পরকালে আপনজন থেকে পালাবে মানুষ

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০২:১৯ এএম

কেয়ামতের পর মানুষের সার্বিক পরিস্থিতি হবে অত্যন্ত কঠিন। তখন পৃথিবীর পরিচিত দৃশ্য থাকবে না। থাকবে না নিরাপদ আশ্রয়। থাকবে না দুনিয়ার মতো নির্ভরতার জায়গা। মানুষ ব্যস্ত থাকবে নিজের পরিণতি নিয়ে। দুনিয়ায় যে ভাইকে সবচেয়ে আপন মনে করেছে, তার কাছ থেকেও দূরে সরে যাবে। যে মায়ের আঁচলে আশ্রয় নিয়েছে, সেদিন তার কথাও মনে থাকবে না। যে বাবার ছায়ায় বড় হয়েছে, তাকেও এড়িয়ে চলবে। এমনকি স্ত্রী-সন্তান থেকেও মানুষ পালাবে। কারণ সেদিনের ভয় হবে এতটাই তীব্র।

কোরআন মানুষের কাছে সেই দিনের স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘সেদিন মানুষ পালাবে তার ভাই থেকে, তার মা-বাবা থেকে, তার স্ত্রী-সন্তানদের থেকে। সেদিন প্রত্যেক মানুষের এমন অবস্থা হবে, যা তাকে অন্যের চিন্তা থেকে সম্পূর্ণ অমনোযোগী করে রাখবে।’ (সুরা আবাসা ৩৪-৩৭) এই আয়াতগুলো মানুষের হৃদয় কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো।

কেয়ামতের ভয়াবহতা : কেয়ামতের দিন হবে অত্যন্ত আতঙ্কের দিন। মানুষ জানবে, তার সামনে রয়েছে আল্লাহর চূড়ান্ত হিসাব। পৃথিবীতে কেউ হয়তো নিজের পরিচয়, সম্পদ কিংবা ক্ষমতা দিয়ে অনেক কিছু আড়াল করতে পেরেছে। কিন্তু সেদিন কোনো কিছুই গোপন থাকবে না।

উল্লিখিত আয়াতে মানুষের মানসিক অবস্থার গভীর একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সাধারণ সময়ে বিপদে পড়লে মানুষ আপনজনকে খোঁজে। তাদের সাহায্য চায়। কিন্তু কেয়ামতের ভয় মানুষকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করবে যে, সে নিজের পরিণতি ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারবে না।

ভাই থেকে ভাই পালাবে : ভাই মানুষের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কগুলোর একটি। একই পরিবারে বেড়ে ওঠা। সুখে দুঃখে পাশে থাকা। শৈশবের অসংখ্য স্মৃতি ভাগ করে নেওয়া। কিন্তু কেয়ামতের দিন সেই সম্পর্কও মানুষের চিন্তা থেকে মুছে যাবে। এর অর্থ এই নয় যে, মানুষের মধ্যে ভালোবাসা থাকবে না। বরং সেদিনের ভয় ও জবাবদিহির গুরুত্ব এত বেশি হবে যে, প্রত্যেকেই নিজের অবস্থান নিয়ে ব্যস্ত থাকবে।

ভিন্ন বাস্তবতায় মা-বাবার সম্পর্ক : মা-বাবার প্রতি মানুষের ভালোবাসা স্বাভাবিক ও গভীর। ইসলামও তাদের মর্যাদা দিয়েছে। কোরআন বাবা-মায়ের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু কেয়ামতের দিন প্রত্যেক মানুষকে নিজের আমলের হিসাব দিতে হবে। সেদিন মা সন্তানকে রক্ষা করতে পারবেন না, বাবা সন্তানকে বাঁচাতে পারবেন না। কেউ কারও পক্ষ থেকে আল্লাহর কাছে দায়মুক্তি অর্জন করতে পারবে না। আল্লাহ বলেন, ‘সেদিন কোনো ব্যক্তি কোনো ব্যক্তির জন্য কিছু করার ক্ষমতা রাখবে না। সেদিন সব কর্র্তৃত্ব হবে আল্লাহর।’ (সুরা ইনফিতার ১৯)

এটি মানুষের জন্য বড় শিক্ষা। দুনিয়ায় আমরা যাদের ওপর নির্ভর করি, তারা আমাদের ভালোবাসতে পারেন। সাহায্য করতে পারেন। কিন্তু পরকালে মহান আল্লাহর বিচারের সময় প্রত্যেকেই নিজ নিজ কাজের হিসাব দিতে বাধ্য থাকবে।

স্ত্রী-সন্তান থেকে পালাবে মানুষ : দাম্পত্য ও সন্তান মানুষের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় সম্পর্কগুলোর মধ্যে অন্যতম। মানুষ তাদের জন্য পরিশ্রম করে। ভবিষ্যৎ গড়ে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। কিন্তু কেয়ামতের দিন পরিস্থিতি হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেদিন প্রত্যেক মানুষ নিজের মুক্তি নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। নিজের আমলনামা সামনে থাকবে। নিজের জীবনের প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হবে। দুনিয়ার সম্পর্ক তখনও থাকবে। কিন্তু সেই সম্পর্ক কাউকে আল্লাহর বিচার থেকে রক্ষা করতে পারবে না।

কেউ কারও বোঝা বহন করবে না : ইসলামের একটি মৌলিক শিক্ষা হলো, প্রত্যেক মানুষ নিজের কাজের জন্য দায়ী। অন্যের অপরাধের বোঝা কেউ বহন করবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘কোনো বোঝাবহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।’ (সুরা ফাতির ১৮)

