার হাত দিয়েই রচিত হয়েছিল। একটি জাতিকে কী মূল্য চোকাতে হয়েছিল আর কেমন করে শহীদ হয়েছিল ত্রিশ লাখ মানুষ তার এক অসামান্য দলিল এই কাজ। ভারতীয় শরণার্থী শিবিরের সেই অমানবিক জীবন এত মমতা নিয়ে কে কবে দেখেছিলেন! কেউ না।

কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার ৫৪ বছর পর, রঘু রাইয়ের মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিন বাদে গভীর আফসোস নিয়ে ভাবছি, কী দারুণ হতো তিনি যদি আর দু’পা এগিয়ে আসল যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করতেন! শ্রমিক, মধ্যবিত্ত, কৃষকের মরণপণ আর দাঁতে দাঁত কামড়ে লড়ে যাওয়ার ছবিটা তুলতেন। কেমন করে তারা শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করেছিল—তা আর তার দেখা হলো না। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে এমবেডেড থাকার বাস্তবতায় তার সে সুযোগও ছিল না।

মুক্তিযুদ্ধের অর্ধেকটা তিনি না দেখে আর না দেখিয়েই আমাদের কাঁদিয়ে চলে গেলেন।

উপনিবেশবাদ কেমন করে টিকে থাকে? সশরীরে অধিকৃত দেশত্যাগের পরও? ফাঁনো বলছেন, রাজনৈতিক এবং ভৌগোলিক স্বাধীনতার পর তার উপনিবেশবাদ টিকে থাকে ভাষাগত, মনস্তাত্ত্বিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে, যা তার পূর্বতন কলোনির দাসত্বকে দীর্ঘায়িত করে।

মাদার টেরেসা যিনি বুর্জোয়া এবং পোস্ট কলোনিয়াল দুনিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানুষ, এমন এক কাঠামোকে উপস্থাপন করে। রঘুর কাজ আমাদের মাদারকে ভালোবাসতে শেখায়। কিন্তু মাদারের—ভারতে আগমনের মানবিকতার পেছনের ইতিহাস এবং রাজনৈতিক কার্যকারণ আমাদের ভুলিয়ে দেয় বৈকি।

স্বভাবের অর্থে রঘুর কাজ মহাকাব্যিক, প্রসারের দিক থেকে সময়োত্তীর্ণ আর তার ক্ষুদ্র মানুষেরা প্রায় ক্ষেত্রেই অতিমানবিক। রঘুর মানুষেরা অর্থের দিক থেকে দরিদ্র হলেও জীবনের দিক থেকে দারুণ ধনী আর আনন্দময়। রঘু মানেই জাদু।

রঘুর ছবি একটা মঞ্চনাটকের মঞ্চের মতো—যেখানে সবকিছু একসঙ্গে ঘটে। এমনভাবে ঘটে যেমন ঈশ্বরই এই নাটকের নির্দেশক—সবকিছু সমতলে, সব এলিমেন্ট যার যার জায়গায় একদম পারফেক্ট টাইমিং অ্যান্ড কম্পোজিশন, একদম পারফেক্ট। আর আলোর দুনিয়া তৈরি করে এক মায়ার দুনিয়া।

রঘু চলে গেলেন। আমাদের সময়ের সবচাইতে বড় বৃক্ষের মৃত্যু হলো। বটবৃক্ষের একদিন মৃত্যু হয় বটে, তবে বটবৃক্ষের নিচে ছোট গাছের জন্ম হয় না—এটাও ঠিক।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যজিৎ রায়, রঘু রাই।

বৃদ্ধ বয়সে জালিয়ানওয়ালাবাগের পরে রবিবাবু শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দিলেন তার ‘নাইটহুড’। নকশাল বাড়ির প্রবল আঁচে ভেঙে পড়া সমাজের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ‘মহানগরে’ রেগে উঠতে বাধ্য হলেন সত্যজিৎ। রঘুও রেগেছিলেন। ভীষণভাবে! হয়তো একবারই। ভূপাল ট্র্যাজেডির অসামান্য দলিল তিনি নির্মাণ করলেন। আমেরিকান ইউনিয়ন কার্বাইড করপোরেশনের অধীনে ঘটা ভূপাল ট্র্যাজেডি আজও ভারতসহ সারা দুনিয়াকে মনে করিয়ে দেয় করপোরেট লোভের সামনে মানুষের অসহায়ত্বের কথা।

রঘু চলে গেলেন। ইতিহাসের একটা পর্ব শেষ হলো। নিজে একজন আলোকচিত্রী হিসেবে বলতে পারি, সম্ভবত ঠিক এমনই বোধ হয়েছিল বাংলা সাহিত্যের সকলের—রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর।

কী সকরুণ নিদারুণ শূন্যতা! রঘু একজনই। আর কেউ রঘু হবে না, কারণ রঘুকে নকল করা যায় মাত্র, কিন্তু তার ছায়াও হয়ে ওঠা যায় না।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আলোকচিত্রী সমাজের পক্ষ থেকে আমার টুপি খোলা অভিবাদন গ্রহণ করুন হে মায়েস্তো!