পরকালে জবাবদিহির ভয় না থাকলে অন্যায় বাড়ে

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বারবার ন্যায়বিচারের নির্দেশ দিয়েছেন এবং জুলুমের পরিণাম সম্পর্কে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। জুলুম বা অন্যায়ভাবে কারও অধিকার হরণ করা এমন এক অপরাধ, যা কেবল ব্যক্তির ক্ষতি করে না, বরং পুরো সমাজকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দেয়। ইসলামের সোনালি ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যখনই শাসকরা ইনসাফের নীতিতে অটল ছিলেন, তখনই তারা বিশ্বজুড়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন। বিপরীতে দম্ভ ও ক্ষমতার অপব্যবহার যুগে যুগে শক্তিশালী সাম্রাজ্যকেও ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। বর্তমান সময়ের অস্থিরতা ও বৈষম্য দূর করতে হলে ইসলামের এই দর্শনের প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। যদি মানুষের ভেতরে পরকালের জবাবদিহির ভয় না থাকে, তাহলে জুলুম ও অন্যায়-অনাচার বেড়ে যায়।

 ইনসাফ মানে কারও হক আদায় করে দেওয়া, জুলুম মানে সেই হক হরণ করে নেওয়া। কোনো দায়িত্বে অযোগ্য ব্যক্তিকে বসানো যেমন জুলুম, তেমনি প্রাপ্যকে বঞ্চিত করাও জুলুম। ইসলাম এই জুলুমকে কেবল ব্যক্তি নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যও ধ্বংসাত্মক বিবেচনা করে। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘জুলুম কেয়ামতের দিন গাঢ় অন্ধকার রূপ ধারণ করবে।’ (সহিহ বুখারি)

আজকের সমাজে যখন একের পর এক অন্যায়, দুর্নীতি ও নির্যাতনের খবর আমরা শুনি, তখন ইসলামের ইনসাফের দর্শনই হতে পারে মুক্তির পথ। ইসলাম কেবল বিচারককে নয়, প্রত্যেক ব্যক্তিকেই ইনসাফের প্রতি দায়বদ্ধ করেছে। স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, আমলা, সবার জন্য ইনসাফ একটি ফরজ দায়িত্ব। ইসলামি সভ্যতা ইনসাফের ভিত্তিতে নির্মিত হয়েছিল বলেই তা হয়ে উঠেছিল বিশ্বমানবতার আদর্শ। যখন মুসলিম শাসকরা ইনসাফে ছিলেন দৃঢ়, তখন তারা বিশে^র নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু যখন এই ইনসাফ-চেতনা থেকে বিচ্যুতি ঘটেছে, তখনই মুসলিম উম্মাহ দুর্বল হয়েছে, সাম্রাজ্য বিলীন হয়েছে। তাই আজ প্রয়োজন নতুনভাবে ইনসাফকে জীবনের প্রতিটি স্তরে বাস্তবায়ন করা।

 ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলাম শব্দের অর্থই শান্তি। ইসলামের মূল উদ্দেশ্যই হলো শান্তির সমাজ গড়ে তোলা। তবে শান্তি কেবল শব্দে নয়, শান্তি চাই বাস্তবতায়, যা অর্জিত হয় ন্যায়বিচারের মাধ্যমে। আর ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয় যখন জুলুমের কোনো প্রলেপ সমাজে না থাকে। ইসলামের প্রারম্ভ থেকে কোরআন-সুন্নাহের প্রতিটি স্তরে যে বাণী বারবার উচ্চারিত হয়েছে, তা হলো ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং জুলুম প্রতিরোধ। কারণ জুলুম মানেই শৃঙ্খলার অবসান, ন্যায়বিচারের ধ্বংস আর শান্তির কফিনে শেষ পেরেক। নবী-রাসুলরা এসেছেন এই ইনসাফের দাওয়াত নিয়ে এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে সেই দাওয়াত বাস্তবায়নের সংগ্রামে তারা হয়েছেন অতুলনীয় সাহসী। কিন্তু আজকের সমাজে যখন বৈষম্য বাড়ছে, নির্যাতন বাড়ছে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার যেন নিত্যদিনের চিত্র, তখন এ ক্ষেত্রে ইনসাফের আহ্বান সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। এ ক্ষেত্রে কোরআনের সেই আয়াতগুলো বারবার মনে পড়ে, যেখানে বলা হয়েছে, ‘আমি ধ্বংস করেছি কত জনপদ, যেগুলোর বাসিন্দারা ছিল জালেম।’ (সুরা হজ ৪৫)

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার