দুঃসাহসী শাকিলের হার না মানা অভিযান

এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণ করে নিরাপদে বেসক্যাম্পে নেমে আসা সর্বশেষ বাংলাদেশি ইকরামুল হাসান শাকিল। তিনি একমাত্র ব্যক্তি, যিনি গ্রেট হিমালয় ট্রেইল ও সি টু সামিট সম্পন্ন করেছেন। দুঃসাহসী এই তরুণের সাফল্যের মূলে রয়েছে ব্যতিক্রমী কিছু করার ইচ্ছা আর হার না মানার মানসিকতা। উদয়কাঠীর পাঠকের সামনে অকপটে তুলে ধরেছেন তিনি তার এই জীবনদর্শন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এনাম-উজ-জামান

ছোটবেলা থেকেই কি পর্বতারোহী হতে চেয়েছিলেন?

আমি ছোটবেলায় পর্বতারোহী হতে চেয়েছি এমনটা না। আমার শৈশব কেটেছে গ্রামে। শৈশব কেটেছে দুরন্তপনায়। সেই বৃষ্টিতে ভেজা, রোদে শুকানো, সারা দিন খেলাধুলা করা। যেহেতু আমি কৃষক পরিবারের সন্তান, বাবার সঙ্গে জমিতে কাজ করতে হয়েছে। সব মিলিয়ে আমার দুরন্ত এক শৈশব কেটেছে। তখন হতে চেয়েছিলাম সাপুড়ে। বাড়ির পাশ থেকে কোদাল দিয়ে কেঁচো খুঁড়ে খুঁড়ে নিয়ে আসতাম। সে জন্য মা পিটুনি দিত। তারপর যখন একটু বুঝতে শিখলাম তখন হতে চাইলাম গ্রামপুলিশ। কারণ ছোটবেলা থেকেই আমি চাইতাম, যদি দশজন বন্ধু বসে আছি বা দশজন মানুষ বসে আছি সবার লক্ষ্যে যেন আমার দিকেই থাকে। গ্রামে দেখতাম বিচার সালিশ যা-ই হোক না কেন, গ্রামপুলিশের বেশ একটা ক্ষমতা। সে জন্য আমি গ্রামপুলিশ হতে চেয়েছিলাম। তারপর সেটাও হতে পারলাম না। তারপর মনে হলো কাঠমিস্ত্রি হবো। কাঠমিস্ত্রি কি সুন্দর সুন্দর ডিজাইন করছে। সেটাও হলো না। আস্তে আস্তে বড় হয়ে গেলাম। খেলাধুলার প্রতি আমার আগ্রহ ছিল। ফুটবল, ক্রিকেট এগুলো ইন্টার স্কুলে খেলেছি। আমি যখন ঢাকায় চলে আসি পড়াশোনার জন্য তখন থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হই। ততদিনে বাংলাদেশের এভারেস্ট আরোহণ হয়ে গেছে। সেটা নিয়ে চারদিকে খুব শোরগোল পড়ে গেল। মুহিত ভাই আর নিশাত আপুও এভারেস্টে আরোহণ করলেন ২০১২ সালে। তাদের ইন্টারভিউ যখন দেখছিলাম, তাদের বলতে শুনলাম, পর্বতারোহণটা একটা স্পোর্টস। এর আগে কিন্তু এটা জানতাম না। যখন জানলাম, পর্বতারোহণ স্পোর্টস, আর আমি যেহেতু খেলাধুলার সঙ্গে থাকতে চেয়েছি, তাহলে কেন আমি এই স্পোর্টসটার সঙ্গে যুক্ত হবো না? একটু চেষ্টা করে দেখি না। তখন আমি মুহিত ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। জিজ্ঞেস করলাম, কীভাবে আমি তাদের ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হতে পারি। প্রথমে নিশাত আপুর সঙ্গে যোগাযোগ হয়, তার মাধ্যমে মুহিত ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। তাদের মাধ্যমেই আমি বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রাকিং ক্লাব যেটা আছে, বিএমটিসি, সেটাতে যুক্ত হই। পরে আমি পর্বতারোহণের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি ভারতের নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে। সেখানে আমি বেসিক ট্রেনিং নিই। আমার প্রথম অভিযান ছিল কেয়াইজুরি। ৬ হাজার মিটারের একটি পর্বত। মুহিত ভাইয়ের নেতৃত্বে¡ই সেই অভিযানটি হয়। এভাবেই আমার পর্বতারোহণের যাত্রা শুরু হয়। আমি যে ছোটবেলা থেকেই পর্বতারোহী হতে চেয়েছি তা না। সময় আমাকে এদিকে নিয়ে এসেছে।

পর্বতারোহণকে কখন কঠিন মনে হয়েছে?

২০১৮ সালে আমি উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিই। এরপর ২০১৯ একটি অভিযান করি, হিমলুং নামে। ৭১২৫ মিটারের একটা পর্বত। এই অভিযানে অংশ নিই পাঁচ দেশের আটজন আরোহী। বাংলাদেশ থেকে মুহিত ভাই ও আমি ছিলাম, সুইডেন থেকে, ক্রোয়েশিয়া থেকে, সাউথ আফ্রিকা থেকে ও স্পেন থেকে ছিল এই অভিযানের সদস্যরা। এই আটজন পর্বতারোহীর মধ্যে একজন পর্বতারোহী মারা যায়, স্পেনের একজন মারা যান। সেই প্রথম আমার টিমের মধ্য থেকে পর্বতারোহণের সময় কেউ মারা যান। সে সময় আমি প্রথম উপলব্ধি করি, পর্বতারোহণ কঠিন। এর আগে মৃত্যু দেখিনি, কোনো ডেডবডি দেখিনি।

সি টু সামিটের চিন্তাটা কীভাবে এলো?

হিমলুং অভিযানের পরে কোভিড এলো। সব তখন বন্ধ। সে সময় বসে বসে আমি ভাবছিলাম, বড় একটা কিছু কী করা যায় কিনা? তখন গ্রেট হিমালয় ট্রেইলটা মাথায় আসে। গ্রেট হিমালয় ট্রেইলটা হলো, হিমালয়ের সবচেয়ে উঁচু দিক দিয়ে দুর্গম একটা ট্রেইল। পৃথিবীতে মাত্র চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশজন মানুষ সফলভাবে এই ট্রেইল অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশ থেকে এখন পর্যন্ত আমি একমাত্র ব্যক্তি, যে এটা সম্পন্ন করতে পেরেছি। সেই অভিযানে আমি ১০৯ দিনে সতেরোশ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করি, যেখানে আসলে পথ বলে কিছু নেই। এমনও হয়েছে, পনেরো-বিশ দিন আমি কোনো মানুষের দেখা পাইনি। এই এক অভিযানেই আমি হিমালয়ের বৈশিষ্ট্য, মানুষ প্রভৃতি সম্পর্কে এতটা পরিচিত হয়ে গেলাম যে, এরপর যদি আমি পঞ্চাশটা অভিযানও করি তবু তা গ্রেট হিমালয় ট্রেইলের মতো গুরুত্বপূর্ণ হবে না। এই অভিযানের পরে মনে হলো, এরপর কী? সব পর্বতারোহীর একটা ইচ্ছা থাকে এভারেস্ট অভিযানের। কিন্তু আমি ভাবলাম, একটু অন্যরকম করে করলে ক্ষতি কী? সবাই তো লুকলা পর্যন্ত ফ্লাইটে যাচ্ছে। সেখান থেকে বেসক্যাম্প। বেসক্যাম্প থেকে অভিযান শুরু হচ্ছে। শরীরকে এভারেস্টের পরিবেশে খাপ খাইয়ে তারপর অভিযান শুরু করছে। আমি চিন্তা করলাম, এটাকে কীভাবে অন্যরকম করা যায়, কী কী চ্যালেঞ্জ যোগ করা যায়। অক্সিজেন ছাড়া মানুষ এভারেস্ট জয় করে ফেলেছে। কী করা যায়? আমি ভাবলাম, একদম জিরো থেকে এভারেস্ট অভিযান শুরু করলে কেমন হয়? একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখলাম, একজন মাত্র পর্বতারোহী, তিনি অস্ট্রেলিয়ার পর্বতারোহী টিম ম্যাকার্টিনি, ১৯৯০ সালে। তিনি অভিযান শুরু করেছিলেন গঙ্গার ঘাট থেকে। আমি ভাবলাম, আমার তো সমুদ্র আছে, বঙ্গোপসাগর। আমি যদি আমার সমুদ্র থেকে অভিযান শুরু করি তাহলেই তো হয়ে গেল। তবে পরে দেখলাম, আমাকে তার থেকে বেশি পথ অতিক্রম করতে হবে। তিনি ১১২৬ কিলোমিটার পথ হেঁটেছিলেন, আমাকে হাঁটতে হবে ১৩শ, ১৪শ কিলোমিটারের মতো পথ। এরপর আমি ভাবলাম, এই অভিযানটি আমি কীভাবে সম্পন্ন করব? আমি ঠিক করলাম পুরোটা পথই আমি পায়ে হাঁটব। কোনো প্রকার যানবাহন ব্যবহার করব না। পুরোটাই কার্বন ফ্রি করতে চেয়েছি। আর আমি যেহেতু প্লাস্টিক পলিউশন নিয়ে কাজ করছি, তাই প্লাস্টিক পলিউশনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের মেসেজটাও দিতে চেয়েছি পুরো অভিযানে। গত বছর ২৫ ফেব্রুয়ারিতে আমি কক্সবাজার ইনানী সমুদ্রসৈকতে সমুদ্রের পানিতে পা ভিজিয়ে আমার অভিযান শুরু করি। এরপর চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ঢাকা হয়ে যমুনা ব্রিজের নিচে যাই। আমি অনেক চেষ্টা করেছিলাম যেন যমুনা ব্রিজ দিয়ে অনুমতি পাওয়া যায়। কিন্তু আমি সেটা পাইনি। অবশেষে আমি তিন কিলোমিটার সাঁতরে যমুনা পার হই। আমার কয়েকজন বন্ধু আমাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য সাঁতরেছিলেন আমার সঙ্গে। যমুনা পার হয়ে বগুড়া, রংপুর, পঞ্চগড় হয়ে বাংলাবান্ধায় ঢুকে যাই। তারপর আমি শিলিগুড়ি ঢুকে যাই। শিলিগুড়ি চিকেন নেক হয়ে আমি নেপালে ঢুকে যাই। এভাবে আমি বেসক্যাম্পে পৌঁছে যাই। বেস ক্যাম্পে পৌঁছতে আমার সময় লাগে ৬৪ দিন। এখানে পৌঁছতে আমাকে ১৩৭২ কিলোমিটার পথ হাঁটতে হয় এবং ৩ কিলোমিটার পথ সাঁতরাতে হয়। ততদিনে সবাই বেসক্যাম্পে পৌঁছে আবহাওয়ার সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করে ফেলেছে। আমি বেসক্যাম্পে পৌঁছাই এপ্রিল মাসের ২৯ তারিখে। আমাকে সেখানে আবহাওয়ার সঙ্গে খাপখাইয়ে নেওয়ার জন্য খুব বেশি সুযোগ পাইনি। আমাকে সামিটের জন্য বের হতে হয়। ৮৪ দিনের মাথায় আমি এভারেস্টের চূড়ায় গিয়ে দাঁড়াই। দিনটি ছিল ১৯ মে, নেপাল সময় ভোর সাড়ে ৬টা।

পুরোটা পথ হাঁটার কারণে এই অভিযানে জনসম্পৃক্ততা ছিল নানাভাবে। কোনো একটি স্মরণীয় ঘটনার কথা আমাদের জানাতে চান?

প্রতিটি দিনই এমন ঘটনায় পূর্ণ ছিল। বাংলাদেশের ঘটনাগুলো বলছি না। ধরে নিলাম, ঘরের ছেলে হিসেবে আমাকে সবাই আপন করে নেবে। ইন্ডিয়ার কথা বলি। ইন্ডিয়ায় থাকার জন্য যখন আমি হোটেল খুঁজছিলাম তখন একটা ছেলে আমার সঙ্গে সেও হোটেল খোঁজা শুরু করল। হোটেল পাওয়া যাচ্ছিল না। ছেলেটা তখন তার বাবাকে ফোন দিল। তার বাবা অটোরিকশা চালায়। উনি কিছুক্ষণ পরে এলেন। বললেন, হোটেল খুঁজছ কেন? আমার বাড়িতে থাকতে কি অসুবিধে হবে। আমি গরিব মানুষ, আমার থাকার জায়গা ওরকম নেই। আমি তদের আন্তরিকতায় রাজি হয়ে গেলাম। তাদের বাড়িতে গেলাম। তার মা কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। কী খাওয়াবে, কোথায় থাকতে দেবে। তাদের উচ্ছ্বাস দেখে মনে হলো, যেন তাদের আরেকটা ছেলে ফিরে এসেছে। পরদিন ছিল ঈদ। আমার জন্য পায়েস রান্না করে রেখেছেন। তারা জানেন, ঈদের নামাজের আগে মিষ্টি জাতীয় খাবার খায় মুসলিমরা। আমি খেয়ে নামাজ পড়ে এসে যখন সব প্রস্তুতি নিয়ে আবার বের হচ্ছি তখনও তারা বলছেন, আরেক দিন থেকে যেতে। এগুলোওই আমার অভিযানের সঞ্চয়।

কিছুদিন আগে আপনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি লিখেছেন-

হ্যাঁ। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অনেক পদক্ষেপের একটি হলো খেলোয়াড়দের ক্রীড়া কার্ড প্রদান। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, খেলোয়াড়দের তালিকায় পর্বতারোহীরা অন্তর্ভুক্ত নেই। পর্বতারোহণ ব্যয়বহুল স্পোর্টস। আমাদের পর্বতারোহীরা নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে নানা অভিযান সম্পন্ন করে দেশের জন্য সম্মান বয়ে নিয়ে আসছে। ক্রীড়া কার্ডের আওতায় কিন্তু পর্বতারোহণ নেই। তবে কি পর্বতারোহণ স্পোর্টস না? সরকার যদি একে স্পোর্টসের স্বীকৃতি দিত তাহলে অনেকে এই স্পোর্টসে আগ্রহী হতো। যারা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষক আছেন তারাও উৎসাহিত হতেন।

আপনার জীবন এক হার না মানা অভিযান। আমরা প্রায়ই দেখি তরুণরা জীবনের কাছে হার মেনে স্বেচ্ছামৃত্যু বরণ করে নিচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে আপনার হার না মানা জীবনদর্শন থেকে কিছু বলুন!

জীবন সহজ না। সবার জীবনই সংগ্রামমুখর, ভিন্ন ভিন্নভাবে। একটু যদি ভেবে দেখি তাহলে দেখব এই জীবন কিন্তু আমাদের একার নয়। অনেকের অবদান, সাহায্য-সহযোগিতা রয়েছে। আমি সামিট থেকে যখন কিছু দূরে ছিলাম তখন আবহাওয়া এত প্রতিকূল হলো যে, মনে হলো সামিট করা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। তখন আমি ভাবলাম, এই পর্যন্ত আসার পেছনে অসংখ্য মানুষের অবদান রয়েছে। আমি যদি ফিরি তাহলে সামিট করেই ফিরব। এই চিন্তা আমাকে উজ্জীবিত করেছিল। আমরা যদি ভাবি, এই জীবনটা শুধু আমাদের নয়, এর পেছনে অসংখ্য মানুষের শ্রম, চেষ্টা রয়েছে, তখন কিন্তু আমরা আত্মহননের মতো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে সরে আসব।