এই শিক্ষা মানুষকে দায়িত্বশীল করে। নিজের ভুলের দায় অন্যের ওপর চাপানোর সুযোগ নেই। পরিবার, সমাজ কিংবা পরিস্থিতিকে অজুহাত বানিয়ে মানুষ নিজের দায়িত্ব থেকে মুক্ত হতে পারে না।

তাই একজন মুসলিমের উচিত, নিজের আমল সম্পর্কে সচেতন হওয়া। নামাজ, রোজা, জাকাত, হজ, মানুষের অধিকার, লেনদেন, চরিত্র এবং জীবনের প্রতিটি কাজের ব্যাপারে সতর্ক থাকা।

আপনজনকে ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ : আখেরাতে আপনজন থেকে দূরে সরে যাওয়ার কথা শুনে কেউ যেন মনে না করে যে, ইসলাম পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে বলেছে। বরং ইসলাম পরিবারকে ভালোবাসতে বলেছে। তাদের অধিকার আদায় করতে বলেছে। তাদের জন্য দোয়া করতে বলেছে। তবে সেই ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর রূপ হলো, আপনজনকে আখেরাতের জন্য প্রস্তুত করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার জ্বালানি মানুষ ও পাথর।’ (সুরা তাহরিম ৬)

অর্থাৎ পরিবারকে শুধু দুনিয়ার জীবনের জন্য প্রস্তুত করাই যথেষ্ট নয়। তাদের ইমান, আমল ও চরিত্র গঠনের দিকেও নজর দিতে হবে। সন্তানের জন্য সম্পদ রেখে যাওয়ার পাশাপাশি ইমানি পরিবেশ রেখে যাওয়াও জরুরি। স্ত্রীকে দুনিয়ার স্বাচ্ছন্দ্য দেওয়ার পাশাপাশি দ্বীনের পথে সহযোগিতা করা জরুরি। বাবা-মায়ের সেবা করার পাশাপাশি তাদের জন্য দোয়া করা জরুরি।

দুনিয়ার সম্পর্ক পরকালেও উপকারে আসে : কেয়ামতের দিনের ভয়াবহতা যেমন সত্য, তেমনি মুমিনদের জন্য মহান আল্লাহর রহমতও সত্য। দুনিয়ায় যারা ইমান ও নেক আমলের ওপর জীবন গড়ে, মহান আল্লাহ তাদের জন্য আখেরাতে সম্মানজনক পরিণতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাই পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ককে আল্লাহর আনুগত্যের পথে ব্যবহার করতে হবে। একে অপরকে নামাজের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে হবে। গুনাহ থেকে বিরত রাখতে হবে। হালাল জীবনের প্রতি উৎসাহ দিতে হবে। বিপদে ধৈর্য ধরতে সাহায্য করতে হবে। এভাবে গড়ে ওঠা পরিবার দুনিয়ায় যেমন সুখী হবে তেমনি আখেরাতে সফল হবে।

আজকের প্রস্তুতিই আগামীর নিরাপত্তা : কেয়ামতের দিন মানুষ আপনজন থেকে দূরে সরে যাবে। কিন্তু সেই দিনের ভয় থেকে বাঁচার প্রস্তুতি নিতে হবে আজই। আজ হাতে সময় আছে। তওবার সুযোগ আছে। নামাজের সুযোগ আছে। নেক আমলের সুযোগ আছে। মানুষের অধিকার আদায়ের সুযোগ আছে। ভুল সংশোধনের সুযোগ আছে। মৃত্যুর পর এসব সুযোগ থাকবে না। তাই দুনিয়ার ভালোবাসাকে আখেরাতের প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। নিজের জন্য নেক আমল করতে হবে। পরিবারকেও নেক আমলের পরিবেশ দিতে হবে। যে পরিবার মহান আল্লাহর আনুগত্যে একে অপরকে সহযোগিতা করে, তাদের সম্পর্কের মূল্য দুনিয়ার সীমা ছাড়িয়ে যায়।

চূড়ান্ত সফলতা : মহান আল্লাহ কেয়ামতের দিন মানুষের দুই ধরনের পরিণতির কথা বলেছেন। কিছু মুখ সেদিন উজ্জ্বল থাকবে। তারা হবে হাস্যোজ্জ্বল ও আনন্দিত। আর কিছু মুখে থাকবে ধুলো ও কালিমা। তারা অবিশ্বাস ও পাপের কারণে অপমানিত হবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘সেদিন কিছু মুখ হবে উজ্জ্বল, হাস্যোজ্জ্বল ও আনন্দিত। আর কিছু মুখ হবে ধূলিধূসর। সেগুলোকে আচ্ছন্ন করবে কালিমা।’ (সুরা আবাসা ৩৮-৪১)

অতএব কেয়ামতের দিন কে কার পাশে থাকবে, সেটিই একমাত্র প্রশ্ন নয়। আসল প্রশ্ন হলো, আমি কোন পরিণতির জন্য প্রস্তুত হচ্ছি?

দুনিয়ায় আপনজন আমাদের ভালোবাসে। আমাদের পাশে থাকে। কিন্তু আখেরাতের চূড়ান্ত বিচারে প্রত্যেক মানুষ নিজের আমল নিয়ে দাঁড়াবে। সেদিন আত্মীয়তার পরিচয় নয়, আল্লাহর প্রতি ইমান ও নেক আমলই হবে মানুষের আসল সম্বল।

তাই পরিবারকে ভালোবাসতে হবে। তাদের অধিকার আদায় করতে হবে। তাদের জন্য দোয়া করতে হবে। একই সঙ্গে নিজেদের এবং আপনজনদের আখেরাতের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। কারণ দুনিয়ার বিচ্ছেদ সাময়িক। কিন্তু আখেরাতের পরিণতি চূড়ান্ত।

লেখক : ইসলামি গবেষক ও প্রবন্ধকার

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত